ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া পূরণ ইউনূস সরকারের

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মে ৩, ২০২৬, ০৬:১০ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

দেশে বিদেশি বিনিয়োগের তেল-গ্যাস কোম্পানিতে কর্মরত শ্রমিকদের মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৫ শতাংশ নির্ধারণ করে বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকার। যে কারণে শ্রমবিধিমালা সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। দায়িত্ব ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে নেওয়া এমন সিদ্ধান্ত শ্রমিক স্বার্থবিরোধী হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাতে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে শ্রমিকদের মুনাফার অংশ হিসেবে ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১.৫ শতাংশ প্রদান করবে। জানা যায়, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগের দিন, ১৬ ফেব্রুয়ারি তড়িঘড়ি করে এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে এমন সিদ্ধান্তের সময়কাল নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিদ্যুৎ বিভাগের তত্ত্বাবধানে এবং সরকারি মালিকানায় কিংবা জিটুজি অর্থায়নের মাধ্যমে একাধিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধিত হলেও সরকার অনুমোদিত উচ্চ হারের বেতন কাঠামো, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচুইটি, ছুটি, অন্যান্য সুবিধা প্রদান করে থাকে। বিদ্যুৎ খাতে সরকারি ভর্তুকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অতীতের ন্যায়  বিদ্যুৎ খাতে ৬২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে। ভর্তুকি বাদ দিলে মালিকানাধীন বিদ্যুৎ কোম্পানিসমূহ বাস্তবে লাভজনক নয়। জি টু জি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর অধিকাংশ বিদেশি ঋণচুক্তিরÑ যেমন বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লি.-এর ক্ষেত্রে  যে অ্যাগ্রিমেন্ট, তা কঠোর শর্তসাপেক্ষে পরিচালিত হয়, যা মুনাফা বণ্টনে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।

তা ছাড়া, কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী ‘অ্যাসোসিয়েশন নট ফর প্রফিট’-এর (কোম্পানি লিমিটেড বাই গ্যারান্টি) অধীনে কোম্পানিগুলোতে কোনো প্রকার লভ্যাংশ বণ্টন নিষিদ্ধ থাকার পরেও বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর পঞ্চদশ অধ্যায়ের অপপ্রয়োগ ও অপব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিকদের ৫% লভ্যাংশ প্রদানে পরিচালকবৃন্দকে বাধ্য করা হয়েছে এবং এ সময়ে নন-প্রফিট অর্গানাইজেশনগুলোকে প্রচুর আইনি জটিলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যা এর মূল উদ্দেশ্য ও কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।

যাতে প্রস্তাবিত সংযোজন হিসেবে উল্লেখ ছিল- বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২৩২(১)-এর সন্নিবেশন ওই আইনের ২৩২(১)-এর (ক) (খ)-এর পর নিম্নরূপ শর্তাবলি সন্নিবেশিত হইবে, যথা- “তবে শর্ত থাকে যে, সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানী/সংস্থা কিংবা সরকার থেকে সরকার অর্থায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত যৌথ মূলধনী কোম্পানি/সংস্থা কিংবা সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে পরিচালিত যেকোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উক্ত ধারা প্রযোজ্য হইবে না। আরও শর্ত থাকে যে, যে সকল প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর ধারা ২৮ অনুযায়ী (নন-প্রফিট অর্গানাইজেশন) গঠিত সে সমস্ত প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার ক্ষেত্রে উক্ত ধারা প্রযোজ্য হইবে না। অতএব, উপরোক্ত প্রস্তাবের আলোকে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ২৩২(১)-এর (ক) (খ)-এর পর উপরোক্ত শর্তাবলি সন্নিবেশনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ১৮ নভেম্বর শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি জারি করা হয়, যেখানে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিধান সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় দ্বিপক্ষীয় পরামর্শক পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে। শ্রমিক নেতাদের দাবি, কিছু বিদেশিÑ বিশেষ করে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিকে সুবিধা দিতে এই পরিবর্তন আনা হয়। 

বিদায়ি সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট চাপ ও সম্ভাব্য বিনিয়োগ হ্রাসের আশঙ্কা থেকেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’ অন্যদিকে সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাউজল কবির খান বলেন, ‘শ্রমিকদের মুনাফার হার বেশি থাকায় কিছু বিদেশি কোম্পানি সমুদ্রভিত্তিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে আগ্রহ দেখায় না।’

এদিকে গত দুই ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) ৯৩তম সভায় অংশ নিয়ে শ্রমিক প্রতিনিধি রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রাপ্য সুবিধাসমূহ প্রতিষ্ঠিত করা শ্রমিক পক্ষের মূল লক্ষ্য। শ্রমিকরা বর্তমানে যে সুবিধা ও অধিকার ভোগ করছেন, তা কোনো অবস্থাতেই বাতিল বা খর্ব করা উচিত নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি খাত একটি পেশাদার ও বিশেষায়িত খাত হওয়ায় এটিকে পৃথকভাবে ও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’ এ বিষয়ে শ্রমিক পক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সকলের পর্যাপ্ত ধারণা ও প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে আরও সময় নিয়ে আলোচনা করা জরুরি ছিল বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। এ ছাড়া  ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে নির্বাচন-পরবর্তী দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বিদ্যমান থাকলেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। ফলে সরকার প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। একই সঙ্গে তিনি শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজনের বিষয়ে বলেন। যদিও এ আলোচনায় শ্রমিকদের পক্ষে শক্ত অবস্থান থাকলেও সরকার তার সিদ্ধান্তে অনড় ছিল।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এ সিদ্ধান্তকে একতরফা ও শ্রমিকস্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক সরকার যাতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ না পায়, সে কারণেই তড়িঘড়ি করে এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।’ শেভরন বাংলাদেশ ও টাল্লো বাংলাদেশের শ্রমিক সংগঠনের নেতারা এ সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণভাবে বিরোধিতা করেছেন। তারা জানান, মুনাফার অংশ নিয়ে পূর্ব থেকেই আদালতে মামলা চলমান ছিল এবং শ্রমিকদের পক্ষে রায়ও এসেছে। এর মধ্যেই বিধিমালা সংশোধন করে সুবিধা কমিয়ে দেওয়া আইনের পরিপন্থি। টাল্লো বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি রনজিৎ কুমার নন্দী বলেন, ‘আইনে থাকা সুবিধা বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে কমানো বেআইনি। বিদেশি কোম্পানির চাপে কিছু কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন।’

শ্রমিক নেতারা দ্রুত এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং বকেয়া লভ্যাংশ পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত শ্রমিক-মালিক সম্পর্ককে দুর্বল করবে এবং শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণœ করবে।