সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সম্পন্ন হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংগঠনও বলছে, ২০০৮ সালের পর এমন উৎসবমুখর পরিবেশের নির্বাচন দেখেনি বাংলাদেশের মানুষ। ভোটারদের একচ্ছত্র সমর্থনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এর জন্য সব সাফল্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিচ্ছেন অনেকে। কিন্তু তারপরও কিছু আসনের প্রার্থীরা ভোটে কারচুপি এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দিয়ে যাচ্ছেন। ভোট পুনর্গণনা থেকে শুরু করে এসব আসনে পুনরায় নির্বাচনও দাবি করছেন অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন সত্ত্বেও ইসিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
নির্বাচনের পরপরই কিছু আসনে ফলে কারচুপির অভিযোগ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১১ দলীয় নির্বাচনি জোটভুক্ত দলগুলোর নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে হামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এগুলোর প্রতিকার না পেলে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এ বিষয়ে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল হক জোবায়ের রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচনে হারজিত থাকবে, এটা স্বাভাবিক। সেই হারজিতটা যদি স্বাভাবিকভাবে হয় তা হলে কারো সেখানে বড় কোনো আপত্তি থাকে না। কিন্তু যদি সেখানে বড় ধরনের বৈষম্য অথবা অনিয়ম হয়, তা হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জানানোর পরও নির্বাচনের দিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ১১ দলীয় নির্বাচনি জোটের কর্মী, সমর্থক, এজেন্ট ও ভোটারদের বাড়িতে হামলা হয়েছে, ব্যক্তির ওপর হামলা হয়েছে, আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন নেতাকর্মীর বাড়িতে।
তিনি আরও বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর আসনের ব্যাপারে আপনারা সবাই জানেন। কেন্দ্র দখল করে একজন নেতার আপনজনের নেতৃত্বে সেখানে যা হয়েছে, তার সাক্ষী এই দেশবাসী, বিশ্বাসী। তা হলে আপনি কীভাবে বলবেন সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে? বরাবরের মতোই এই নির্বাচনেও অনিয়ম-কারচুপি হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ইসি আমাদের অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত করেনি বা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এটা খুবই দুঃখজনক।
নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তীকালে দেশের কমপক্ষে ১৬টি জেলার ২১টি স্থানে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ তুলেছে জামায়াত। দলটির দাবি অনুযায়ী, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপাচার্যের (ভিসি) ওপর ছাত্রদলকর্মীরা হামলা চালায়। এ ছাড়া খুলনায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বাড়িতে আগুন দেওয়া এবং তার মা-বোনকে পিটিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটেছে। ওই শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশেরও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায়ও সহিংসতা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
এদিকে পঞ্চগড়ে বিএনপিকর্মীরা সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপি নেতা সারজিস আলম। তার ভাষ্য, সেখানে বেশ কয়েকজন আহত হন।
অভিযোগের মধ্যে আরও রয়েছে, দিনাজপুরে জামায়াতের পোলিং এজেন্ট হওয়ায় ছেলের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বাবাকে মারধর ও বাড়ি পোড়ানোর হুমকি দেওয়া, কুড়িগ্রামে ভোট নিয়ে তর্কের জেরে জামায়াত নেতাকে কুপিয়ে জখম এবং লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বে বাড়িতে ঢুকে মালামাল লুট। এ ছাড়া বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলায় শিবিরকর্মী আহত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়।
ফেনী ও নোয়াখালী অঞ্চলেও হামলার অভিযোগ করেছে জামায়াত। ফেনীর ফুলগাজীতে ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে জামায়াত নেতার দোকানে হামলা এবং মুন্সীরহাটে জামায়াতকর্মীদের চারটি দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে। স্থানীয় যুবদল নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ প্রসঙ্গে ফেনী-১ আসনের জামায়াতের প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলেও সহিংসতার কথা জানিয়েছে জামায়াত।
