ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ০১:৩৪ এএম

বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা, নতুন বিনিয়োগে গতি আনা এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশাল পুনঃঅর্থায়ন ও সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশে ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে প্রত্যাশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গতকাল শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। আগে যেখানে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, পরে তা কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। বর্তমানে তা আরও কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদন খাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।’

গভর্নর বলেন, ‘ব্যাংক খাতে চাপ বেড়েছে, খেলাপি ঋণ বেড়েছে, অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে এবং আমানতকারীদের আস্থাও কমেছে।’

গভর্নর বলেন, “আমরা এমন পরিস্থিতিতে আসছি, যখন ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়ে গেছে। ব্যাংকিং সিস্টেমের এক-তৃতীয়াংশ টাকাই নাই, যেটাকে আমরা ‘সফিসটিকেটেডভাবে’ খেলাপি ঋণ বলছি। এর অংশ চুরি হয়ে গেছে, এর বিপরীতে কোনো জামানত নাই। একই সঙ্গে উচ্চ সুদের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এ বাস্তবতায় অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে এবং বন্ধ শিল্পকারখানা সচল করতে এই বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে।”

গভর্নর জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় দেওয়া হবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা, সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব ১৯ হাজার কোটি টাকার সহায়তা তহবিলে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্সে ৫ হাজার কোটি টাকা, কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে ২ হাজার কোটি টাকা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকা-ে ১ হাজার কোটি টাকা, হিমায়িত মাছ ও ফিশ এক্সপোর্টে ২ হাজার কোটি টাকা, পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন বিনিয়োগে ১ হাজার কোটি টাকা, বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা, স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকা এবং সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

গভর্নর জানান, ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য বরাদ্দ ৫০০ কোটি টাকা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। এটি ঋণ নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, তহবিলটি পুরোপুরি কার্যকর হলে ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে শিল্পকারখানা পুনরায় চালু, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দ ১ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ১ লাখ মানুষের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হবে। অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাজে ঋণ দেওয়া হবে আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে। এতে আনসার ও ভিডিপির লাখো সদস্য উপকৃত হবেন বলে জানানো হয়েছে। সুদের হারের বিষয়ে গভর্নর বলেন, ‘পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ শতাংশ সুদে অর্থ দেবে। ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ স্প্রেড রাখতে পারবে। ফলে বড় ঋণগ্রহীতারা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় সুদের হার কিছুটা বেশি হতে পারে। বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানভিত্তিক ঋণের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি সুদ নির্ধারণ করা হতে পারে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের আশা, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো আবার চালু হবে, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়বে, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হবে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরে আসবে।

এই ঋণ সুদহার ও বড় অঙ্কের ঋণ প্যাকেজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নে গভর্নর বলেন, ‘এ বিষয়ে বিস্তারিত সার্কুলার দেওয়া হবে। তখন জানতে পারবেন।’ খেলাপি ঋণ কমাতে ‘অ্যাসেট রিকোভারি নিয়ে কাজ করছি’ মন্তব্য করে গভর্নর বলেন, যে ১০০ টাকা নিয়েছে, তার কাছে কিন্তু ১০০ টাকা নাই। আমরা এখন কাজ করছি এই টাকা কীভাবে আদায় করা যায়। বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার আগে একক গ্রাহক ঋণসীমা বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করতে ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে বিশাল অঙ্কের ঋণসুবিধা বাড়ালে মূল্যস্ফীতি বাড়বে কি না, সেই প্রশ্নে গভর্নর বলেন, একক ঋণগ্রহীতার ‘এক্সপোজারটা’ কোথায়, তা আপনারা জানেন। তিনি বলেন, ‘এ কারণে আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে, তার (গ্রাহকের) সীমা বাড়ানো দরকার। এর মানে এই নয় যে, ব্যাংক ঋণ দিয়ে দেবে। আমরা প্রত্যাশা করি, ব্যাংক ভালো গ্রাহককে দেবে।’ গভর্নর বলেন, ‘এই ঋণে সরকার ৬ শতাংশ হারে সুদ ভর্তুকি দেবে। এখানে অতিরিক্ত কোনো টাকা ছাপানো হবে না। এটা ব্যাংকিং খাতের টাকা, ব্যাংক থেকেই দেওয়া হবে। কিছু ব্যাংকের অতিরিক্ত তারল্য আছে, তা ঋণ দিয়ে আবার ব্যাংকে ফিরিয়ে আনা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব, লু-ফলসগুলো যেন ঠিক করা হয়, তা সার্কুলারের মাধ্যমে জানানো হবে।’ বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ৫ শতাংশের নিচে নেমেছে। অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এখন ঋণ প্যাকেজ না দেওয়া ছাড়া উপায় নেই বলে মনে করেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের হাতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল (চলতি মূলধন) ড্রাই হয়ে গেছে। তাদের কাছে টাকা নাই। অর্থনীতি যে অবস্থায় আছে, এই মুহূর্তে এটা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো চয়েস নাই। ইকোনোমি বুস্ট করার জন্য করতে হয়েছে।’