চলমান ফিফা বিশ্বকাপ বাংলাদেশের কোনো অংশগ্রহণকারী ইভেন্ট নয়। তবে এই প্রতিযোগিতা একদিকে যেমন সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ঝড় তুলেছে ঠিক তেমনি বাংলাদেশের বাজার অর্থনীতিতেও এর প্রভাব উপেক্ষা করার মতো নয়। প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ সামনে এলে রাজধানীর গুলিস্তান, নিউ মার্কেট, পল্টন, মিরপুর, বসুন্ধরা সিটি থেকে শুরু করে অনলাইন মার্কেট প্লেস আর সারা দেশের হাটবাজার এবং অলিগলিতেও এক ধরনের মৌসুমি অর্থনৈতিক উত্থান দেখা যায়। এই সময়টি কেবল ফুটবল উন্মাদনার নয়- একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসা, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য এবং ভোক্তা ব্যয়ের একটি অস্থায়ী বিস্ফোরণও। বিশ্বকাপ ঘিরে ঢাকার এই অর্থনৈতিক গতিবিধি মূলত তিনটি স্তরে কাজ করে- খুচরা বাজার, ডিজিটাল উদ্যোক্তা অর্থনীতি এবং ভোক্তা সংস্কৃতি। এর প্রতিটি স্তরেই রয়েছে আলাদা প্রবণতা, লাভ-ক্ষতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।
ঢাকা- মৌসুমি বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু
বিশ্বকাপ সারা দেশ তথা টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত কার্যত একটি অস্থায়ী ‘স্পোর্টস মার্কেটে’ রূপ নেয়। ফুটবল পতাকা, জার্সি, হেডব্যান্ড, ব্যানার, পোস্টার, স্টিকার- সবকিছুর দখল থাকে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল ঘরানার পণ্যের ওপর। পাশাপাশি অন্য সমর্থকদের পণ্য রয়েছে। সবচাইতে বড় ঢেউ ওঠে রাজধানী ঢাকায়।
বিক্রেতাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, বিশ্বকাপের এক-দুই মাস আগেই পাইকারি বাজারে জার্সি ও পতাকার সরবরাহ বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা কম দামের পণ্য স্থানীয়ভাবে পাইকারি দরে ঢুকে পড়ে, এরপর খুচরা পর্যায়ে কয়েকগুণ দামে বিক্রি হয়।
রাজধানীর গুলিস্তানের একাধিক দোকানদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ মৌসুমে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি বিক্রি হয়। বিশেষ করে রাতের দিকে বিক্রি বাড়ে, কারণ তখনই তরুণ ক্রেতাদের আনাগোনা বেশি থাকে। নিউ মার্কেট এলাকাতেও একই চিত্র দেখা যায়, তবে সেখানে তুলনামূলকভাবে মানসম্মত জার্সি, প্রিন্টেড টি-শার্ট এবং কাস্টম ডিজাইনের পণ্যের চাহিদা বেশি। এখানে মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের উপস্থিতি বেশি হওয়ায় দাম ও মান- দুটোর ওপরই গুরুত্ব থাকে।
পাড়া-মহল্লার বাজার- ছোট ব্যবসার বিস্তার
ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, লালবাগ, চকবাজার, শান্তিনগর, মৌচাক, ভাটারা থেকে শুরু ধানমন্ডি, গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকাগুলোতেও বিশ্বকাপ মৌসুমে ছোট দোকান ও অস্থায়ী স্টলগুলোতে ব্যবসা বেড়ে যায়। পছন্দের দেশের পতাকা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় রাস্তাঘাটের মোড়ে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে স্টেশনারি দোকানেও দেখা যায় বিশ্বকাপ-থিমযুক্ত পণ্য। এখানে অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যটি ভিন্ন- এটি মূলত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ। অনেকেই অল্প পুঁজি নিয়ে মৌসুমি ব্যবসা শুরু করেন এবং ১-২ মাসের মধ্যে তা শেষ করে ফেলেন।
এই মৌসুমি বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ছোট আকারের পতাকা, হ্যান্ডব্যান্ড ও ফেস পেইন্ট, জার্সি, ক্যাপ, স্টিকার ও মোবাইল কভার। অনেক বেকার তরুণও এই সময়টিকে ‘সিজনাল ইনকাম উইন্ডো’ হিসেবে ব্যবহার করেন।
অনলাইন বাজার- নতুন প্রজন্মের ব্যবসার কেন্দ্র
গত কয়েক বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অনলাইন বাণিজ্যে। ফেসবুক পেজ, ইনস্টাগ্রাম শপ এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বিশ্বকাপভিত্তিক পণ্যের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটাল উদ্যোক্তারা সাধারণত কাস্টমাইজড পণ্য তৈরি করেন- যেমন, নিজের নাম লেখা জার্সি, কাস্টম ডিজাইন করা টি-শার্ট, থিমেটিক মগ ও গিফট বক্স। এখানে লাভের মার্জিন তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ ব্র্যান্ডিং এবং ডিজাইন ভ্যালু যুক্ত করা যায়। অনেক ছোট উদ্যোক্তা শুধু এই মৌসুমের আয় দিয়েই পুরো বছরের অনলাইন ব্যবসা চালিয়ে নেন। তবে একই সঙ্গে প্রতিযোগিতাও তীব্র। একই ডিজাইনের পণ্য অসংখ্য পেজে বিক্রি হওয়ায় দাম কমে যায় এবং লাভের হারও অনেক ক্ষেত্রে চাপের মুখে পড়ে।
ইলেকট্রনিক্স বাজারে চাহিদার উল্লম্ফন
বিশ্বকাপ আসলে ঢাকার ইলেকট্রনিক্স বাজারেও একটি স্পষ্ট চাহিদা বৃদ্ধি দেখা যায়। বিশেষ করে টেলিভিশন, প্রজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম এবং ইন্টারনেট প্যাকেজ বিক্রি বাড়ে।
মহল্লার শোরুমগুলোতে দেখা যায় ‘বিশ্বকাপ অফার’, ‘ফ্রি ইন্টারনেট বান্ডেল’ বা ‘ইজি ইএমআই’ ধরনের প্রচার। অনেক পরিবার পুরোনো টিভি বদলে বড় স্ক্রিনের স্মার্ট টিভি কেনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ ছাড়া মোবাইল ডেটা এবং স্ট্রিমিং সার্ভিসের ব্যবহারও বেড়ে যায়। রাতের ম্যাচগুলো সরাসরি দেখার প্রবণতা বাড়ায় ইন্টারনেট ব্যবহারের চাপও।
রেস্টুরেন্ট ক্যাফেতে রাত জাগে অর্থনীতি
ঢাকার রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে এবং ফাস্টফুড আউটলেটগুলো বিশ্বকাপ মৌসুমে রাতভিত্তিক অর্থনীতিতে প্রবেশ করে। বড়পর্দায় ম্যাচ দেখানোর আয়োজন একটি জনপ্রিয় ব্যাবসায়িক কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে ধানমন্ডি, বনানী, উত্তরা ও মিরপুরের কিছু এলাকায় দেখা যায়- বন্ধুদের দল একত্র হয়ে খেলা দেখছে, আর একই সঙ্গে খাবার ও পানীয়ও বিক্রি বাড়ছে। এই খাতে তিনটি পরিবর্তন স্পষ্ট- রাতের বিক্রি বৃদ্ধি, গ্রুপ বুকিং এবং রিজার্ভেশন বৃদ্ধি, ফাস্টফুড অর্ডার ডেলিভারি সার্ভিসের চাহিদা বৃদ্ধি। অনেক ক্ষেত্রে রেস্টুরেন্টগুলো বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিশেষ ‘কম্বো প্যাকেজ’ চালু করে, যা বিক্রি বাড়াতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ডিং- বিপণনের মৌসুমি বিস্তার
বিশ্বকাপ ঢাকার বিজ্ঞাপন বাজারেও একটি অস্থায়ী উচ্ছ্বাস তৈরি করে। মোবাইল অপারেটর, পানীয় কোম্পানি, ইলেকট্রনিক ব্র্যান্ড এবং ফ্যাশন হাউসগুলো এই সময়ে ব্যাপক প্রচার চালায়। টেলিভিশন বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে ফেসবুক ভিডিও অ্যাড- সবখানেই ফুটবল থিমযুক্ত কনটেন্ট দেখা যায়। ব্র্যান্ডগুলো সাধারণত জাতীয় আবেগ, দলগত সমর্থন এবং ‘উৎসবের অনুভূতি’কে কেন্দ্র করে বিজ্ঞাপন তৈরি করে। এর ফলে বিজ্ঞাপন খাতে অস্থায়ী হলেও একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি হয়, যা মিডিয়া ও কনটেন্ট প্রোডাকশন খাতকে সরাসরি লাভবান করে।
তৈরি পোশাক ও রপ্তানি সম্ভাবনা
যদিও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিশ্বকাপ অর্থনীতি মূলত খুচরা ও অনানুষ্ঠানিক বাজারনির্ভর, তবে তৈরি পোশাক শিল্পেও এর পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। বিশ্বব্যাপী ফুটবল জার্সি ও স্পোর্টসওয়্যার চাহিদা বাড়লে বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলো কিছু অংশে সেই অর্ডার পায়। বিশেষ করে ইউরোপীয় ও লাতিন আমেরিকার বাজারের জন্য উৎপাদিত স্পোর্টস পোশাকের অংশবিশেষ বাংলাদেশে তৈরি হয়। তবে এই প্রভাব স্থায়ী নয় এবং মূলত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও নেতিবাচক দিক
বিশ্বকাপ অর্থনীতি পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। ঢাকার বাজারে কিছু কাঠামোগত সমস্যা স্পষ্টভাবে দেখা যায় : অনেক ভোক্তা অপ্রয়োজনীয় খরচে জড়িয়ে পড়েন এবং নিম্নমানের পণ্যের বাজার প্রসারিত হয়। অনানুষ্ঠানিক ব্যবসায় কর-কাঠামোর বাইরে লেনদেন ঘটে এবং রাত জাগার কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতা কিছু ক্ষেত্রে কমে। এ ছাড়া এই অর্থনীতি খুবই স্বল্পমেয়াদী- বিশ্বকাপ শেষ হলেই অধিকাংশ বাজার আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
অস্থায়ী কিন্তু বাস্তব অর্থনৈতিক ঢেউ
ঢাকার বিশ্বকাপ অর্থনীতি মূলত একটি মৌসুমি ভোক্তা অর্থনীতির প্রতিফলন। এটি দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বা স্থায়ী প্রবৃদ্ধি তৈরি না করলেও নগর জীবনের ভোগবাদী আচরণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সুযোগ এবং অনলাইন বাণিজ্যের সম্প্রসারণকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে শুরু করে অনলাইন শপ- সবখানেই একই চিত্র দেখা যায় : ফুটবল শুধু খেলা নয়, এটি একটি অস্থায়ী অর্থনৈতিক ইঞ্জিন, যা প্রতি চার বছর পর ঢাকার বাজারকে নতুনভাবে সচল করে তোলে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন