ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ধনীদের থেকে ৩ হাজার কোটি সম্পদ কর নেবে এনবিআর

শাহীনুর ইসলাম শানু
প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ০২:২১ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ধনীদের আয়করের ওপর সারচার্জের পরিবর্তে প্রত্যক্ষ সম্পদ কর চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই খাত থেকে তিন হাজার কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা। তথ্য অনুসারে, সম্পদ কর আইন এর আগে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। যদি আগামী অর্থবছরে এ কর পুনরায় চালু হয় তাহলে ২৬ বছর পর ধনীরা আবার প্রত্যক্ষ সম্পদ করের আওতায় আসবেন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত সারচার্জ বাবদ আদায় হয়েছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। নতুন করে সম্পদ কর চালু হলে আগামী অর্থবছরে আরও দুই হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ হবে। ফলে নতুন কর কাঠামোতে মোট রাজস্ব প্রায় তিন হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। সম্পদের বৈষম্য হ্রাস ও রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরে এই কর কাঠামো চালু করতে পারে এনবিআর।

সম্পদ কর বিশে^র অনেক দেশ এরই মধ্যে বাতিল করেছে। ফ্রান্স বিনিয়োগ-সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে ২০১৮ সালে তাদের কর-ব্যবস্থা বাতিল করে। অন্যদিকে নরওয়ে প্রায় ০.৮৫ শতাংশ হারে কর আরোপ অব্যাহত রেখেছে এবং সুইজারল্যান্ড ক্যান্টন পর্যায়ে প্রায় ০.১ শতাংশ থেকে ১ শতাংশের বেশি হারে কর আরোপ করে।

স্পেন প্রায় তিন শতাংশ হারে তাদের সম্পদ কর পুনরায় চালু করেছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা মহামারির পরে একটি অস্থায়ী কর চালু করেছিল। জার্মানি, সুইডেন এবং ডেনমার্ক প্রশাসনিক জটিলতা, উচ্চ পরিপালন ব্যয় এবং মূলধন বহির্গমনের কথা উল্লেখ করে এই ধরনের কর বাতিল করেছে।

বাংলাদেশে নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, চার কোটি টাকা পর্যন্ত মোট সম্পদ করমুক্ত থাকবে। এরপর পরবর্তী দুই কোটি টাকার ওপর ০.২৫ শতাংশ, তার পরের পাঁচ কোটি টাকার ওপর ০.৫০ শতাংশ, আরও পাঁচ কোটি টাকার ওপর ০.৭৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট সম্পদের ওপর এক শতাংশ কর ধার্য করা হবে। কর মূল্যায়নের জন্য জমির মৌজা হারে, ভবন গণপূর্ত বিভাগের হারে, স্বর্ণের বাজার মূল্যে এবং শেয়ার ক্রয়মূল্য বা নিট সম্পদ মূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, সেই হারে মূল্যায়ন করা হবে।

২০২৩ সালের আয়কর আইনের অধীনে বর্তমান ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে এই সংস্কারটি আনা হয়েছে। দেশে বর্তমানে ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রদেয় আয়করের ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ আদায় করা হয়।

নতুন কর কাঠামোতে আসছে ১০০ কোটি থেকে ২০০ কোটি টাকার সম্পদের জন্য কার্যকর সারচার্জের হার প্রায় ০.৪৩ শতাংশ, যা ৫০-১০০ কোটি টাকার সম্পদের জন্য প্রযোজ্য ০.৫৪ শতাংশের চেয়ে কম।

২০২৫-২৬ করবর্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ হাজার ৮০৪ জন করদাতা সম্মিলিতভাবে ১৩ লাখ ১৫ হাজার ১৩৫ কোটি টাকার মোট সম্পদ ঘোষণা করেছেন; কিন্তু সারচার্জ আদায় হয়েছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা, যা মোট সম্পদের ০.২৯ শতাংশ।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৩ জন করদাতার প্রত্যেকের গড় সম্পদ এক হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা, যা মোট ঘোষিত সম্পদের ২.৬৯ শতাংশ। অন্যদিকে, ১০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের অধিকারী ১৮৬ ব্যক্তির দখলে রয়েছে মোট সম্পদের ১২.১২ শতাংশ।

২৭ জন করদাতার আর্থিক চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সম্পদের প্রকৃত মূল্য ঘোষিত মূল্যের চেয়ে ৮৯ শতাংশ বেশি হতে পারে, যা বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় সম্ভাব্য রাজস্ব ৩৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। এনবিআর কর্মকর্তারা অনুমান করছেন, নতুন এই কাঠামো মোট রাজস্ব প্রায় তিন হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করতে পারে, যা থেকে অতিরিক্ত এক হাজার ২০০ কোটি টাকা আয় হবে।

বিশেষজ্ঞরা বাস্তবায়নের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, সম্পদশালীদের মোট সম্পদের পরিমাণ কম দেখানোর প্রবণতা থাকতে পারে। তাদের পুঁজি বা অর্থ পাচার এবং দুর্বল ডেটা পরিকাঠামোর কারণে অপ্রকাশিত সম্পদ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, সুপারিশ হিসেবে তারা বলেন, প্রত্যাশিত সুবিধা অর্জনে নির্ভরযোগ্য সম্পদ ডেটাবেজ তৈরি, শক্তিশালী ডিজিটাল কর প্রশাসন এবং কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন হবে।

জানতে চাইলে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সম্পদ মূল্যায়ন একটি জটিল প্রক্রিয়া। ফলে বিরোধ ও প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে।’ তিনি যোগ করেন, ‘নিয়ম মেনে চলা করদাতাদের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রভাব ফেলতে পারে এবং এই খাতের একটি অংশ পাচারও হতে পারে।’

স্নেহাশীষ বড়ুয়া আরও বলেন, ‘উচ্চমূল্যের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও যাদের নগদ আয় সীমিত, তারা তারল্য সংকটের সম্মুখীন হতে পারেন। ফলে তারা সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হতে পারেন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।’

তথ্য অনুসারে, এসব কারণে বিশে^র বিভিন্ন দেশ সম্পদ কর ব্যবস্থা বাতিল বা পরিবর্তন করেছে। প্রধানত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কারণে তারা এমনটা করেছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে আগামী অর্থবছরে এই কর কাঠামো চালু হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন এনবিআরের একাংশ।

বিনিয়োগ উদ্বেগে ফ্রান্স এই কর-ব্যবস্থা বাতিল করে। জার্মানি, সুইডেন ও ডেনমার্ক সম্পদ কর বাতিল করে এবং এক্ষেত্রে তিনটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হয়। সেগুলো হলো- প্রশাসনিক জটিলতা, উচ্চ প্রতিপালন ব্যয় ও সম্পদ পাচার।

দেশগুলো জানায়, প্রশাসনিক জটিলতা কর আদায়ের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক। অন্যদিকে কর আদায় ও তথ্য যাচাইয়ের পেছনে সরকারকে উচ্চ প্রতিপালন ব্যয় করতে হতো। তৃতীয়ত, মূলধন পাচার ঠেকানো। সম্পদ করের কারণে অনেক সম্পদশালী ব্যক্তি দেশ থেকে তাদের মূলধন বা পুঁজি বাইরে সরিয়ে নিচ্ছিলেন।