বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেশের সামুদ্রিক পরিবহনে বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে, সামুদ্রিক পরিবহনে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিশ্চিত করা। এ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে প্রতিষ্ঠার ৫৪ বছরেও নিজেদের বহরে রাখেনি একটিও মাদার অয়েল ট্যাংকার। জাহাজের সংখ্যা ৩৮ থেকে নেমে এখন মাত্র সাতটি জাহাজ নিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিএসসি।
বিএসসি সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করতে অতীতে কোনো রাজনৈতিক সরকার এগিয়ে আসেনি। তবে ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংস্থাটিতে ২টি মাদার অয়েল ট্যাংকার যুক্ত করতে চেয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রকল্পটির অপমৃত্য তো ঘটায়ই, উল্টো ছয়টি জাহাজের চুক্তি করে আনে চারটি জাহাজ; দুটি জাহাজের টাকা হাওয়া হয়ে যায়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক চাপ থাকলেও তারাও প্রকল্পটি একটি পর্যায়ে নিয়ে আসে। তবে বিএসসি এখন আশাবাদী।
নথিপত্র বলছে, বতর্মানে বাংলাদেশের ব্যবসার পরিধি প্রায় ৬১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার অধিক। এমন বাস্তবতায় বিএসসির বহরে কম করে হলেও জাহাজ থাকার কথা ৫০-৬০টি। বর্তমানে বিএসসির বহরে রয়েছে মাত্র সাতটি সমুদ্রগামী জাহাজ। দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। সংস্থাটির সক্ষমতা ঘাটতির কারণেই দেশের টাকা লুটে নিচ্ছে দেশীয় গুটিকয়েক জাহাজ মালিক ও বিদেশি জাহাজ মালিকরা।
তবে সরকারি জাহাজ (স্বার্থরক্ষা) আইন অনুযায়ী, সরকারি পণ্য পরিবহনে দেশীয় জাহাজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের কারণে অতীতে তা কখনো বাস্তবায়ন করতে পারেনি বিএসসি।
জ্বালানি পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিজস্ব ট্যাংকার না থাকায় প্রতিবছর বিপুল অংকের অর্থ বিদেশি ও বেসরকারি জাহাজ মালিকদের কাছে চলে যাচ্ছে। দেশের জ্বালানি আমদানির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই দীর্ঘসূত্রতায় সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে কারা?
নৌ-বাণিজ্য দপ্তরের তথ্য মতে, ১ লাখ ১৫ হাজার টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন দেশের সবচেয়ে বড় মাদার অয়েল ট্যাংকারের নাম এমটি ওমেরা লিবার্টি, যার মালিকানায় রয়েছে এলজেএল বাংলাদেশ পিএলসি। এ ছাড়াও তাদের বহরে আছে গ্যালাক্সি ও লিগাছি নামে আরও দুটি মাদার অয়েল ট্যাংকার। এ ছাড়াও বসুন্ধরা গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, কমফোর্ট গ্রুপ, দরিয়া শিপিং লাইন্স, কনসোর্টিয়াম ও মেরিন এজেন্সির অয়েল ট্যাংকার রয়েছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে মাকস্, এমএসসি, এপিএল, সিএমএ সিজিএস, হেপাগ-লয়েডসহ অন্যরা।
তথ্য সূত্র বলছে, দেশে প্রতি বছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল দেশে আমদানি হয়, যার জন্য আমদানিকারকদের জাহাজ ভাড়া পরিশোধ করতে হয় বছরে ৪ হাজার ৫শ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা। এর মাঝেও বিএসসি কত শতাংশ ভাড়া পায় তা নিয়ে পদস্থ কোনো কর্মকর্তা মুখ খুলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিপিং কোম্পানির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার আইন করে বিএসসিকে ব্যবসা করার সুযোগ দিয়েছে অনেকটা হাত-পা বেঁধে। সিন্ডিকেট করে দমিয়ে রাখা হয়েছে বিএসসিকে। যারা এই খাতকে সিন্ডিকেট করে রাখে, অতীতের সব সরকারের ওপর তাদের ছিল সীমাহীন প্রভাব। এটি নিয়ে বিএসসির কেউ কথা বললে শুধু চাকরি নয়, জীবনও যেতে পারে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহমুদুল হক শাহ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দেশের জ্বালানি খাতের নিরাপত্তার জন্য অনেক আগেই বিগত সরকারের সময় বিএসসির বহরে মাদার অয়েল ট্যাংকার সংযোজন দরকার ছিল। দেশের স্বার্থে বিএসসিতে জাহাজের বহর বাড়াতে হবে।
বিএসসির তথ্য মতে, ১ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, যার আওতায় কেনা হবে দুটি আধুনিক মাদার অয়েল ট্যাংকার জাহাজ। প্রতিটি জাহাজের ধারণক্ষমতা হবে ৪০ হাজার থেকে ৫৫ হাজার ডেডওয়েট টন (ডিডব্লিউটি)। ১ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা পুরোপুরি সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে জোগান দেওয়া হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বিএসসি।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কমোডর মাহমুদুল মালেক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সিন্ডিকেটের কথা অনেকেই বলে থাকেন, তবে পদে থেকে তা আমি বলতে পারি না। তবে এটুকু বলতে পারি, অতীতে বিএসসির দায়িত্বশীলরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাদার অয়েল ট্যাংকার কেনার সাহস করেননি।
এমডি মালেক আরও বলেন, বতর্মান সরকার সব বাধা উপেক্ষা করে দুটি মাদার অয়েল ট্যাংকার কেনার কাজ প্রায় সম্পন্ন করেছে। ইনশাআল্লাহ্ আগামী ২০২৯ সালে মধ্যে বিএসসির বহরে যুক্ত হবে অত্যাধুনিক দুটি মাদার অয়েল ট্যাংকার।

