× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মাইনুল হক ভূঁইয়া ও দেলোয়ার হোসেন

প্রকাশিত: মার্চ ২৯, ২০২৬, ১২:২৩ এএম

বেবিচকে প্রশাসনিক কেলেঙ্কারি

লাইব্রেরিয়ান যখন ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর!

মাইনুল হক ভূঁইয়া ও দেলোয়ার হোসেন

প্রকাশিত: মার্চ ২৯, ২০২৬, ১২:২৩ এএম

লাইব্রেরিয়ান যখন ফ্লাইট  অপারেশন ইন্সপেক্টর!

ফৌজিয়া নাহার ওরফে পলিন। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একজন লাইব্রেরিয়ান। ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় শিথিল প্রশাসনের সুযোগে ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর (এফওআই) পদোন্নতি দিয়েছে সংস্থাটি। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে বেবিচকের সদর দপ্তরÑসর্বত্রই তোলাপাড় চলছে।

জানা গেছে, সংস্থার সাবেক ফ্লাইট সেফটি পরিচালক জিয়া এবং তার অনুগত আওয়ামী দোসর ওয়াহিদুজ্জামান ও আনোয়ার হোসেন এই পদোন্নতির নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন। বিষয়টি এতই গোপনীয়ভাবে করা হয়েছে যে, তৎকালীন সদস্য (প্রশাসন) মিজানুর রহমানও বিষয়টি জানতে পারেননি।

রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা যায়, পলিন সাবেক বেবিচক কর্মচারীর মেয়ে। রাজধানীর কাওলায় তার বেড়ে ওঠা। চাকরিকালীন পলিন বেবিচকের বড় কর্তাব্যক্তিদের নজর কাড়েন। বিভিন্ন সময়ে বড় কর্তারা তাকে বিদেশে নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ পলিন বেবিচকের ফøাইট সেফটি পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন জিয়ার নজর কাড়েন। পলিনের পদোন্নতির পথ সুগম করতে চাকরি বিধিমালায় বিশেষ সংশোধনী আনা হয়। ফলে উচ্চমান সহকারী থেকে এফওআই হতে বেগ পেতে হয়নি পলিনকে। সূত্র মতে, পলিনের সঙ্গে আওয়ামী দোসর আনোয়ারের ভালো সম্পর্ক ছিল। এ নিয়ে আনোয়ারের সংসারেও অশান্তি সৃষ্টি হয়।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে এফওআই পদে পলিনের পদোন্নতির জন্য বিদ্যমান প্রবিধানমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে বেবিচকের দাবি, তাকে এফওআই পদে পদায়ন করা হলেও তিনি (পলিন) আসলে কেবিন সেফটি ইন্সপেক্টরের (সিএসআই) দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তার যোগদানপত্র বা পদায়নসংক্রান্ত নথিতে এমন কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্বের উল্লেখ নেই বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) প্রণীত ডক ১০১৩৪-এ সিএসআই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, একজন সিএসআইয়ের থাকতে হবে বেসামরিক বিমান পরিবহন কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা, ন্যূনতম পাঁচ বছর কেবিন ক্রু হিসেবে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা এবং কেবিন ক্রুদের সুরক্ষা ও জরুরি প্রক্রিয়াবিষয়ক প্রশিক্ষণ অথবা মূল্যায়নকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা। যার কোনোটিই নেই পলিনের। অন্যদিকে এফওআই পদটি শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি সরাসরি যাত্রীর নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক সেফটি কমপ্লায়েন্সের সঙ্গে জড়িত একটি কারিগরি ও বিশেষায়িত দায়িত্ব। ফলে এখানে কাগুজে যোগ্যতার চেয়ে মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ দক্ষতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ ধরনের নিয়োগকে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রবিধানমালা পরিবর্তন, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও অনুমোদনের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন, সবাই সমানভাবে দায়ী। আইকাও চিহ্নিত করুক বা না করুক, এ ধরনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত চলছি। এই নিয়োগ যথাযথ হয়নি প্রমাণিত হলে অবশ্যই বাতিল করা উচিত।’

