ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

বাজেটে সরকারের ১০ অগ্রাধিকার

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৬, ০৫:৪৭ এএম

বৈষম্যহীন, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ১০টি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। উন্নয়নের সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই এ অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের এই ১০ দফা অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন। বাজেট বক্তৃতায় মন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল ধারায় যুক্ত করতে সুষম অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা হবে। উন্নয়নের সুফল যেন কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে লক্ষ্যেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

শিক্ষায় দক্ষতা ও মূল্যবোধের সমন্বয় : মন্ত্রী বলেন, সরকার শিক্ষাকে মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। বাস্তবমুখী, দক্ষতাভিত্তিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলে তরুণদের কর্মক্ষম ও প্রতিযোগিতামূলক জনশক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা খাতে সংস্কার কার্যক্রমও জোরদার করা হবে।

সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা : স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে বাজেটে সর্বজনীন ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শহর ও গ্রামের ব্যবধান কমিয়ে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষায় জীবনচক্রভিত্তিক পরিকল্পনা : শিশু, কিশোর, কর্মজীবী, নারী, প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাগরিকসহ সব শ্রেণির মানুষের জন্য একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষাবলয় গড়ে তুলতে চায় সরকার। জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে জোর : পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকা- সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষিকে উৎপাদন, জীবিকা এবং খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম কৌশলগত খাত হিসেবে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ : বিনিয়োগ ও ব্যবসা সহজ করতে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ বা ডিরেগুলেশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি সেবায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ কমিয়ে স্বচ্ছ, সহজ ও ব্যয়-সাশ্রয়ী ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা : ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে সংস্কার এনে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার : শিল্প ও উৎপাদন খাতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সরকার বলছে, সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি-ব্যবস্থারমাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

আইসিটি রপ্তানিতে নতুন লক্ষ্য : তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশকে বিশে^র অন্যতম প্রধান আইসিটি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি, উদ্ভাবন এবং ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ খাতকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব : জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জনগণের অংশগ্রহণে বনায়ন কর্মসূচিকে আরও সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নদ-নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা, খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দক্ষ প্রশাসন গঠনের পরিকল্পনা : টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ে তুলতে মেধাভিত্তিক, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর বিষয়টিও অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব অগ্রাধিকারের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি অংশগ্রহণমূলক, মানবিক ও টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। এতে উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত আরও শক্তিশালী হবে।