অন্যান্য জেলার মধ্যে বাগেরহাট-৪ আসনে আল-আমিন নামে এক যুবককে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে। এ ছাড়া বাগেরহাটে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের ওপর হামলায় কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। কুষ্টিয়ায় এনসিপি নেতার বাড়িতে এবং সিরাজগঞ্জে জামায়াত আমিরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে জামায়াত অভিযোগ করেছে।
শুধু ঢাকার বাইরে নয়, ঢাকা-৭ আসনেও ভোট গণনায় ব্যাপক কারচুপি করা হয়েছে বলে অভিযোগ এনে জামায়াতের প্রার্থী মো. এনায়াত উল্লা ব্যালট পুনর্গণনার দাবি জানান। ঢাকা-১৬ আসনে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং ও ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ তুলে গেজেট প্রকাশ স্থগিত করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী মো. আমিনুল হক।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মো. এনায়াত উল্লা বলেন, ধানের শীষের অনেক বান্ডিলে ১০০টি ব্যালট পেপার না দিয়েও গণনায় ১০০টি হিসেবে দেখানো হয়েছে। দাঁড়িপাল্লার পোলিং এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কক্ষ থেকে বের করে দিয়ে রেজাল্টশিট তৈরি করা হয়েছে। ভোট গণনার মাঝামাঝি এসে ম্যানিপুলেট ও রিগিংয়ের (ভোট কারচুপি) উদ্দেশ্যে গণনাকে অহেতুক দেরি করানো হয়েছে। কাউন্টার পার্টে এজেন্টদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি। প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের ‘এসব অনিয়ম’ তুলে ধরে গত শুক্রবার রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে লিখিত আপত্তি জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এনায়াত উল্লা। তিনি অনতিবিলম্বে ফল ঘোষণা স্থগিত রেখে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানান। বিভাগীয় নির্বাচন কমিশনে সমাধান না পেলে এ বিষয়ে হাইকোর্টে যাওয়ারও ঘোষণা দেন জামায়াতে ইসলামীর এই প্রার্থী।
অন্যদিকে গত শনিবার পল্লবীর নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা-১৬ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মো. আমিনুল হক বলেন, প্রশাসন ও প্রতিপক্ষ প্রার্থীর যোগসাজশে তার নিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সরকার ঢাকা শহরের কয়েকটি আসনে একটি নির্দিষ্ট দলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং এর অংশ হিসেবেই ঢাকা-১৬ আসনে ধানের শীষের নিশ্চিত জয়কে কারচুপির মাধ্যমে পরাজয়ে রূপান্তর করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আমিনুল হক সরাসরি জালিয়াতির প্রমাণ হিসেবে পল্লবী বিদ্যানিকেতন কেন্দ্রের রেজাল্টশিট প্রদর্শন করেন। তিনি অভিযোগ করেন, প্রথমে একটি কেন্দ্রে ধানের শীষের ভোট ৪৫৬, আম প্রতীকের তারিকুল ইসলামকে ৫৮৩ ভোট এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীককে দেওয়া হয় শূন্য ভোট। পরে সেই শিট ছিঁড়ে সুকৌশলে জালিয়াতি করে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ঘরে ৪৫৬ ভোট বসিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, এর চেয়ে বড় জালিয়াতি আর কী হতে পারে? এ ছাড়া তার কাছে এমন ৩০টির বেশি রেজাল্টশিট রয়েছে, যেখানে কোনো পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর নেই এবং অনেক কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার নিজেই সিল মেরেছেন বলে ভিডিও প্রমাণ হাজির করেন আমিনুল হক।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ তুলে বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, গত ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে জামায়াতের প্রার্থী বাউনিয়া বাঁধ আইডিয়াল স্কুল ও লালমাটি কমিউনিটি স্কুলের মতো বিভিন্ন কেন্দ্রে ঢুকে প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষে গিয়ে বৈঠক করেছেন, যা আইনত দ-নীয়। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের বিষয়টি জানানো সত্ত্বেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর এসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগ খতিয়ে দেখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি বলেন, বড় দল, ছোট দল বলতে কিছু নেই। নির্বাচনে যারা অংশ নিয়েছে তারা সবাই ইসির কাছে সমান। সবাই ইসিতে এসে নিজেদের অভিযোগ, পরামর্শ জানাচ্ছে। এতে কমিশন সমৃদ্ধ হচ্ছে। ছোট সমস্যার সমাধান করবে ইসি।



-20260216025254.webp)
সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন