টানা ভারি বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠছে। টানা কয়েক দিনের অবিরাম ভারি বর্ষণ এবং সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি অঞ্চলে রেকর্ড বৃষ্টির কারণে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের উত্তরাঞ্চলের চার জেলা নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুরের নদ-নদীর পানি দ্রুত বেড়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি বাড়ায় চরাঞ্চল ও নি¤œাঞ্চলের আবাদি জমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগে রয়েছেন কৃষকসহ স্থানীয় অধিবাসীরা।
সিলেট ব্যুরো জানায়, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে এরই মধ্যে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট এবং সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, ছাতকসহ সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোর নিম্নাঞ্চল ও বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হতে শুরু করেছে। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্র, তলিয়ে গেছে দোকানপাট ও রাস্তাঘাট। উজান থেকে নেমে আসা পানির তীব্র স্রোতের কারণে পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে ‘সাদাপাথর’ পর্যটন কেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। অন্যদিকে সুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢলের পানিতে তাহিরপুর-আনোয়ারপুর সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে তাহিরপুর উপজেলার সরাসরি সড়কযোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নদ-নদীর পানি দ্রুত বেড়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দুই জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়ে ২০২২ সালের মতো আকস্মিক ও বড় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারেÑ এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং সীমান্তসংলগ্ন ভারতের মেঘালয় ও আসামের চেরাপুঞ্জি অববাহিকায় গত কয়েক দিন ধরে মুষলধারে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বৃষ্টির পানি সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলের পাহাড় ও লেক দিয়ে ধলাই, পিয়াইন, লোভাছড়া, সারি ও যাদুকাটা নদী হয়ে তীব্র বেগে বাংলাদেশের সুরমা ও কুশিয়ারা অববাহিকায় প্রবেশ করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে, আগামী তিন থেকে চার দিন সিলেট বিভাগ এবং ভারতের মেঘালয় ও আসামে এই অতি ভারি বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আরও দ্রুত বেড়ে এবং দু-এক দিনের মধ্যে এ দুই নদীর বেশির ভাগ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে ঢুকে পড়বে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ৩৯ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগের ২৪ ঘণ্টায় এর পরিমাণ ছিল ১৪২ মিলিমিটার। গতকাল দিনভর সিলেট ও সুনামগঞ্জের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল এবং দফায় দফায় ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিন এই অঞ্চলে বৃষ্টির তীব্রতা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই, যা বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানি সব পয়েন্টে দ্রুত বাড়ছে। সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে ১২ দশমিক ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যেখানে বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার। সিলেট পয়েন্টেও সুরমার পানি দ্রুত বেড়ে ৯ দশমিক ৩৭ সেন্টিমিটারে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে কুশিয়ারা নদীর পানি জকিগঞ্জের অমলশীদ পয়েন্টে বিপৎসীমার কাছাকাছি ১৩ দশমিক ১৬ সেন্টিমিটার এবং বিয়ানীবাজারের শেওলা পয়েন্টে ১০ দশমিক ৭৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টেও কুশিয়ারার পানি বিপৎসীমার কাছে গিয়ে ৯ দশমিক ০৭ সেন্টিমিটারে অবস্থান করছে। সীমান্তসংলগ্ন গোয়াইনঘাট উপজেলার সারিগোয়াইন নদী দিয়ে পানি ৮ দশমিক ৭৬ সেন্টিমিটারে প্রবাহিত হচ্ছে এবং কানাইঘাটের লোভাছড়া নদীতে পানি ১২ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটারে পৌঁছেছে।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর পানি দ্রুত বেড়ে বর্তমানে ৮ দশমিক ২৫ সেন্টিমিটারে অবস্থান করছে। পাহাড়ি ঢলের পানির তোড়ে কোম্পানীগঞ্জের সীমান্ত এলাকার সাদাপাথর পর্যটন স্পট সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে গেছে এবং সেখানে প্রচ- স্রোত তৈরি হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিন মিয়া সাংবাদিকদের জানান, ভারতে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ি ঢলে সাদাপাথরের দোকানপাট ভেসে গেছে এবং নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় পর্যটকদের সুরক্ষায় পর্যটন কেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে সব ধরনের নৌকা চলাচল স্থগিত করা হয়েছে।
