বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক মিলেমিশে কাজ করার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে। দুই দেশের জনগণের জন্য যা ভালো হয়, আগামী দিনে তা-ই করা হবে। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে সড়কপথে বাংলাদেশের ভূখ-ে প্রবেশ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। এ সময় বেনাপোল নোম্যান্স ল্যান্ডে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ভারতীয় দূতাবাস ও বেনাপোল স্থলবন্দরের কর্মকর্তারা তাকে অভ্যর্থনা জানান। সঙ্গে তার সহধর্মিণী মিনাল ত্রিবেদী ছিলেন। পরে সড়কপথে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।
এ সময় ‘পুশইন’ নিয়ে সীমান্তে উত্তাপ এবং ভ্রমণ ও বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার প্রশ্নে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘ভারত ও বাংলার একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা। আমার তো মনে হচ্ছে না, আমি বাংলাদেশে এসেছি। ভারতের ১৪০ কোটি আর বাংলাদেশের ২০ কোটি, এই ১৬০ কোটি জনগণের জন্য যা ভালো হয় সেটাই করা হবে। দুই দেশের জন্য ভালো হয় সেই পদক্ষেপ সামনের দিনে নেব।’
তিনি বলেন, টেকনোলজি ইনোভেশন (প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন) যা হচ্ছে, তা ভারত-বাংলাদেশ মিলেই হচ্ছে। একটা ক্রিকেট দল যদি মিলেমিশে হয়, তাহলে কত ভালো হবে। খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, টেকনোলজি সব মিলেমিশে কাজ করব। এ জন্য উভয় পক্ষের সমর্থন থাকতে হবে।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘আমার একমাত্র অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক। আমরা সবাই ভাই-বোন। আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন শুধু ভালোবাসা ও পারস্পরিক আন্তরিকতা। তাহলেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’ দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু সীমান্তের নয়। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও আমরা যুক্ত। যারা আমাদের ভাই-বোন ও মাÑ তাদের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গত এপ্রিল মাসে ভারত সরকার ভারতের সাবেক রেলমন্ত্রী ও ব্যারাকপুরের সাবেক এমএলএ বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশের ১৮তম হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হলেন। বাংলাদেশে ভারতীয় মিশনে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন পেশাদার কূটনীতিক প্রণয় ভার্মা। তাকে এরই মধ্যে বেলজিয়াম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভারতের কূটনৈতিক প্রথায় সাধারণত অভিজ্ঞ ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিস (আইএফএস) কর্মকর্তাদের হাইকমিশনার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। দীনেশ ত্রিবেদীর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটল। দুই দেশের ৫৫ বছরের সম্পর্কের ইতিহাসে ভারত এই প্রথম কোনো রাজনীতিবিদকে হাইকমিশনার হিসেবে বাংলাদেশে পাঠাল।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর ধারণার কারণে ৭৫ বছর বয়সি দীনেশ ত্রিবেদীকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পাঠিয়েছে ভারত সরকার। গুজরাটি ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য হলেও ঝরঝরে বাংলা বলতে পারেন তিনি। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। একসময় সর্বভারতীয় রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূত ছিলেন দীনেশ ত্রিবেদী। ২০১৬ সালের পর তাদের সম্পর্কে অবনতি ঘটতে শুরু করে। শেষমেশ ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটের আগে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। হাইকমিশনার হিসেবে বাংলাদেশে তার দায়িত্ব গ্রহণ দুই দেশের মধ্যে চলমান সীমান্ত উত্তাপ বন্ধ, ভিসা ও বাণিজ্য সহজীকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতীয় হাইকমিশন জানিয়েছে, দীনেশ ত্রিবেদী এবং মিনাল ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ডেপুটি হাইকমিশনার পবনকুমার তুলসী দাস। ঢাকাস্থ দূতাবাসে যোগ দিতে শুক্রবার সকালে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে সড়কপথে বাংলাদেশে পৌঁছেন তিনি। দুপুর ১২টার দিকে বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম সম্পন্ন করেন নবনিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার ও তার সহধর্মিণী মিসেস মিনাল ত্রিবেদী। এ সময় বেনাপোল স্থলবন্দরে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পবনকুমার তুলসী দাস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি চিফ অব প্রটোকল অফিসার আরিফ মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। তারা নবনিযুক্ত হাইকমিশনারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এই প্রথম নবনিযুক্ত কোনো ভারতীয় হাইকমিশনার সড়কপথে বাংলাদেশে এলেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন