ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সিলেট সিটি করপোরেশন

নগরপিতার চেয়ারে বসতে বিএনপির এক ডজন প্রার্থী

সালমান ফরিদ, সিলেট
প্রকাশিত: মার্চ ২৯, ২০২৬, ১২:২১ এএম

আরও এক থেকে দেড় বছর সময় লাগতে পারে সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের। এরকমই ইঙ্গিত দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। তার আগে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করা হতে পারে। এই লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগোলেও বসে নেই সিটি করপোরেশনগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীরা। মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পেতে তৎপর হয়ে উঠেছেন সরকারি দল বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) মেয়র পদে লড়তে মনোনয়ন দৌড়ে এবার মাঠ নেমেছেন বিএনপির অন্তত এক ডজন প্রার্থী। তারা এখন থেকেই বেশ সক্রিয়। গেল পবিত্র রমজান মাস ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তাদের তৎপরতা চোখে পড়ে সবচেয়ে বেশি।

স্থানীয় সরকারসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, সিটি করপোরেশন নির্বাচন যে পরে হবে, তার একটি ইঙ্গিত হচ্ছে প্রশাসক নিয়োগ। দেরিতে নির্বাচনের লক্ষ্যেই সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে উন্নয়নকাজ চালিয়ে নেওয়ার পথে এগোচ্ছে সরকার। একই সময়ে উপজেলা ও পৌরসভাগুলো বাকি থাকলেও সেখানে প্রশাসক নিয়োগের পক্ষে নয় সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগ। তারা আগে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায়।

সিলেট বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেরিতে হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন থেকেই তাদের তৎপরতা নিয়ে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। কেন্দ্রও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি শর্ট লিস্ট এরই মধ্যে কেন্দ্র তৈরি করে নিয়েছে। সেখানে তিন-চারজনের নাম রয়েছে। তৎপরতায় এক ডজন মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেও কেন্দ্র সেই লিস্ট থেকে একজনকে বেছে নেবে। তবে কে পাবেন মনোনয়ন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রত্যেকেই মনোনয়ন বাগিয়ে নিতে নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করে চলেছেন। তাদের তৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের ঘোষণা এখনো না এলেও নগরের বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার, প্রচারণা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা বাড়িয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন আগ্রহী নেতারা। আলোচনায়ও নাম উঠে এসেছে অনেকের। স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা ও হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। সবার থেকে এগিয়ে আছে সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক এবং সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর নাম। অনেকে মনে করছেন, তাকে মেয়র পদে নিয়ে আসার জন্যই আগে থেকেই প্রশাসক পদে বসিয়ে ‘মেয়র’ হিসেবে উপযুক্ত করে তোলা হচ্ছে। সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে নগরকে চেনার, নগরবাসীর সঙ্গে মেশার এবং প্রশাসনিক ও উন্নয়নকাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে অভ্যস্ত করে তোলার।

বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থীদের মধ্যে আরও রয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান চৌধুরী কয়েস লোদী, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ইশতিয়াক আহমদ সিদ্দিকী, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহস্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান জামান, সিসিকের সাবেক কাউন্সিলর আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকি এবং জেলা তাঁতী দলের সভাপতি ফয়েজ আহমদ দৌলত। এ ছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় এসেছে সিসিকের দুবারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর স্ত্রী সামা হক চৌধুরীর নামও।

সর্বশেষ সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের ২১ জুন। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী মেয়র নির্বাচিত হন। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের জুন মাসে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে দেশের সব সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করা হয় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।

জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক সেবা পেতে নগরবাসীকে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জন্মনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন সেবার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অনেক বাসিন্দা।

এ অবস্থায় দ্রুত সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের চিঠি পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী প্রথম ধাপে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে সিলেটসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রমজানের শেষ দিকে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমান মাছউদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ঈদের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো ধারাবাহিকভাবে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তারিখ ঘোষিত না হলেও নির্বাচন ঘিরে সিলেট সিটি করপোরেশনের ৪২টি ওয়ার্ডেই ইতোমধ্যে রাজনৈতিক আলোচনা ও ভোটের হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট সীমানা সম্প্রসারণের পর সিসিকের আয়তন ২৬ দশমিক ৫০ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে ৭৯ দশমিক ৫০ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এই সিটি করপোরেশন এলাকায় জনসংখ্যা ১০ লাখের বেশি।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিসিকের মোট ভোটার ৫ লাখ ২৫ হাজার ৩৮৮ জন। এর মধ্যে সিলেট-১ সংসদীয় আসনের আওতায় থাকা ৩৬টি ওয়ার্ডে ভোটার ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৭৭২ জন এবং সিলেট ৩ সংসদীয় আসনের আওতায় থাকা ৬টি ওয়ার্ডে ভোটার ৩৯ হাজার ৬১৬ জন।

অন্যদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও মেয়র পদে প্রার্থী দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সিলেট-১-এ প্রার্থী দেওয়া হয়েছিল দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে। পরে তার জায়গায় নিয়ে আসা হয় জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমানকে। তখন দলীয় সূত্র থেকে বলা হয়, এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে সিলেট সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আনার জন্য তাকে সংসদ নির্বাচন থেকে সরিয়ে করা হয়েছিল দলটির জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান। দলের মুখপাত্রও তিনি। তবে সম্ভবত তাকেও মেয়র পদে আনছে না জামায়াতে ইসলামী। সেখানে নাম শোনা যাচ্ছে মাওলানা হাবিবুর রহমানের। সংসদ নির্বাচনে ভোটের হিসাব আমলে নিয়ে দলটি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দিকে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দলীয় একটি সূত্র এমনই ইঙ্গিত দিয়েছে।

বিএনপি সূত্র জানায়, সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক হিসেবে জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর নিয়োগের পর থেকেই মূলত নড়েচড়ে বসেন সিলেটের বিএনপি নেতারা। স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর শীর্ষ পদে আসীন হতে এখন তৎপর দলের একঝাঁক প্রভাবশালী নেতা। বিশেষ করে জেলা পরিষদ, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এসডিএ), সিলেট ওয়াসার শূন্য পদে কারা আসছেন, তা নিয়ে চলছে ব্যাপক গুঞ্জন। পাশাপাশি সমান্তরালভাবে চলছে সিসিকের মেয়র পদে কে আসছেন, সেই আলোচনা।