ঢাকা সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

‘মাজার বিতর্ক’ এড়াতেই সিলেটের ডিসি প্রত্যাহার

সিলেট ব্যুরো
প্রকাশিত: জুন ২২, ২০২৬, ০৩:৫৩ এএম

সিলেটের মতো সংবেদনশীল ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলে মাজারকে কেন্দ্র করে কোনো বড় ধরনের গণ-অসন্তোষ তৈরি হোক, সরকার তা চায় না। কিন্তু হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার বিতর্কে জড়িয়ে যাওয়ার পর খুব দ্রুতই বিতর্কিত হয়ে যাচ্ছিলেন আলোচিত ডিসি সারওয়ার আলম। সরকারের ওপরমহলে গোয়েন্দা তথ্য ছিল সে রকমই। তাই পরিস্থিতি সমাল দিতে, বিশেষ করে ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে জড়িত বিতর্ক এড়াতে কালক্ষেপণ না করার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে দানবাক্স সিলগালার মাত্র তিন দিনের মাথায় গতকাল রোববার বিকেলে জরুরি এক প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেট থেকে প্রত্যাহার করে ঢাকায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।

বিভিন্ন সূত্র থেকে এমনটাই দাবি করা হচ্ছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর গ্রিন সিগন্যালেই তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জরুরি প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেট থেকে সরিয়ে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হলেও সেখানে বদলির সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। স্থানীয় একাধিক মাধ্যম জানায়, এই আকস্মিক প্রত্যাহারের পেছনে মূলত হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারের দানবাক্স ও ডেগ সিলগালা করাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া তীব্র বিতর্ক ও জন-অসন্তোষ কাজ করেছে।

র‌্যাবের সাবেক আলোচিত ও জনপ্রিয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম গত ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ২৭তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি তার স্বভাবসুলভ ‘অ্যাকশনধর্মী’ ইমেজের কারণে আলোচনায় আসেন। তার ১০ মাসের কর্মকালে ভোলাগঞ্জ ও জাফলংয়ে অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর টাস্কফোর্স অভিযান, সিলেট নগরীর বন্দরবাজার ও জিন্দাবাজারে ফুটপাত দখলমুক্তকরণ, ভূমি ও পাসপোর্ট অফিসে দালাল উচ্ছেদ এবং খাদ্যে ভেজালবিরোধী ঝটিকা অভিযান সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। তবে প্রশংসার পাশাপাশি তার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে একধরনের দূরত্ব তৈরি করে। অনেকেই তার কাজের শৈলীকে ‘অতিরিক্ত প্রচারমুখী’ বা ‘অপ্রশাসনিক’ বলে সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে সিলেটের শাহজালাল উপশহর ও শহরতলির কিছু আবাসন প্রকল্পের বৈধতা ও জলাশয় ভরাটের অভিযোগে তিনি কঠোর আইনি অবস্থান নিলে আবাসন ব্যবসায়ী ও আবাসন মেলা বন্ধের উপক্রম হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ছিল, পর্যাপ্ত শুনানির সুযোগ না দিয়েই হঠাৎ বড় বড় জরিমানা বা প্রজেক্ট সিলগালা করায় সিলেটের আবাসন খাতে একধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এর বাইরে প্রশাসনের তৃণমূল কর্মকর্তাদের (ইউএনও) ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য বা উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, তিনি মাঠ পর্যায়ে কোনো সমন্বয় না করে সিঙ্গেল ম্যান শো বা একক কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। একই সঙ্গে সিলেটের কিছু পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংস্কার বা উচ্ছেদের ক্ষেত্রেও স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে তার মতবিরোধ তৈরি হয় এবং যথাযথ বিশেষজ্ঞ মতামত না নিয়ে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

সব সমালোচনা ছাপিয়ে গত সপ্তাহে মাজারের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় হাত দেওয়াই তার জন্য শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়ায়। গত ১২ জুন তিনি মাজার পরিদর্শনে গিয়ে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা আনার ঘোষণা দেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার বিকেলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজারের শত বছরের পুরোনো লোহার ঐতিহাসিক ৩টি ‘ডেগ’ (দানপাত্র) এবং আগের সব দানবাক্স সিলগালা করে প্রশাসনের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে নতুন বাক্স স্থাপন করা হয়।

ঐতিহ্যগতভাবে নিজস্ব খাদেম ও পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত মাজারের এই শতাব্দী প্রাচীন নিয়মে প্রশাসনের এমন সরাসরি হস্তক্ষেপকে সিলেটের ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং মাজার-সংশ্লিষ্টরা আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে আঘাত হিসেবে দেখেন। ঘটনার পরপরই গত দুই দিন ধরে সিলেটের স্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের ঝড় ওঠে। সিলেটের মতো একটি সংবেদনশীল অঞ্চলে মাজারের আবেগ জড়িয়ে থাকায় বিষয়টি দ্রুত বড় ধরনের গণ-অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির দিকে রূপ নেওয়ার উপক্রম হয়।

স্থানীয়রা জানান, মো. সারওয়ার আলমের সততা ও কর্মস্পৃহা থাকলেও সিলেটের স্থানীয় সংস্কৃতি, জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় এবং ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের গভীরতা অনুধাবন করতে না পারাই তার জন্য বড় ভুল হয়েছে। সামনে মাজারগুলোর বড় ধর্মীয় জমায়েত ও উরসকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি যাতে কোনোভাবেই সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায় এবং মাজার নিয়ে তৈরি হওয়া তীব্র বিতর্ক এড়াতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশেই জরুরি ভিত্তিতে এই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।