ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বিএনএম কামরুলের প্রতারণা

মেহেদী হাসান খাজা
প্রকাশিত: মে ৮, ২০২৬, ০৬:২৪ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

কিংস পার্টিখ্যাত বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্টের (বিএনএম) আলোচিত নেতা কামরুল আহসানের প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে অনেকেই এখন আইনি পদক্ষেপের কথা ভাবছেন। ‘ভার্সেটিলো’ নামের কোম্পানি খুলে তুরস্ক ও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে ৫টি এজেন্টের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। তার খপ্পরে পড়ে স্বপ্নভঙ্গের শিকার বিদেশ গমনেচ্ছুক অসংখ্য পরিবার। এছাড়া ‘কামরুল এগ্রো’ নামের প্রতিষ্ঠান খুলে তা বিক্রি করার কথা বলে প্রতারণার অভিযোগও কম নয়।

জানা গেছে, কামরুল আওয়ামী লীগের পতনের পর বেশির ভাগ সময় থাকেন দেশের বাইরে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে এখন যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। কামরুল প্রায় দেড় হাজার পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। অবশ্য এসব বিষয়ে নিয়ে কামরুল এর আগে বলেছিলেন, ‘তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়।’

বিদেশে লোক পাঠানোর কথা বলে এজেন্টদের কাছ থেকে কোটি কোটি আত্মসাৎ: ভুক্তভোগীদের তথ্য মতে, কামরুল আহসানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ বেশ পুরোনো। কখনো কোম্পানি খুলে শেয়ার বিক্রির কথা বলে, কখনো বিদেশে লোক পাঠানোর কথা বলে এজেন্টদের কাছ থেকে কোটি কোটি আত্মসাতের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। তার নামে চাঁদাবাজির মামলাও রয়েছে।

চুক্তির পর কোম্পানি বুঝিয়ে না দিতে নানা ধরনের অজুহাত: একজন ভুক্তভোগী রাজধানীর শান্তিনগরের স্পেকট্রাম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সিইও নূর আহমেদ খোকন। তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে কামরুলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে ভালো সম্পর্ক তৈরি হলে কামরুলের মালিকানাধীন ‘কামরুল এগ্রো’ কেনার প্রস্তাব দেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে আমি ও আমার স্কুলের পরিচালক তানভীর ফয়সালসহ কয়েকজন মিলে ‘ভিভিড’ নামে প্রতিষ্ঠান খুলে ৮/১০ জনের কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা দেই তাকে।

তিনি অভিযোগ করেন, চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানি বুঝিয়ে না দিয়ে তিনি নানা অজুহাত শুরু করেন। ২০১১ সালের পর নিশ্চিত হই যে আমরা প্রতারণার শিকার।  প্রায় দুই বছর পর ৫০ লাখ টাকার চেক দিলেও মাত্র ৫ লাখ টাকা পেয়েছি। কামরুলের দেওয়া এবি ব্যাংকের চেক থাকলেও আজও বাকি টাকা আর পায়নি। বরং নানা হুমকি পেয়েছি। তিনি এ ঘটনার বিচার চান। একই ঘটনার ভুক্তভোগী উদ্যোক্তা তানভীর ফয়সাল বলেন, ড. কামরুল আহসানের প্রতারণায় উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে বিনিয়োগ করে জীবনের কয়েকটি বছর চোখের পানি নিয়ে কাটিয়েছি।

ভার্সেটিলো গ্রুপের মাধ্যমে দেড় কোটি টাকার লোপাট : রাজধানীর বিজয়নগরের আল-রাজী কমপ্লেক্সে অফিস রয়েছে এমন একজন এজেন্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তুরস্ক, রাশিয়া ও হাঙ্গেরিতে জনশক্তি রপ্তানির কথা বলে কামরুলের মালিকানাধীন ‘ভার্সেটিলো গ্রুপ’ আমার দেড় কোটি টাকার বেশি লোপাট করেছে। কিন্তু কাউকে বিদেশে পাঠায়নি। এখন তিনি দেশের বাইরে। ফোনও ধরেন না। আমরা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

বিদেশে লোক পাঠানোর কথা বলে ৪ কোটি আত্মসাৎ : কামরুলের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন ভুক্তভোগী প্রমাণপত্র দিয়ে বলেন, তাদের কাছ থেকে তিনটি দেশে লোক পাঠানোর কথা বলে প্রায় চার কোটি টাকার হাতিয়ে নিয়েছে।  লিখিত অ্যাগ্রিমেন্ট তৈরির পর কয়েক কিস্তিতে ওই টাকা দেন তারা। সব কাগজ রেডি হয়ে গেছে জানিয়ে, ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি তাদের প্রত্যেক প্রার্থীর ভিসা ফি বাবদ ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য ভার্সেটিলো এইচআর সলুশন স্কিলস অ্যান্ড আউটসোর্সিং কোম্পানি থেকে তৎকালীন সিইও সাইফুর রহমান তাদের চিঠিও দেন। সেই অনুযায়ী টাকা দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৫টি এজেন্টের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানোর কথা বলে টাকা নেওয়ার পর ১৫৫৫ জন বিদেশ গমনেচ্ছুক ব্যক্তির মেডিকেলও করানো হয়। স্বাভাবিকভাবে এই মেডিকেল করতে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা লাগলেও মেডিকেল সেন্টার নির্দিষ্ট করে দিয়ে প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১০ হাজার টাকা।  অর্থাৎ এখানেও প্রায় দেড় কোটি আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।  রাজধানীর পল্টনের ‘স্টার মেডিক্যাল’, ‘হাটখোলা রোড়ের ইদান মেডিক্যাল’, ‘ভাটারার স্ট্যান্ডার্ড মেডিক্যাল’ ও শান্তিনগর এলাকার ‘বসুন্ধরা মেডিক্যাল’ থেকে মেডিকেল চেক-আপ করাতে বাধ্য করা হয়।

একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, প্রভাবশালীদের কাজে লাগিয়ে কামরুল যে প্রতারণা করে টাকা আত্মসাৎ করেছে সেই টাকা  গেল কোথায়? কামরুল আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর ইমরান আহমদ ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নাফিস সারাফতের সঙ্গের ভিডিও সরবরাহ করেন। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে বন্ধু পরিচয় দিতেন। অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, ড. কামরুল আহসানের নামে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় চাঁদাবাজির মামলা ও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দায়ের করা ওই মামলার বাদী মো. জাহাঙ্গীর আলম। মামলায় ড. কামরুল আহসানকে ১৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে এবং সেখানে তাকে স্বৈরাচারের সহযোগী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএনপি ভাঙতে বিএনএম গঠন করে আলোচনায় থাকা কামরুলের প্রতারণার শেষ কোথায়? : অনেকেই বলছেন, বিএনপি ভাঙতে বিএনএম গঠন করে আলোচনায় থাকা কামরুলের প্রতারণার শেষ ছিল কোথায়? তার প্রতারণার ধরন ছিল আলাদা। অনুসন্ধান বলছে, ২০২৪ সালের ‘একতরফা ও পাতানো’ নির্বাচনের আগে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রশাসনের বিশেষ মহলের সহযোগিতায় কিংস পার্টিখ্যাত ‘বিএনএম’-এ যুক্ত হন কামরুল। বিএনপি নেতাদের বাগিয়ে নির্বাচনে আনার চেষ্টার করতেন তিনি। বর্তমানে কামরুল বিদেশে অবস্থান করায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না ভুক্তভোগীরা। তিনি এখন কোনো ভুক্তভোগীর ফোন রিসিভও করছেন না। ফলে তার বিরুদ্ধে প্রতারণার শিকার অনেকেই এরই মধ্যে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

কিংস পার্টিতে যোগদান করে অনেকেই বিপদগ্রস্ত : বিএনএমের তৎকালীন চেয়ারম্যান শাহ মো. আবু জাফর বলেন, ‘ড. কামরুল আহসান আমাদের দলের কো-চেয়ারম্যান। এখনো তার নিয়ন্ত্রণে বিএনএম। গত নির্বাচনের আগে কামরুলই বিএনএমের সব ছিল।  আমি এখন আর বিএনএমে নেই।’ বিএনএম গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ব্যারিস্টার এম. সারোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ‘আমি ও মেজর (অব.) মো. হানিফসহ কয়েকজন মিলে ভালো উদ্দেশ্যে সংগঠনটি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ’২৪-এর নির্বাচনের আগে মূল উদ্যোক্তাদের বাদ দিয়ে কামরুল আহসানসহ কয়েকজন সরকারের সহযোগিতায় দলটি কব্জায় নেন। কামরুল প্রকৃতপক্ষে একজন প্রতারক। শুনেছি তার নামে প্রতারণা মামলাও রয়েছে। নিজেকে বাঁচাতে ও মুক্ত রাখতে কামরুল এখন বিএনপির ছায়াতলে আসার চেষ্টা করছেন বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন

এ ব্যাপারে কামরুল আহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে তা লিখিতভাবে জানাতে। পরে লিখিতভাবে তার বিরুদ্ধে প্রতারণা-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগসমূহ সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা। আমি লিখিত আকারে প্রমাণসহ প্রশ্নের উত্তর আগামী সপ্তাহের মধ্যে পাঠাব।’

ভুক্তভোগীদের বিদেশ যেতে রোষানলে : এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর পুরানা পল্টনের স্টার মেডিকেল সেন্টারের ফ্রন্ট ডেস্ক অফিসার আসাদুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ‘এত বেশি টাকা কেন নিয়েছেন বা কেন মেডিকেল করার পরও ভুক্তভোগীরা বিদেশ যেতে পারছে নাÑ এটা আমাদের বিষয় নয়।  সেখান থেকে মেডিকেল রিপোর্ট করানো কয়েকজন ভুক্তভোগীর কথা উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ভার্সেটিলো’র সঙ্গে মেডিক্যালের জন্যে তাদের চুক্তি ছিল। ভার্সেটিলো কর্তৃপক্ষ বলতে পারবেন কেন তারা পাঠাতে পারেননি। নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকতা জানান, কামরুলের মেডিকেলে প্রতারণা ভুক্তভোগীদের বিদেশ যেতে রোষানলে পড়তে হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভার্সেটিলো গ্রুপের চেয়ারম্যান কামরুল আহসানের সাবেক সেক্রেটারি আমিনুল হক জানান, ‘২০২৪ সালের আগস্টের পরপরই তিনি চাকরি ছেড়ে আসেন। তিনি নিশ্চিত করেন, কামরুল রাশিয়াসহ তিনটি দেশে লোক পাঠানোর প্রকল্প নিয়ে কাজ করছিলেন। ভার্সেটিলোতে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন এমন অনেকের টাকা-পয়সা নিয়েও ঝামেলা রয়ে গেছে।