ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় সশস্ত্র বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী) পদোন্নতিবঞ্চিত, বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া এবং চাকরিচ্যুত ১৫০ কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। গত ১ জুলাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ পদোন্নতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিষয়টি প্রকাশ পায়।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ওই আমলে প্রতিহিংসার শিকার এসব কর্মকর্তা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পদোন্নতি ও বাহিনীতে ফেরার দাবি জানান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিষয়টি সমাধান না হলেও বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমীসহ ১৫০ জনকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিসহ স্বাভাবিক অবসর দিল সরকার।
সশস্ত্র বাহিনী সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত এবং বরখাস্ত হওয়া ১৫০ জন কর্মকর্তাকে সরকার স্বাভাবিক অবসর বা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আযমীও রয়েছেন। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে তারা চাকরিজীবনে ‘বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন’ বিবেচনা করে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পাওয়া ওই কর্মকর্তারা বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও পাবেন বলে গত বুধবরের এক প্রজ্ঞাপনে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
প্রজ্ঞাপনে বৈষম্যের শিকার ১৫০ কর্মকর্তার মধ্যে সেনাবাহিনীর ১১৫ জন, নৌবাহিনীর ২১ এবং বিমান বাহিনীর ১৪ জন্য কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে নানাভাবে অন্যায়ের শিকার হয়েছেন এসব কর্মকর্তা। কাউকে অন্যায়ভাবে অবসরে পাঠানো হয়, কাউকে অপসারণ, অব্যাহতি কিংবা বরখাস্ত করা হয়। তাদের আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর ফলে সশস্ত্র বাহিনীর এই কর্মকর্তাদের প্রাপ্য ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, বকেয়া বেতন-ভাতা এবং বিধি অনুযায়ী সব ধরনের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত হলো।
এদিকে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে প্রশাসন যেন আর কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার না করে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কর্নেল হাসিনুর রহমান বলেন, ‘সেনাবাহিনী দেশের কোনো দলের না। আমার মনে হয়, রাজনীতিবিদেরা যদি এটা বোঝেন, আলহামদুলিল্লাহ। সেনাবাহিনী তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা চাই এ ধরনের অপকর্ম যাতে আগামীতে না হয়। রাষ্ট্রের ক্ষতি, ব্যক্তির ক্ষতি। আমরা নতুন অধ্যায়ে চলে এসেছি, আর যেন এই কালো অধ্যায় না থাকে। কেউ অপরাধ করলে অন্যদের দায়িত্ব হলো প্রতিরোধ করা, যাতে অপরাধ না করে। আমরা এই কালচারে না এলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারব না।’
ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে অবসরে পাঠানো সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, ‘আট বছর আয়নাঘরে আটকে রেখে আল্লাহ আমাকে ফিরিয়েছে। আমার কষ্ট হয়েছে। এই কষ্ট তো হাজার কোটি টাকা দিয়েও দূর করা যাবে না। তার পরও আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে আহ্বান করা যেতে পারে, যারা বঞ্চিত এখনো আছে, তারা দরখাস্ত করলে প্রতিটি কেস খতিয়ে দেখা উচিত, সে সত্যিকারে বঞ্চিত হয়েছে কি না। যদি হয়, তাকে তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।’
বঞ্চিত সেনা কর্মকর্তাদের মতে, প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখা যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকেও থাকতে হবে সচেতন। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করতে সংস্কারেরও দাবি জানান তারা।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ মামলায় দ-িত জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে ২০০৯ সালের ২৪ জুন বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের ডিসেম্বরে তার বরখাস্তের আদেশ বাতিল করে তখনকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তাকে ২০১১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তারিখ থেকে ভূতাপেক্ষ মেজর জেনারেল এবং ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর অবসরের আগে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হলো। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও মেজর জেনারেল উভয় পদের বকেয়া বেতন-ভাতা, বিধি অনুযায়ী অন্যান্য আর্থিক সুবিধা, ১ কোটি টাকা বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা এবং বয়স ও যোগ্যতা সাপেক্ষে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পদায়নের সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া এসএসএফের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমিও রয়েছেন ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিপ্রাপ্তদের তালিকায়, যাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছিল। প্রজ্ঞাপনে তাকে স্বাভাবিক অবসরে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, অধিকাংশ কর্মকর্তার বাধ্যতামূলক বা অকালীন অবসর বাতিল করে বয়সসীমা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত চাকরি বহাল ধরে ‘স্বাভাবিক অবসর’ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অনেককে লেফটেন্যান্ট জেনারেল, মেজর জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও কর্নেল পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তারা সংশ্লিষ্ট পদে চাকরির মেয়াদ পর্যন্ত বকেয়া বেতন-ভাতা ও বিধি অনুযায়ী অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পাবেন। কয়েকজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। কারও জন্য এককালীন ৫০ লাখ টাকা, আবার কারও জন্য ১ কোটি টাকা পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বয়স ও যোগ্যতাসাপেক্ষে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পদায়নেরও সুযোগ রাখা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘বঞ্চনার শিকার’ হয়েছেন এমন সেনা কর্মকর্তাদের বিষয়টি বিবেচনার জন্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত, অপসারণকৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও বরখাস্ত অফিসারদের আবেদন পর্যালোচনা করে ওই কমিটি এই ১৫০ জনকে স্বাভাবিক অবসর বা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিসহ স্বাভাবিক অবসর বা অকালীন (বাধ্যতামূলক) অবসর দেওয়ার সুপারিশ করে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়।

