ঝুলে আছে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের বিনা মূল্যের পাঠ্যবইয়ের মান যাচাই প্রক্রিয়ার কাজ। দীর্ঘদিন ধরে পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন (পিএলআই) এজেন্ট নিয়োগ না হওয়ায় বইয়ের মান যাচাই সম্ভব হচ্ছে না। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মাধ্যমিক স্তরের শতভাগ বই জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিতরণ শেষ হয়েছে। কিন্তু জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে এজেন্ট নিয়োগে টেন্ডার ও রি-টেন্ডার করেও এখনো এজেন্ট নিয়োগ দিতে পারেনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে দেশের ৫৮৬ পয়েন্ট থেকে বই এনে বাংলাদেশ শিল্প ও গবেষণা পরিষদের মাধ্যমে (বিসিএসআইআর) বইয়ের মান যাচাই কাজ জুনের মধ্যে শেষ করা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরে পিএলআই নিয়োগ দেওয়া হলেও পাঠ্যবইয়ের মান যাচাইয়ে রিপোর্ট পেতে আগামী মে মাসের অর্ধেক পার হয়ে যাবে।
মাধ্যমিকে পিএলআই নিয়োগ ঝুলে থাকায় পাঠ্যবই ছাপাবাবদ এনসিটিবির কাছে আটকে থাকা প্রেসগুলোর ২০ শতাংশ বিল অর্থাৎ ৩২০ কোটি টাকা জুনের মধ্যে পাওয়া নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। জুনের মধ্যে আটকে থাকা এই বিল না পেলে তা পরবর্তী অর্থবছরে (২০২৬-২৭) চলে যাবে। এতে একদিকে বিল পাওয়া নিয়ে জটিলতা বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকের কাছে প্রেসগুলোর ঋণের সুদের ওপর প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি টাকা অতিরিক্ত যোগ হচ্ছে। যতদিন যাচ্ছে এভাবেই ঋণের বোঝায় ভারি হয়ে উঠছে প্রেস মালিকরা। এতে আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে বই ছাপার কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়বে অনেক প্রেস। যা সামগ্রিকভাবে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই বিতরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে দেরিতে পিএলআই নিয়োগ দেওয়ায় পাঠ্যবইয়ের মান যাচাইয়ের কাজে সময় কম পাবে এজেন্ট। সময় কম পাওয়ায় তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করার চাপ থাকায় বইয়ের মান নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে। এনসিটিবির কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক গ্রুপিং থাকায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে বলে অভিযোগও পাওয়া গেছে। এনসিটিবি, প্রেস ও বই ছাপার কাজে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিষয়ে এনসিটিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, পিএলআই এজেন্ট নিয়োগে প্রথম টেন্ডারে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় রি-টেন্ডার করতে হয়েছে। এতে অনেকটা সময় চলে যাওয়ায় কিছুটা জটিলতা তৈরি হলেও মূল্যায়ন কমিটির আর একটি বৈঠকের মাধ্যমে চলতি সপ্তাহেই এজেন্ট নিয়োগ চূড়ান্ত করা হবে। গ্রুপিংয়ের কারণে সিদ্ধান্তে দেরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তারা।
বিল পাওয়া নিয়ে এমন অনিশ্চয়তায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রেস মালিকরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানিয়েছেন, প্রেস মালিকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শতভাগ বই দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে মার্চের মধ্যে প্রেসগুলোর বিল দিয়ে দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন এনসিটিবির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এক্ষেত্রে পিএলআই বাধা হবে না। তারা আরও বলেন, কিছু প্রেস ছাড়া প্রায় সবাই কিছুটা আগে-পরে হলেও মোটামুটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই বই দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অথচ শতভাগ বই দেওয়ার পরও এখন বিল পাওয়ার সময় নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিদিন ব্যাংকের ঋণের সুদ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামীতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বই দিতে আগ্রহ হারাবে প্রেসগুলো।
জানা গেছে, চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে এনসিটিবির মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণির ৩০ কোটি ৪৬ লাখ বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ করেছে ১০২টি প্রেস। এবারের বই ছাপার জন্য এনসিটিবির বাজেট ছিল কমবেশি ১৬০০ কোটি টাকা। প্রথা অনুযায়ী, প্রেসগুলো এনসিটিবির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী শতভাগ বই সরবরাহ করে মোট বিলের ৮০ শতাংশ উত্তোলন করতে পারে। প্রেসগুলো বাকি ২০ শতাংশ বিল পাবে এনসিটিবির নিয়োগ করা পিএলআই এজেন্টের বইয়ের মান যাচাই করে দেওয়া রিপোর্টের পর। রিপোর্ট অনুযায়ী কোনো প্রেসের বই মানসম্পন্ন হলে ওই প্রতিষ্ঠান শতভাগ বিল পাবে, কোনো প্রেসের বইয়ের মান নিয়ে রিপোর্টে প্রশ্ন উঠলে ওই প্রেসকে জরিমানা করা বা দোষ অনুযায়ী শাস্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে।
