ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান

সবগুলো ব্লকে চলবে অনুসন্ধান

স্বপ্না চক্রবর্তী
প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ০১:৩৮ এএম

আজ রোববার আবারও বহুল প্রত্যাশিত সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে সরকার। সর্বোচ্চ আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে উৎপাদন অংশীদার চুক্তিকে (পিএসসি)। তাই এক্সনমোবিল, শেভরনসহ বিশে^র বড় বড় কোম্পানি দরপত্র ক্রয়ে আগ্রহী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান টুকু রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিগত সরকারের আমলে ডাটার দামই আলাদা করে রাখা হয়েছিল। যেখানে বিশে^র অন্যান্য দেশ ফ্রি ডাটা সাপ্লাই দেয়। শুধু তাই নয়, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের করপোরেট ‘আয়কর’ও পরিশোধ করবে পেট্রোবাংলা। তাই আমরা আশা করছি, বিশে^র ‘জায়ান্ট’ কোম্পানিগুলো এ দরপত্র ক্রয়ে আগ্রহী হবে।

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ তার সমুদ্রসম্পদ কাজে লাগাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সাগরের বিশাল জলরাশিতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি যেমন হয়নি, তেমনি অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদ আহরণেও নেওয়া হয়নি তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ। তবে বিগত বছরগুলোতে বেশ কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টার পর, বর্তমান নতুন সরকার প্রথমবারের মতো বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে। এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আজ শনিবারই (গতকাল) সবগুলো ব্লকের জন্যই একযোগে দরপত্র আহ্বান করার কথা ছিল। কিন্তু কিছু টেকনিক্যাল কারণে আগামীকাল রোববার (আজ) এটি হচ্ছে। যার বিস্তারিত বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী সাংবাদিকদের ব্রিফ করবেন।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ উদ্যোগ ও পিএসসি ২০২৬ : জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অতীতের নানা ভুলত্রুটি ও বিদেশি কোম্পানিগুলোর অনীহার কারণগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনা করে এবারের দরপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক বিডিং প্রক্রিয়া গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য একগুচ্ছ আকর্ষণীয় সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এবারের নীতিমালার মূল লক্ষ্যই হলো সরকার ও বিনিয়োগকারী উভয় পক্ষের স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রেখে যোগ্য, দক্ষ ও অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের গতি বাড়াতে এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’-এ বেশ কিছু যুগান্তকারী সংশোধন আনা হয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ইতিমধ্যে এই নতুন মডেলের খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচিত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ‘এমপিএসসি ২০২৬’ কাঠামোর আওতায় চুক্তি সই করা হবে।

এই সংশোধিত নীতিমালার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, ঠিকাদার কোম্পানিগুলো তাদের অর্জিত মুনাফা সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব দেশে ফেরত নিয়ে যেতে পারবে। এ ছাড়া চুক্তির শুরুতে কোনো ধরনের সিগনেচার বোনাস কিংবা রয়্যালটি পরিশোধ করতে হবে না। সমুদ্রবক্ষে অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদনÑ এই তিনটি প্রধান ধাপে আমদানীকৃত সমস্ত যন্ত্রপাতি ও মেশিনারির ওপর শতভাগ শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হবে। এমনকি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ওপর ধার্যকৃত করপোরেট আয়করও সম্পূর্ণ পরিশোধ করবে পেট্রোবাংলা। পাশাপাশি, অগভীর ও গভীর সমুদ্র উভয় ব্লকের জন্যই শতভাগ কস্ট রিকভারি বা ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুবিধা রাখা হয়েছে, যার আওতায় কোম্পানিগুলো বছরে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় তুলে নিতে পারবে।

ব্লকের বিন্যাস ও আবেদনের সহজ নিয়মাবলি : পেট্রোবাংলা বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানার মোট ২৬টি অফশোর ব্লক তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে। এই ব্লকগুলোর মধ্যে ‘এসএস-০১’ থেকে ‘এসএস-১১’ পর্যন্ত মোট ১১টি ব্লক অগভীর সমুদ্রে অবস্থিত। অন্যদিকে, ‘ডিএস-০৮’ থেকে ‘ডিএস-২২’ পর্যন্ত বাকি ১৫টি ব্লক রয়েছে গভীর সমুদ্রে।

পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এককভাবে কিংবা যৌথ উদ্যোগ গঠনের মাধ্যমে এক বা একাধিক ব্লকের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবে। এবারের টেন্ডারে অংশগ্রহণকারীদের আর্থিক সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে একটিমাত্র টেন্ডার শিডিউল বা দরপত্র দলিল ক্রয় করেই একাধিক ব্লকে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে প্রতিটি আলাদা গভীর ও অগভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য পৃথক পৃথক প্রস্তাব বা আবেদন জমা দিতে হবে। তবে ভৌগোলিকভাবে পরস্পর সংলগ্ন দুটি গভীর সমুদ্র ব্লকের ক্ষেত্রে একটি একক চুক্তির আওতায় যৌথ আবেদন করার বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে।

গ্যাসের নতুন মূল্য কাঠামো ও অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত : অফশোর প্রকল্পগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে ও বাণিজ্যিক দিক থেকে লাভজনক করতে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে যেখানে গ্যাসের দাম উচ্চ সালফার ফুয়েল অয়েলের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হতো, এখন থেকে তা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।

নতুন ব্যবস্থার আওতায়, গভীর সমুদ্র ব্লকে উত্তোলিত গ্যাসের দাম নির্ধারিত হবে বিগত তিন মাসের গড় ব্রেন্ট মূল্যের ১১ শতাংশ হারে। অন্যদিকে, অগভীর সমুদ্র ব্লকের ক্ষেত্রে এই হার ধরা হয়েছে ১০.৫ শতাংশ, যা ২০২৩ সালের মূল্য কাঠামোয় ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা থেকে সুরক্ষার জন্য গত পাঁচ বছরের সর্বনি¤œ ও সর্বোচ্চ গড় ব্রেন্ট মূল্যের ভিত্তিতে একটি ফ্লোর মূল্য (সর্বনি¤œ) এবং সিলিং মূল্য (সর্বোচ্চ) নির্ধারণ করা হবে। এই কাঠামো অনুযায়ী প্রতি ব্যারেলের সর্বনি¤œ মূল্য ৭০ ডলার এবং সর্বোচ্চ ১০০ ডলার ধরে গ্যাসের দাম হিসাব করা হবে এবং প্রতি পাঁচ বছর পর পর এই মূল্য কাঠামো পুনর্বিবেচনা বা সমন্বয় করা হবে।

এর বাইরেও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি কমাতে ও লাভজনকতা বাড়াতে চুক্তিতে স্বার্থ হস্তান্তর ও শেয়ার ট্রান্সফারের নমনীয় সুযোগ রাখা হয়েছে। উৎপাদিত গ্যাসের ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার ‘রাইট অব ফার্স্ট রিফিউজাল’ বা প্রথম ক্রয়ের অধিকার বজায় থাকবে; তবে পেট্রোবাংলা গ্যাস না কিনলে ঠিকাদার কোম্পানি তাদের অংশ দেশীয় বাজারে যেকোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করতে পারবে। এমনকি একই শর্ত মেনে উদ্বৃত্ত গ্যাস বিদেশে রপ্তানির সুযোগও রাখা হয়েছে।

বাধ্যতামূলক কাজের অংশ হিসেবে এবার শুধু টু-ডি (দ্বিমাত্রিক) সিসমিক জরিপকে নির্দিষ্ট রাখা হয়েছে, যদিও দরদাতাদের অতিরিক্ত কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। তবে কোনো দরদাতা কোম্পানি যদি পেট্রোবাংলার কাছে থাকা বিদ্যমান টু-ডি মাল্টিক্লায়েন্ট সিসমিক ডাটা কিনে নেয়, তবে তাদের জন্য বাধ্যতামূলক কাজের পরিমাণ আনুপাতিক হারে কমিয়ে দেওয়া হবে। প্রথম অনুসন্ধান কূপ খননের পর সেটি যদি শুকনো বা বাণিজ্যিকভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে ঠিকাদার কোম্পানিকে উৎসাহিত করতে দ্বিতীয় বা পরবর্তী কূপগুলোর ক্ষেত্রে বেশি মুনাফা ভাগের আকর্ষণীয় প্রস্তাব রাখা হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর ন্যূনতম অনুসন্ধান কর্মসূচি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা হিসেবে নির্ধারিত ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিতে হবে। এ ছাড়া, দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে অগভীর সমুদ্র ব্লকের ক্ষেত্রে তাদের ১০ শতাংশ ‘ক্যারিড ইন্টারেস্ট’ বা বিনা পুঁজিতে অংশীদারিত্ব দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অবশ্য সরকার বিশেষ প্রয়োজনে যেকোনো সফল দরদাতাকে সীমিতসংখ্যক ব্লক বরাদ্দ দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা নিজের কাছে সংরক্ষণ করবে।

অংশগ্রহণের কঠোর যোগ্যতা : আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য কোম্পানিগুলোর কারিগরি ও আর্থিক যোগ্যতার বিষয়ে কিছু ন্যূনতম শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যোগ্যতা হিসেবে বলা হয়েছে, আগ্রহী আবেদনকারী কোম্পানিকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে অন্তত একটি অফশোর ব্লকের সফল অপারেটর বা পরিচালনাকারী হতে হবে। একই সঙ্গে দৈনিক ন্যূনতম ১০ হাজার ব্যারেল তেল অথবা ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস উৎপাদনের বাস্তব ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

রোড শো ও আন্তর্জাতিক প্রচারের মহাপরিকল্পনা : জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আগামী রোববার আন্তর্জাতিক দরপত্র বিজ্ঞপ্তি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। এরই মধ্যে জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সফলভাবে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এবারের দরপত্রটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয়। বিশেষ করে গ্যাসের ট্যারিফ, পাইপলাইন নির্মাণ ব্যয়, তথ্য-উপাত্তের মূল্য হ্রাস এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে অংশগ্রহণের হার সংশোধনের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করা হয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আকৃষ্ট করা।’ তিনি আরও জানান, দরপত্র আহ্বানের পাশাপাশি ব্যাপক প্রচারের জন্য আন্তর্জাতিক ‘রোড শো’ এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বিদেশি দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়ে প্রচারণা চালানোর জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আজ রোববার টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর থেকেই প্রমোশনাল প্যাকেজ বা তথ্য-উপাত্তের বিবরণী বিক্রি শুরু হবে। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে সাগরের ভূপ্রকৃতি ও জরিপের ডাটা যাচাই-বাছাই করার পর্যাপ্ত সময় দিতে এই দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক দরপত্রের এই প্রমোশনাল প্যাকেজ আগামী ১ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হচ্ছে। এরপর দেশে ও বিদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলতে ‘মিট দ্য প্রেস’, দেশি ও আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে বিশেষ চিঠি পাঠানো এবং আন্তর্জাতিক রোড শোর মতো বড় বড় প্রচারণামূলক কর্মসূচির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে পেট্রোবাংলা।