× UCB Sticker Card
শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৬, ০৬:০৬ এএম

কূটনীতিতে অচলাবস্থা

‘লাইফ সাপোর্টে’ যুদ্ধবিরতি

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৬, ০৬:০৬ এএম

‘লাইফ সাপোর্টে’ যুদ্ধবিরতি

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি কার্যত এখন ‘লাইফ সাপোর্টে’ যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে। দুই পক্ষে অনড় অবস্থানের কারণে কূটনৈতিক আলোচনায় সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিকসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের হুমকি-পাল্টা হুমকিতে পুরো অঞ্চল আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। চলমান পরিস্থিতিতে একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জবাবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ ও ‘বোকামিপূর্ণ’ বলে আখ্যা দিয়ে নতুন সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দিচ্ছেন; অন্যদিকে তেহরান জানিয়ে দিয়েছেÑ তাদের ‘আঙুল ট্রিগারে’ রয়েছে এবং যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে তারা প্রস্তুত।

ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করেও ইরান এখনো আলোচনার পথ খোলা রেখেছে। তবে সেই সঙ্গে তারা সতর্ক অবস্থানও বজায় রেখেছে। তার ভাষায়, ইরানের মূল লক্ষ্য টেকসই শান্তি, তবে সেই শান্তি হতে হবে সম্মান, প্রজ্ঞা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।

ট্রাম্পের চোখ আবার হামলায় :

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি এখন ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে। তার অভিযোগ, যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবের জবাবে তেহরান এমন শর্ত দিয়েছে যা বাস্তবসম্মত নয়। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল যুদ্ধবিরতির পর পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলাদা আলোচনা শুরু করতে। কিন্তু ইরান পাল্টা প্রস্তাবে শুধু যুদ্ধ বন্ধ নয়, লেবাননে ইসরায়েলি অভিযান বন্ধ, অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ অর্থ ফেরত, ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা দাবি করেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অবস্থান থেকে সরে আসেনি। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলো নতুন সংকটে পড়েছে।

ট্রাম্পের ভাষায়, ইরানের পাঠানো প্রস্তাব ‘যুদ্ধ শেষের নয়, বরং নতুন সংকটের বার্তা’। তিনি এরই মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। সেখানে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার অভিযান এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি :

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছেন, যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ভুল কৌশল ও ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি বিশ্ব আগেও দেখেছে, এবারও দেখবে।

তেহরান আরও এক ধাপ এগিয়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও নতুন হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি জানান, আবার হামলা হলে দেশটি অস্ত্র তৈরির উপযোগী ৯০ শতাংশ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যদিও ইরান জানিয়েছে, তারা পাঁচ বছরের জন্য সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী ২০ বছরের স্থগিতাদেশ মানতে তারা রাজি নয়।

তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের দাবি তারা কখনোই মেনে নেবে না। বরং যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ হলে পরে আলাদা আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক জ¦ালানি সরবরাহে ধাক্কা :

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের শুরু থেকে ইরান কার্যত এই পথ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।

কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি অভিযোগ করেন, ইরান হরমুজ প্রণালিকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তার মতে, এই অবরোধ শুধু উপসাগরীয় অর্থনীতিকেই নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও হরমুজ সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে মার্কিন জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ আমেরিকান মনে করেন ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করতে পারেনি কেন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে।

ইরানে গোপনে আমিরাতের হামলা :

সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততায়। বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত গোপনে ইরানের তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। পারস্য উপসাগরের লাভান দ্বীপে একটি তেল শোধনাগারে হামলার পর ভয়াবহ অগ্নিকা- ঘটে এবং উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যদিও আমিরাত প্রকাশ্যে এ হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে ইরান এর পাল্টা হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আরব আমিরাত এখন ইরানের সবচেয়ে প্রকাশ্য আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে উপসাগরীয় দেশগুলো নিরপেক্ষ থাকার কথা বললেও বাস্তবে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে। ফলে ইরানও তাদের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।

তেহরানে সংকট, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ :

যুদ্ধ ও অবরোধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনে। আমদানি ব্যাহত হওয়া, শিল্প কারখানায় হামলা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ভাঙনের কারণে দেশজুড়ে নিত্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ইস্পাত শিল্পে বড় ধরনের ক্ষতির কারণে অটোমোবাইল, গৃহস্থালি সরঞ্জাম ও উৎপাদন খাত মারাত্মক সংকটে পড়েছে। বাজারে পণ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা গভীর হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে লাখো মানুষ প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। সরকার-অনুমোদিত কিছু সাইট ছাড়া অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সেবা বন্ধ রয়েছে। তবে ইরানের সরকারি মুখপাত্র দাবি করেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ইন্টারনেট ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করা হবে এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকারকে সরকার নাগরিক অধিকার হিসেবেই দেখে।

কূটনীতির সুযোগ কি শেষ :

বর্তমানে পাকিস্তান, কাতার, তুরস্ক ও মিসর মধ্যস্থতার চেষ্টা চালালেও পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান আলোচনায় আন্তরিক নয়। আবার ইরানও মনে করছে, ওয়াশিংটন যুদ্ধের চাপ ব্যবহার করে আত্মসমর্পণ আদায় করতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষই এখন এমন অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে সামান্য ভুল হিসাবও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও বিভক্তি রয়েছেÑ এক পক্ষ নতুন হামলার পক্ষে, অন্য পক্ষ এখনো কূটনীতিকে সময় দিতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধবিরতি এখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায়। হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা, পারমাণবিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সরাসরি জড়িয়ে পড়া এবং অর্থনৈতিক চাপÑ সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আবারও বিস্ফোরণের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!