নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় যাত্রা শুরু করছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। আগামীকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনে বসছে নতুন সরকারের প্রথম অধিবেশন। স্পিকার নির্বাচন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে শুরু হচ্ছে এই অধিবেশন। অধিবেশন ঘিরে সার্বিক প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছে সংসদ সচিবালয়। নীতি নির্ধারণ, আইন প্রণয়ন ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রাণবন্ত সংসদ আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, অধিবেশনের প্রথম দিনই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ দেওয়া হবে। সংসদের সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ডেপুটি স্পিকারের পদটি বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে জামায়াত এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে জামায়াতে ইসলামী ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে চলতি সংসদের প্রথম অধিবেশনেই জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যুতে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংসদ সচিবালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্দোলনকারীদের হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় সংসদ ভবন। এটি পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করতে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বড় কাজ করেছে গণপূর্ত বিভাগ। গুরুত্বের দিক থেকে এর পরের খাত হচ্ছে সংসদ সচিবালয়ের আইটি খাতের। বাকিটা সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো করেছে। এর মধ্যে শুধু বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম মেরামতের খরচ ৭৩ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভাঙচুরের কারণে সংসদ সচিবালয়ের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশনের জন্য উপযোগী করে তুলতে এসব ধ্বংসযজ্ঞ মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আসন্ন অধিবেশনের জন্য বর্তমানে মোটামুটি প্রস্তুত জাতীয় সংসদ ভবন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে কয়েক হাজার মানুষ সংসদ ভবনের ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ সময় স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ এবং হুইপদের কক্ষসহ ৯ তলা ভবনের প্রায় সব কক্ষ তছনছ করা হয়। সংসদ এলাকায় মন্ত্রী ও সংসদ-সদস্যদের কার্যালয়, সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের অফিস, এমনকি বাসভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লুটপাটকারীরা নগদ টাকাসহ কম্পিউটার, এসি, আসবাবপত্র থেকে শুরু করে বাথরুমের বালতি, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সেট, সাউন্ড সিস্টেম খুলে নিয়ে যায়। ব্যাপক ক্ষতি হয় সংসদ লাইব্রেরির। আগুনে পোড়ানো হয় হাজার হাজার বই। পুরোপুরি মেরামত বা সংস্কার করা না হলেও সংসদের অধিবেশন শুরু জন্য প্রস্তুত করতে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৯৭ কোটি টাকার বেশি।
গণঅভ্যুত্থানের ওই দিন জাতীয় সংসদ ভবনে লুটপাটের ঘটনায় দাপ্তরিক ও ব্যক্তিগত মিলিয়ে প্রায় ৯০ লাখ ক্যাশ টাকা খোয়া গেছে। ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছিল। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, সংসদ ভবন, সংসদ সদস্য ভবন (মানিক মিয়া ও নাখালপাড়া), পুরোনো এমপি হোস্টেল, মন্ত্রী হোস্টেল, সচিব হোস্টেল ও সংসদ ভবন আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা জোরদারে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়। এই তিন কমিটি সংসদ ভবন এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মালামাল উদ্ধার করে সংসদের নির্দিষ্ট স্থানে জমা দিয়েছিল।
এবারের অধিবেশনের শুরুটা কিছুটা ব্যতিক্রমী। গণঅভ্যুত্থানের পর দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ফলে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করবেন সরকারি দলের একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য।
সংসদীয় বিধি অনুযায়ী, শুরুতেই একজন সংসদ সদস্য স্পিকার পদে একজনের নাম প্রস্তাব করবেন এবং আরেকজন তা সমর্থন করবেন। অধিবেশনের সভাপতিত্বকারী সদস্য প্রস্তাবটি উত্থাপন করলে সমর্থনের ভিত্তিতে স্পিকার নির্বাচিত হবেন। এরপর সংসদ ভবনের রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে নতুন স্পিকারের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। শপথ শেষে স্পিকার সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করবেন।
অধিবেশনের শুরুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। এরপর স্পিকার রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানাবেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর তার ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা শুরু হবে। তবে প্রথম কার্যদিবসে রাষ্ট্রপতির ভাষণের পরই অধিবেশন মুলতবি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দলীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে। এদিন নীতি নির্ধারণ, স্পিকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হবে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ হবে।’ প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা বিভিন্ন অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হবে। সেগুলোর অনুমোদন, সংশোধন অথবা বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সংসদ। এ ছাড়া প্রয়াত সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণে শোক প্রস্তাবও গ্রহণ করা হবে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন প্রায় এক মাস চলবে। এ সময় রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব এনে আলোচনা হবে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংসদকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর করতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করারও চেষ্টা থাকবে বলে জানিয়েছেন হুইপরা।
জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, যেহেতু স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নেই, এ কারণে সংসদে উপস্থিত সদস্যদের মধ্য থেকে একজন সভাপতি থাকবেন।
সংসদের প্রথম বৈঠকে স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সভাপতিত্ব করবেন সরকারি দলের একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য। পরে দায়িত্ব গ্রহণের পর অধিবেশন পরিচালনা করবেন নতুন স্পিকার।