একই অবস্থা বিরাজ করছে গোয়াইনঘাট ও জাফলং অঞ্চলে। পিয়াইন ও সারি নদীর পানি সমানতালে বাড়ায় জাফলং পর্যটন এলাকার একাংশ এবং গোয়াইনঘাটের নি¤œাঞ্চলের রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরে পানি উঠতে শুরু করেছে। জাফলংয়ের পিয়াইন নদীতে পানি এখন ৮ দশমিক ৯৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা বিপৎসীমার দিকে ধাবিত হচ্ছে। জৈন্তাপুরের সারিঘাট পয়েন্টে সারি নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে ৯ দশমিক ৭৩ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হলেও প্রতি ঘণ্টায় পানির উচ্চতা বাড়ছে।
এদিকে সুনামগঞ্জ জেলায়ও বন্যার আশঙ্কা তীব্র আকার ধারণ করেছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির কারণে সুরমা নদীর পানি এক লাফে ৭৯ সেন্টিমিটার বেড়েছে এবং যাদুকাটা নদীসহ অন্যান্য সীমান্ত নদীর পানিও বিপৎসীমা ছুঁইছুঁই করছে। যাদুকাটা নদীর উপচে পড়া ঢলের পানিতে তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ারপুর সড়কটি সম্পূর্ণ তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে তাহিরপুরের সঙ্গে জেলা সদরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় যাত্রী, সাধারণ ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা। সুনামগঞ্জ ও তাহিরপুরের নিম্নাঞ্চলে এরই মধ্যে ঢলের পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে।
২০২২ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ ও প্রলয়ংকরি বন্যার দগদগে স্মৃতি এখনো সিলেট ও সুনামগঞ্জবাসীকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এ কারণে টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানির খবর পেলেই দুই জেলার লাখ লাখ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও শঙ্কা কাজ করতে শুরু করে। চলতি মৌসুমে বন্যা নিয়ে তাই তারা শঙ্কিত। তবে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুকনো খাবার, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতকরণসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ‘বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ভারতের মেঘালয় পার্বত্য অঞ্চলে আরও ব্যাপক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে বেশি বৃষ্টিপাত হলে আগামী দু-এক দিনের মধ্যে সিলেটের প্রধান নদ-নদীগুলো বিপৎসীমা অতিক্রম করে বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতির রূপ নিতে পারে। আমরা সার্বক্ষণিক নদীর পানি পর্যবেক্ষণ করছি।’
অন্যদিকে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তা নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। গত শনিবার বেলা ৩টায় সেখানে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আগের দিন একই সময়ে তা ছিল বিপৎসীমার ৪১ সেন্টিমিটার নিচে।
নদীর পানি বাড়ার কারণে লালমনিরহাটসহ তিস্তাতীরবর্তী বিভিন্ন নি¤œাঞ্চলের ফসলি জমি ইতোমধ্যে পানিতে ডুবে যেতে শুরু করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপচেলার দোয়ানী তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ২ মিটার। এই পয়েন্টে পানির বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। গত শুক্রবার সকাল ৯টায় এই পয়েন্টে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছিল ৫১ দশমিক ৬৪ মিটার।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যারেজের ৪৪ জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী। তিনি বলেন, গজালডোবা ব্যারাজের ২০টি গেট ভারত খুলে দেওয়ায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি চলে এসেছে। এতে চরের অনেক কৃষকের আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় দেশের রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক স্থানে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সঙ্গে দমকা হাওয়া, বজ্রপাত এবং বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম বলেন, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত লঘুচাপের বর্ধিতাংশ বিস্তৃত রয়েছে। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগামী অন্তত তিন দিন ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
এ ছাড়া টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট অঞ্চলে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ী দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট নদীবন্দরগুলোকে এ কারণে সতর্কসংকেত মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

