ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মুখ ধোয়ার পর বদলে গেল কনে!

ইলিয়াস আলী, বালিয়াডাঙ্গী
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৫:০৫ এএম

বিয়ের পরই আসে বাসরঘর, আলো-ছায়ার ভেতর নতুন জীবন শুরুর সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু কনে মুখ ধোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন থমকে যায় সবকিছু! বরের অভিযোগ, যে মেয়েকে বিয়ের আগে দেখানো হয়েছিল, বাসররাতে সেই মেয়ে ছিলেন না। মুহূর্তেই আনন্দের ঘর রূপ নেয় বিষাদ, সন্দেহ আর মামলার জালে।

‘কনে বদল’ অভিযোগকে কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁওজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও কৌতূহল। সত্যিই কি পরিকল্পিত প্রতারণা, নাকি এটি একটি ভুল বোঝাবুঝিÑ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সাধারণ মানুষ।

ঘটনাটি ঘটেছে জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার ভান্ডার এলাকায়। ওই গ্রামের জিয়ারুল হকের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয় পাশর্^বর্তী পীরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর এলাকার মৃত ইব্রাহীমের ছেলে রায়হান কবিরের। বিয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দাম্পত্য সম্পর্ক গড়ায় আদালতের কাঠগড়া পর্যন্ত।

বিষয়টি মীমাংসার জন্য একাধিকবার দুই পক্ষ আলোচনায় বসলেও কোনো সমাধান হয়নি। গত বছরের ২৭ আগস্ট কনের বাবা জিয়ারুল হক বর রায়হান কবির ও তার দুলাভাই মানিক হাসানকে আসামি করে ঠাকুরগাঁও আদালতে মামলা করেন। পাল্টা হিসেবে ২ সেপ্টেম্বর রায়হান কবির কনের বাবা জিয়ারুল হক ও ঘটক মোতালেবকে আসামি করে আরেকটি মামলা করেন। উভয়পক্ষের মামলার প্রেক্ষিতে গত সোমবার আদালত রায়হান কবিরের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

রায়হান কবিরের মামা বাদল এ বিষয়ে বলেন, ‘ঘটক মোতালেবের মাধ্যমে রায়হান কবিরের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। গত বছরের জুলাই মাসের শেষের দিকে উপজেলার শিবদিঘী এলাকার একটি চায়ের দোকানে ঘটক একটি মেয়েকে দেখান। মেয়েটিকে পাত্র ও উপস্থিত স্বজনদের পছন্দ হলে তা ঘটককে জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে মেয়েপক্ষের লোকজন তাদের বাড়িতে এসে আত্মীয়তার প্রস্তাব দেয় এবং নতুন করে মেয়ে না দেখেই বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন করার অনুরোধ জানায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘রায়হান কবিরের দুলাভাই মানিক মালয়েশিয়া প্রবাসী। তিনি দ্রুত বিদেশে ফিরে যাবেন এ কারণে তাড়াতাড়ি করে বিয়ের কাজ শেষ করা হয়। গত ১ আগস্ট রাত ১১টায় দুটি মাইক্রোবাসে করে আমরা মেয়ের বাড়িতে যাই। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভোর ৪টার দিকে বাড়ি ফিরি।’

তার অভিযোগ, অতিরিক্ত মেকআপের কারণে বিয়ের রাতে কনে পরিবর্তনের বিষয়টি আমরা বুঝতে পারিনি। তবে বাসররাতে মেয়ে মুখ ধোয়ার পর রায়হান কবির বুঝতে পারে, সে যে মেয়েকে বিয়ে করেছে সে অন্য কেউ। যে মেয়েকে আগে দেখানো হয়েছিল, তাকে কৌশলে বদল করা হয়েছে। ২ আগস্ট আমরা মেয়েটিকে তার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিই এবং প্রতারণার কারণ জানতে চাই। আমাদের দৃঢ় বিশ^াস, ঘটক ও মেয়ের বাবা পরিকল্পিতভাবে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কনের বাবা জিয়ারুল হক বলেন, ‘তার কোনো ছেলেসন্তান নেই। তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলেপক্ষ আমাদের বাসায় এসে মেয়েকে দেখে গেছে। বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রায় ৭০ জন বরযাত্রী উপস্থিত ছিল। এমন অবস্থায় বিয়ের রাতে কনে বদল হয়েছে এটা বিশ^াসযোগ্য নয়।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘বিয়ের আগে কোনো যৌতুকের কথা বলা হয়নি। কিন্তু বিয়ের পরদিনই তারা ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। আমি জমি বিক্রি করে দেওয়ার কথাও বলেছি, কিন্তু তারা সময় দিতে রাজি হয়নি। এখন আমাকে হেয় করার জন্য এসব মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’

অভিযুক্ত ঘটক মোতালেব বলেন, ‘আমি অন্য কোনো মেয়ে দেখাইনি। মেয়ে দেখানো হয়েছিল তার বাবার বাসাতেই। পরে মেয়ে ও ছেলেপক্ষ নিজেরাই দ্রুত বিয়ের প্রক্রিয়া শেষ করেছে। এরপরের ঘটনার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও ছেলেপক্ষের আইনজীবী জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘প্রথম দিকে মীমাংসার শর্তে রায়হান কবির জামিনে ছিলেন। কিন্তু কোনো সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি এখন পুরোপুরি বিচারাধীন। আশা করছি, আদালতের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন হবে।’