এনসিটিবি দুই ধাপে এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে বইয়ের মান যাচাইয়ের কাজ করে থাকে। প্রথমে বইয়ের কাজ শুরু হওয়ার আগে প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) এজেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয়। এই এজেন্ট বই তৈরির জন্য প্রেসগুলোর বই ছাপার কাগজ যাচাই থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ পর্যন্ত সব স্তরের কাজ নজরদারি করে। সারা দেশে বই সরবরাহের পর দ্বিতীয় ধাপে এসব বইয়ের মান যাচাইয়ের জন্য পিএলআই এজেন্ট নিয়োগ দেয় এনসিটিবি। এই এজেন্টের কাজ হচ্ছে সারা দেশের ৫৮৬ পয়েন্ট থেকে সরবরাহ করা বই জোগাড় করে নিজেদের পাশাপাশি দেশের স্বীকৃত মান যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বইয়ের মান যাচাই করে এনসিটিবিকে রিপোর্ট দেওয়া। পিএলআই রিপোর্টের ওপর প্রেসগুলোর ২০ শতাংশ বিল ছাড় পাওয়া নির্ভর করে। খোলা দরপত্র আহ্বান করে সর্বনিম্ন দরদাতাকে উভয় ধাপেই এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ করে এনসিটিবি। পৃথকভাবে দরপত্রের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পিডিআই ও পিএলআই এজেন্ট হয় পৃথক কোম্পানি।
প্রাথমিক স্তরের পিএলআইয়ের কাজ পাওয়া ফিনিক্স ইন্সপেকশন অ্যান্ড সার্ভিসেস বিডি’র প্রধান নির্বাহী শান্তনু সরকার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এনসিটিবির সঙ্গে চুক্তি শেষে ঈদুল ফিতরের পর প্রথম ১১ কর্মদিবসে আমি আমার প্রথম স্টেজের কাজ শেষ করেছি। দ্বিতীয় স্টেজের কাজ ৮-৯ এপ্রিলের মধ্যে শেষ করে দিব’। ১১ কর্মদিবসে প্রথম স্টেজের কাজ শেষ করতে আর কোনো কোম্পানি কখনো পারেনি বলে দাবি করেন শান্তনু। বিসিএসআইআর’র মাধ্যমে মান যাচাই শেষে মে মাসের ২০ তারিখের মধ্যে এনসিটিবিকে প্রাথমিকের পিএলআই রিপোর্ট দিয়ে দিবেন বলে জানান শান্তনু।
অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরের পিএলআইয়ের জন্য ২৮ জানুয়ারি প্রথম দরপত্র আহ্বান করে এনসিটিবি। এই দরপত্রে ২২ লাখ টাকা দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় ফিনিক্স ইন্সপেকশন। কিন্তু দর কম হওয়ায় মূল্যায়ন কমিটি এই দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করে। ২৪ মার্চ পুনঃদরপত্রে ২১ লাখ টাকা দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় প্রাইম ইন্সপেকশন। এখনো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। অথচ এজেন্ট নিয়োগের প্রক্রিয়াতেই চলে গেছে প্রায় মাস তিনেক।
বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান ক্ষোভ প্রকাশ করে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই এনসিটিবির কাজে কোনো সমন্বয় নেই। অথচ প্রেসগুলোর বিল পেতে দেরি হলে কতটা ভুগতে হবে তা তারা ভালো জানেন। আবার পুরোনো বছরের কাজ শেষ না হলে নতুন বইয়ের কাজও শুরুতেই জটিলতায় পড়বে। অথচ এনসিটিবির কোনো হেলদোল নেই’।
পিএলআই এজেন্ট নিয়োগে সংশ্লিষ্ট এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, রি-টেন্ডার হওয়ার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে। তিনি বলেন, ‘সাধারণত মূল্যায়ন কমিটির ৪-৫টি বৈঠকের মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এবার মাত্র দুটি বৈঠক হয়েছে। প্রথম বৈঠকে দরপত্রগুলো পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বৈঠকে দরদাতাদের বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এখন আশা করি, তৃতীয় বৈঠকে এসএলটি (ইজিপিতে দর নিয়ে বিশ্লেষণ) করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে’। কোনো গ্রুপিং নয়, যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।
দরপত্র সঠিকভাবে যাচাই-বাছাইয়ের কাজেই সময় লাগছে মন্তব্য করে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর ড. রিয়াদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সব চেক করেছি। যাতে এই কাজে কোনো অস্বচ্ছতা না থাকে’।
এ বিষয়টি সঠিকভাবে জানেন না মন্তব্য করে এনসিটিবির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, ‘একটি কমিটি আছে। ওরা ইভ্যালুয়েশন (মূল্যায়ন) করছে, হয়ে যাবে’। জুনের মধ্যে সব প্রক্রিয়া শেষ না হলে প্রেসগুলো বিল পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়বে কি না- প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আশা করি তার আগেই হয়ে যাবে’।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন