ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

দুবাই থেকে সিডনি

বেনজীরের বৈঠক-ছবি ঘিরে নতুন আলোচনা

শিপন আহমদ, সিডনি থেকে
প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ০৫:৫৯ এএম

দুবাইয়ে বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার হয়েছেনÑ এমন খবর প্রকাশের পর অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে তার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠক এবং সেই সময়ের একটি ছবি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সিডনিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকের ছবি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়লে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

‘অস্ট্রেলিয়ান বেঙ্গলি’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে শেয়ার করা এক পোস্টে লেখা হয়, ‘বেনজীর আংকেল কট খাওয়ার এই দিনে সিডনিতে তাকে সংবর্ধনাদানকারীদের কথা মনে পড়ে।’

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. নার্গিস বানুও এ বিষয়ে একাধিক ফেসবুক পোস্ট করেন। এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘অবশেষে বেনজীরকে নাকি দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সত্য উদ্ঘাটন হলে ফেঁসে যেতে পারে কমিউনিটির কিছু পরিচিত মুখ।’ অন্য এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘বেনজীরের নামে অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে মহিলাসহ দু-একটা সাদা মানুষ নিয়ে সেই একই এইডের ধান্দাবাজি শুরু। সাবধান!’ পরে মন্তব্যে তিনি আরও লেখেন, ‘বেনজীরকে সেবাদানকারী সিডনির চক্রটি এখন দেশে বিএনপির নেতাদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে।’ এসব পোস্টের নিচে অনেকেই সংশ্লিষ্টদের পরিচয় প্রকাশ এবং বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানের দাবি জানান।

বেনজীর আহমেদকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। ২০২৪ সালে ‘ইনভেস্টিগেট অ্যান্ড ডিপোর্ট বেনজীর আহমেদ ফ্রম সিডনি’ শিরোনামে চেঞ্জ ডট ওআরজিতে একটি পিটিশন চালু করা হয়। স্বাধীন বাংলা পডকাস্টের পক্ষে তৌহিদ হোসেনের উদ্যোগে প্রকাশিত ওই আবেদনে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ, নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও গণমাধ্যমের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগে জমা দেওয়া তথ্য অধিকারসংক্রান্ত নথিতেও বেনজীরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়টি উঠে আসে।

একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে পরিচিত বেনজীর আহমেদ বর্তমানে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আলোচিত। দেশে তার বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চললেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ ও ২ এপ্রিল তাকে ঘিরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তিনি প্রথমে সিঙ্গাপুরে যান। পরে মালয়েশিয়ায় ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচির আওতায় কেনা একটি বাড়িতে অবস্থান করেন। সেখান থেকে দুবাই ও পর্তুগাল হয়ে শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাস শুরু করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সিডনিতে তার একটি ব্যক্তিগত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি অংশ নেন। ওই বৈঠকের একটি ছবিও সে সময় প্রকাশিত হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে প্রায় ৪৩ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামে প্রায় ৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা, স্ত্রী জীশান মির্জার নামে ২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, বড় মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীরের নামে ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের নামে প্রায় ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। এসব সম্পদের বিষয়ে আদালতের নির্দেশে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বেনজীর আহমেদসহ কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অভিযোগও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হয়।

প্রবাসী কমিউনিটির বিভিন্ন ব্যক্তির মতে, বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবরে অস্ট্রেলিয়ায় তার অবস্থান, যোগাযোগ ও সম্ভাব্য আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে পুরোনো আলোচনা আবার সামনে এসেছে। কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব আবিদুর রহমান বলেন, অতীতে বেনজীরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তি বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছেন বলে আলোচনা রয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অনুসন্ধান করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

প্রবাসী শাহিন আহমদের মতে, বেনজীরকে ঘিরে যে আলোচনা চলছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও সামনে আসা প্রয়োজন। অন্যদিকে কমিউনিটি নেতা শিপন আহমদ বলেন, অনেকের ধারণা সিডনিতে বেনজীরের অনুসারীদের একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল। তার গ্রেপ্তারের পর সেই সম্পর্ক ও যোগাযোগগুলো আবার আলোচনায় এসেছে।

অস্ট্রেলিয়া বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হায়দার আলী বলেন, বাংলাদেশে বেনজীরকে ঘিরে প্রকাশিত তথ্যের পর প্রবাসী সমাজে তার প্রভাব ও যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। তার দাবি, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি এখন অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন এবং তাদের বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের সচেতন মহলের অনেকে মনে করেন, বেনজীর আহমেদকে ঘিরে বিতর্ক এখন আর শুধু বাংলাদেশের একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ নেই। বিষয়টি ক্ষমতার ব্যবহার, জবাবদিহি, দুর্নীতি, মানবাধিকার এবং প্রবাসী রাজনীতির নানা প্রশ্নকে সামনে এনে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।