ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

বাজেটে কৃষি খাত ফের উপেক্ষিত

শাহীনুর ইসলাম শানু
প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৬, ০৫:৪৪ এএম

কৃষি খাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ। তবু প্রতি বছরে কৃষির প্রতিটি খাত এবং উপখাতে বাজেট বরাদ্দ কমিয়েছে সরকার। যার কারণে ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ৫২ বছরে কৃষিতে বরাদ্দ কমেছে ৫ গুণ। ২০১১-১২ অর্থবছরে মোট বাজেটের ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ কৃষিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে বরাদ্দ কমতে থাকায় জিডিপির অবদানও হ্রাস পেয়েছে।

১৯৭২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে খাদ্যশস্য উৎপাদন পাঁচগুণ বাড়লেও বরাদ্দ বাড়েনি। অন্যদিকে, বাজেটে বরাদ্দ কমতে থাকায় ৫০ শতাংশ কৃষকের দেশে কমেছে কৃষি শ্রমিক ও বড় গৃহস্থ। ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে নতুন করে কৃষিকে পেশা হিসেবে নিতে পারেনি তরুণরা। নানামুখী সমস্যায় বড় গৃহস্থ পরিবারের সংখ্যা কমলেও বেড়েছে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা; যা আশঙ্কাজনক বলছেন অর্থনীতিবিদরা। ফলে আগামীদিনে কৃষক সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশ।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে বাজেট প্রস্তাবে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়; যা জিডিপির ০.৬৩ শতাংশ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩৭ হাজার ১২৬ কোটি টাকা; যা জিডিপির ০.৬১ শতাংশ। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরের জন্য এ খাতে বরাদ্দ ৬ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশই ছিল কৃষি জিডিপির অবদান। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ শতাংশে। কৃষির প্রতিটি উপখাতেও একই ধরনের আনুপাতিক হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে ফসল, প্রাণিসম্পদ, বন ও মৎস্য খাতের অবদান যথাক্রমে জিডিপির ৫ দশমিক ০৬, ১ দশমিক ৮১, ১ দশমিক ৭২ ও ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে মোট কৃষি উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আত্মনির্ভরতার পথে কৃষি খাত উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৭২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে খাদ্যশস্য উৎপাদন পাঁচগুণ বেড়েছে। গত ৫২ বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ শতাংশ ছিল। এর ফলে উৎপাদন ১৯৭৩ সালের ১১০ লাখ টন থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৫০৩ দশমিক ৫৪ লাখ টনে পৌঁছেছে।

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে এ খাতের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ জাতীয় বাজেটে কৃষির অংশীদারিত্ব বছর বছর কমছে। গত ১৪ অর্থবছর ধরে মোট বাজেটের ১০ শতাংশের নিচেই রয়েছে কৃষি খাতের বরাদ্দ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ৫ দশমিক ৯ শতাংশে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিতে এই ধারাবাহিক অবহেলা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের আয় এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বরাদ্দ, ভর্তুকি, গবেষণা, যান্ত্রিকীকরণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কার আনার দাবি উঠেছে।

বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ১১ শতাংশ। দেশের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং গ্রামীণ নারীদের প্রায় ৬০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বাজেটে কৃষির অংশ ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে মোট বাজেটের ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ কৃষিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশে। চলতি অর্থবছরে তা আরও কমে ৫ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।

চলতি অর্থবছরে কৃষিবিষয়ক পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৬ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরাসরি শস্য খাতে বরাদ্দ ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা; যা মোট বাজেটের মাত্র ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অপরদিকে কৃষি ভর্তুকির পরিমাণও কার্যত স্থবির। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি ভর্তুকি ছিল ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকায়।

দেশে গত চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি স্থায়ী রূপ নিয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছুটা কমেছে, তবু এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি এখনো অন্যতম উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র টেকসই উপায় হলো কৃষি উৎপাদন বাড়ানো। কিন্তু কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশে। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কৃষি প্রবৃদ্ধি অন্তত ৪ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কৃষিতে ভর্তুকি ব্যয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। কৃষিতে বিনিয়োগ কমলে উৎপাদন কমবে, আমদানিনির্ভরতা বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি আসন্ন বাজেটে কৃষি খাতে মোট বাজেটের অন্তত ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সম্ভাব্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বিবেচনায় এ বরাদ্দ দাঁড়াবে প্রায় ৮৮ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি গবেষণায় সরকারি বিনিয়োগ এখনো অত্যন্ত কম। বর্তমানে কৃষি-জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় হয়, যেখানে অনেক দেশে তা ৩ থেকে ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে দেশে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের সক্ষমতাও সীমিত। বর্তমানে সরকারি খাদ্যগুদামের ধারণক্ষমতা প্রায় ২২ লাখ টন। অথচ প্রয়োজন কমপক্ষে ৬০ লাখ টন ধারণক্ষমতা। কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক গুদাম ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প না থাকায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ফল, সবজি ও কৃষিপণ্য নষ্ট হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদন করেন নাÑ দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিতও রক্ষা করেন। তাই বাজেটে কৃষিকে প্রান্তিক না রেখে কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়াই এখন সময়ের দাবি।