ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

সিলেটে বৃষ্টিতেও স্বস্তি নেই

সিলেট ব্যুরো
প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০৫:৪৪ এএম

টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটে সুরমাসহ প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তবে কাক্সিক্ষত বৃষ্টির দেখা মিললেও কমেনি ভ্যাপসা গরমের তীব্রতা। একদিকে গুমোট ও আর্দ্র আবহাওয়ায় জনজীবন ওষ্ঠাগত, অন্যদিকে দ্রুত নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকায় অববাহিকার বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে তৈরি হচ্ছে আগাম বন্যার আতঙ্ক। বিশেষ করে নিচু এলাকার বোরো ধান কাটার শেষ মুহূর্তে এসে এই আকস্মিক বৈরী পরিস্থিতি কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। একদিকে প্রকৃতির ভ্যাপসা রূপ, শেষ মুহূর্তের ফসল রক্ষার লড়াই, অন্যদিকে সুরমার ফুঁসে ওঠা পানিÑ এই তিনে মিলে এক চরম অস্বস্তিকর ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি পুরো সিলেট অঞ্চল।

সিলেট আবহাওয়া অফিস জানায়, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কারণে গত কয়েকদিন ধরেই সিলেটে দফায় দফায় বৃষ্টি হচ্ছে। তবে বৃষ্টি হলেও বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে ভ্যাপসা গরমের তীব্রতা কমছে না। বৃষ্টি থামার পরপরই তীব্র গুমোট পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষকে চরম অস্বস্তিতে ফেলছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট ও তৎসংলগ্ন উজানের ভারতীয় অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী এবং কোনো কোনো স্থানে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। মেঘলা আকাশ ও বৃষ্টির আভাস থাকলেও আর্দ্রতা বেশি থাকায় গরমের অস্বস্তিকর অনুভূতি আরও দু-একদিন বজায় থাকতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গতকালের তথ্য অনুযায়ী, সুরমাসহ সিলেটের প্রধান নদ-নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমান্তের ওপারে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় উজান থেকে আসা ঢলে নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে।

আগের দিন সোমবার সুরমা নদীর সিলেট পয়েন্টে পানির লেভেল যেখানে ছিল ৭.২৩ মিটার, গতকাল মঙ্গলবার সকালে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৮৬ মিটারে। অর্থাৎ মাত্র ২৪ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ১.৬৩ মিটার। যদিও এই পয়েন্টে পানি এখনো বিপদসীমার (১০.৮০ মিটার) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তবে বৃদ্ধির গতি অত্যন্ত দ্রুত। অন্যদিকে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে কানাইঘাট পয়েন্টেও সুরমার পানি বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন ও ডাউকি নদীর পানি।

সিলেটের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের বিভিন্ন উপজেলা এবং সংলগ্ন হাওরাঞ্চলের নিচু এলাকায় এখনো কিছু বোরো ধান কাটা বাকি। সাধারণত মে মাসের শেষ থেকে জুনের প্রথমার্ধের মধ্যে নিচু এলাকার ফসল ঘরে তোলার তোড়জোড় চলে। তবে নদীগুলোর পানি এভাবে হঠাৎ বাড়তে থাকায় এবং নদী তীরবর্তী নিচু জমি প্লাবিত হওয়ার উপক্রম হওয়ায় কৃষকরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক জায়গায় বাঁধের সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মাঝে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কৃষকরা জানান, আর মাত্র কয়েকটা দিন ঠিকঠাক থাকলে সম্পূর্ণ ধান নিরাপদে ঘরে তোলা সম্ভব হতো। কিন্তু পানি বৃদ্ধির বর্তমান গতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে শেষ মুহূর্তের এই ফসল তলিয়ে যাওয়ার ব্যাপক ঝুঁকি রয়েছে। নদীগুলোর তলদেশ পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ধীর হচ্ছে, যা আগাম বন্যার আশঙ্কাকে আরও উসকে দিচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, আপাতত প্রধান নদীগুলোর পানি বিপদসীমার নিচে থাকলেও ভারতের চেরাপুঞ্জি ও সংলগ্ন মেঘালয় পাহাড়ে ভারী বৃষ্টি চললে ঢলের তীব্রতা আরও বাড়বে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের আগাম সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল সকাল থেকে সিলেটের আকাশে ছিল মেঘ-বৃষ্টির আভাস, সঙ্গে তীব্র ভ্যাপসা গরম। নগরীর কর্মজীবী মানুষ বলছেন, বৃষ্টির কারণে ঘরের বাইরে বের হওয়া যেমন কঠিন, তেমনি ঘরের ভেতরেও গুমোট গরমে টেকা দায়। এর ওপর নদীর পানি বৃদ্ধির খবরে নদী তীরবর্তী ও নিচু এলাকার বাসিন্দারা বন্যার আশঙ্কায় রাত জাগছেন।