সিলেটজুড়ে আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বিদ্যুৎ বিপর্যয়। ঘন ঘন অঘোষিত লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ার পর এভাবে দফায় দফায় বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে।
বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, লোডশেডিংয়ের হার ৩৫ শতাংশের কাছাকাছি; কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দিনের অর্ধেক সময়ই তারা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। লোডশেডিং করা হচ্ছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়।
সূত্র জানায়, সিলেট মহানগর ও জেলা সদরে প্রতি এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ এলেও গ্রামীণ এলাকার পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়। গ্রামাঞ্চলে দিন-রাত মিলিয়ে গড়ে ছয় ঘণ্টাও বিদ্যুৎ মিলছে না, যা গ্রামীণ অর্থনীতি ও জনজীবনকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চলমান বিশ^কাপ ফুটবলের ম্যাচগুলো দেখতে পারছেন না ক্রীড়ামোদীরা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন সিলেটের ফুটবলভক্তরা।
গ্রীষ্মের প্রচ- দাবদাহ ও সীমাহীন লোডশেডিংÑ এই দ্বিমুখী সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। লোডশেডিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অফিস-আদালতেও, কমছে কাজের গতি। স্থবিরতা নেমে এসেছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-কারখানাও।
বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্টদের দাবি, অতিরিক্ত গরমে দেশজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধি না হওয়ায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি কেউ।
সিলেট পল্লী বিদ্যুতের জোনাল অফিস সূত্র জানায়, সম্প্রতি কয়েক দফায় বিদ্যুতের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সিলেটেও প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গ্রাহকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগÑ বিদ্যুতের দাম বাড়লেও সেবার মান বাড়েনি, বরং দুর্ভোগ বেড়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিং দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা ও শিক্ষা কার্যক্রমকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। গ্রাহকদের দাবি, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ না বাড়লেও একেকজনের মাসিক বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। গত মাসে যার বিল ৩ হাজার টাকা ছিল, এবার তা একলাফে ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। একইভাবে ৪০০ থেকে ১ হাজার টাকার বিল এখন ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা হয়ে গেছে।
গ্রাহকদের প্রশ্ন, বিদ্যুৎ যেখানে ঠিকমতো পাওয়াই যাচ্ছে না, সেখানে বিল কেন এভাবে বাড়ছে? এ ছাড়া প্রিপেইড ও ডিজিটাল মিটারের অতিরিক্ত চার্জ নিয়েও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গ্রাহকদের প্রশ্ন, নিজের টাকা দিয়ে মিটার কেনার পরও কেন প্রতি মাসে ‘মিটার চার্জ’ ও ‘ডিমান্ড চার্জ’ দিতে হবে? এই বাড়তি টাকা আদায়ের কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করেন তারা।
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ কমাতে ৫০ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের জন্য একটি একক ও সহনীয় মূল্যহার নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা। তাদের আশঙ্কা, বিদ্যুৎ বিলের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি বজায় থাকলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়বে এবং বিদ্যুৎ বিভাগের ওপর থেকে মানুষের ন্যূনতম আস্থা হারিয়ে যাবে।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, গত মঙ্গলবার সিলেট বিভাগে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ২২০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ১৪৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৭৫ মেগাওয়াট। গত বুধবারের চিত্রও একই।
অন্যদিকে সিলেট জেলায় ১৬০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলেছে ১০৫ মেগাওয়াট। জেলাতেই ঘাটতি ছিল ৫৫ মেগাওয়াট। ফলে সেখানে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড সিলেট জোনের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন জানান, চাহিদা অনুযায়ী জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় লোডশেডিং কিছুটা বেড়েছে। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি না পাওয়া পর্যন্ত আপাতত এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি থাকায় কলকারখানা বন্ধ থাকবে এবং বিদ্যুতের চাহিদা কমবে। এতে সপ্তাহান্তে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কিছুটা কমে আসতে পারে।

