সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো তথা নবম পে-স্কেল আগামী জুলাই মাস থেকেই কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে কীভাবে এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে, সে কৌশল এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন কৌশল চূড়ান্ত করতে সচিব কমিটির একটি বৈঠক গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটির এ বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ, সচিব কমিটির পর্যবেক্ষণ, জুডিসিয়াল সার্ভিস পে-কমিশনের প্রস্তাব এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। তবে বৈঠকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আগামী ২৪ জুন কমিটির আরও একটি বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২৪ জুনের পরও একাধিক বৈঠক হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন শুরু হবে। জাতীয় বেতন কমিশনের মূল সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে তা কাটছাঁট করে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে (২০২৬-২৭ অর্থবছর) সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ এবং বিভিন্ন বাহিনীর কর্মীরা নতুন বেসিক বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। দ্বিতীয় ধাপে (২০২৭-২৮ অর্থবছর) বাকি ৫০ শতাংশ বেসিক দেওয়া হবে। তৃতীয় ধাপে (২০২৮-২৯ অর্থবছর) বিভিন্ন ভাতা ও সুবিধা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে।
সূত্র আরও জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হলেও বাড়তি অর্থ সরকারি চাকরিজীবীরা হাতে পেতে পারেন অক্টোবর মাসে। কারণ বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগবে।
এদিকে গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি বাজেটেও সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতার জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ মোট ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর্মকর্তাদের বেতনের জন্য ১৪ হাজার ৪ কোটি টাকা, কর্মচারীদের বেতনের জন্য ৩০ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন ভাতার জন্য ৪৫ হাজার ১২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া জনপ্রশাসন খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৫৫ কোটি টাকা বাড়িয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বাড়তি বরাদ্দের একটি বড় অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নে ব্যয় করা হতে পারে।
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২১ সদস্যের বেতন কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেয়। প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে অনলাইনে পরিচালিত জরিপে ২ লাখ ৩৬ হাজার অংশগ্রহণকারী মতামত দেন। মূল্যস্ফীতি, জীবনমানসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত বিবেচনায় নেয় বেতন কমিশন। নতুন বেতন কাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়। বর্তমানে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য যাতায়াত ভাতা রয়েছে। নতুন বেতন কমিশন এ ভাতা ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত দেওয়ার সুপারিশ করে। প্রথম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া তুলনামূলক কম হারে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে বাড়িভাড়ার হার তুলনামূলক বেশি রাখার সুপারিশ করে কমিশন।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ২য় গ্রেডের বেতন ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা এবং ৩য় গ্রেডের বেতন ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪র্থ গ্রেডের বেতন ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা, ৫ম গ্রেডের ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা, ৬ষ্ঠ গ্রেডের ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, ৭ম গ্রেডের ৫৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকা, ৮ম গ্রেডের ৪৭ হাজার ২০০ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা, ৯ম গ্রেডের ৪৫ হাজার ১০০ থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১০ম গ্রেডের ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
১১তম গ্রেডের বেতন ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা, ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ থেকে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা, ১৩তম গ্রেডের ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা, ১৪তম গ্রেডের ২৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা, ১৫তম গ্রেডের ২২ হাজার ৮০০ থেকে ৫৫ হাজার ২০০ টাকা, ১৬তম গ্রেডের ২১ হাজার ৯০০ থেকে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা এবং ১৭তম গ্রেডের ২১ হাজার ৪০০ থেকে ৫১ হাজার ৯০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৮তম গ্রেডের বেতন ২১ হাজার থেকে ৫০ হাজার ৯০০ টাকা, ১৯তম গ্রেডের ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৪৯ হাজার ৬০০ এবং ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার থেকে ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