এদিকে বেবিচকের এই সিদ্ধান্তে একদিকে যাত্রী নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে, অন্যদিকে প্রকাশ্যে লঙ্ঘিত হয়েছে আইকাও নীতিমালা। শুধু আইকাও নয়, বেবিচকের নিজস্ব বিধানও এটি অনুমোদন করে না। নিয়ম অনুযায়ী একজন এফওআইকে হতে হবে বৈধ লাইসেন্সধারী পাইলট। থাকতে হবে অন্তত ৫ হাজার ঘণ্টা আকাশে উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা। এর কোনোটাই নেই এফওআই পদে পদোন্নতি পাওয়া পলিনের।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের অযোগ্য ও বিতর্কিত পদায়ন শুধু আন্তর্জাতিক মানদ- লঙ্ঘনই নয়, দেশের আকাশপথকেও ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়। বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘একজন লাইব্রেরিয়ান কীভাবে ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টর (এফওআই) পদে পদোন্নতি পেলেন, তা আমার জানা নেই। আমি খোঁজ নিয়ে বিষয়টি দেখব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা একেবারেই অযৌক্তিক। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এফওআই হতে হলে অবশ্যই পাইলট হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেবিচকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সদস্য বলেন, ‘বিমান চলাচল নিশ্চিত করতে ইন-হাউস প্রোগ্রামের মাধ্যমে কিছু নিয়োগ দিতে হয়েছে। তবে তিনি (পলিন) এফওআই পদে নিয়োগ পেলেও বর্তমানে সিএসআই হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।’

সিএসআই হিসেবে পলিনের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতা রয়েছে কি নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে ওই সদস্য বলেন, ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের সময় বাড়িয়ে অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে’।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব হলো- পাইলটদের লাইসেন্স যাচাই, যোগ্যতা মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ তদারকি এবং অপারেশনাল সেফটি নিশ্চিত করা। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যিনি কখনো ককপিটে বসেননি, উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা যার নেই বললেই চলেÑতাকেই দেওয়া হয়েছে দেশের আকাশপথের নিরাপত্তা নির্ধারণের ক্ষমতা।

পলিন ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে (বেবিচক) লাইব্রেরিয়ান পদে পোষ্য কোটায় যোগদান করেন। এটি একটি ‘ব্লক পোস্ট’, যেখানে চাকরিবিধিমালা অনুযায়ী পদোন্নতির সুযোগ নেই। পলিন ১৯৮৭ সালে মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৮৯ সালে কলা বিভাগ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৯১ সালে এক বিষয়ে রেফার্ডসহ বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৯৫ সালে লাইব্রেরি ও ইনফরমেশন সায়েন্স বিভাগ থেকে এমএ সম্পন্ন করেন। বেবিচকে তিনি লাইব্রেরি ও প্রশাসন বিভাগে প্রায় ১৭ বছর দায়িত্বে ছিলেন। তার এভিয়েশন সম্পর্কিত কোনো বৈধ লাইসেন্স, ফ্লাইট ট্রেনিং কিংবা উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা নেই। তা সত্ত্বেও ২০২১ সালে এফওআই পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বিধিমালা অনুযায়ী, এফওআই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর নির্ধারিত। অথচ ২০২১ সালে পদায়নের সময় পলিনের বয়স ছিল ৪৯ বছরের বেশি।

এদিকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থা আইকাও-এর নির্দেশনায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে শুধু অভিজ্ঞ পাইলটদের সরাসরি নিয়োগের বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বেবিচক সংশোধিত বিধিমালার মাধ্যমে পদোন্নতির সুযোগ যুক্ত করে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নিÑএমন অভিযোগ করছেন বেবিচকের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা।

পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে বেবিচকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এ ধরনের পরিবর্তন স্বাভাবিক নিয়মবিরুদ্ধ। বিদ্যমান বিধান এফওআই পদে নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা, বয়সসীমা ও অভিজ্ঞতার কথা বলেছে। হঠাৎ করেই এগুলো সংশোধন করা হয়েছে, যা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আইকাওয়ের মানদ-Ñউভয়ই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যিনি নিজে উড়োজাহাজ পরিচালনায় অভিজ্ঞ নন, তার পক্ষে পাইলটদের দক্ষতা, অপারেশনাল সেফটি বা ঝুঁকি মূল্যায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এফওআই নিজেই যদি আইকাও মানদ-ে অযোগ্য হন, তাহলে তার মাধ্যমে দেওয়া সার্টিফিকেশন ও তদারকি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।’

অভিযুক্ত ফৌজিয়া নাহার ওরফে পলিন জানান, এটি একটি ব্লক পোস্ট নয়। তা ছাড়া অবকাঠামো অনুযায়ী আমি পদোন্নতি পেতে পারি। আমাকে এফওআই হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হলেও কাজ করছি অপারেশন ইন্সপেক্টর হিসেবে। আমি ইতিমধ্যে প্রশিক্ষণও নিয়েছি।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!