ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি

শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ, ব্যবসার খরচ কমানোর দাবি চট্টগ্রাম চেম্বারের

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ০৬:১৩ এএম

আমদানি করা পণ্যের শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অনুরোধ জানিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই)। সংগঠনটির অভিযোগ, সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বারবার পরিদর্শনের কারণে পণ্য খালাসে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব হচ্ছে, যা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

গতকাল রোববার এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব আহসান এইচ হাবিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সিসিসিআই সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতি রেখে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করতে দ্রুত সংস্কারের দাবি জানান।

নবনিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত এনবিআর চেয়ারম্যানকে অভিনন্দন জানিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার আশা প্রকাশ করে, তার নেতৃত্বে বাস্তবমুখী সংস্কারের মাধ্যমে সহজে ব্যবসা করার সূচকে (ইজ অব ডুয়িং বিজনেস) বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিচালন ব্যয় কমবে।

চিঠিতে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক একটি সভার কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে পণ্যজট ও ব্যবসার খরচ কমাতে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে চার দিনের মধ্যে শুল্কায়ন সম্পন্ন ও আমদানি করা কার্গো খালাসের নির্দেশ দিয়েছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ ছাড়া মন্ত্রী চট্টগ্রাম বন্দরের অচল স্ক্যানারগুলো দ্রুত সচল করা, বন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি, জাহাজ ও কনটেইনার জট কমানোর পদক্ষেপ নেওয়ারও নির্দেশ দেন। তবে চেম্বার জানায়, সেই নির্দেশনার প্রতিফলন এখনো কাস্টমসের দৈনন্দিন কার্যক্রমে দেখা যাচ্ছে না।

চিঠির তথ্য অনুযায়ী, কিছু কাস্টমস কর্মকর্তার অসহযোগিতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং অপ্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াজনিত জটিলতার কারণে আমদানিকারকেরা প্রতিনিয়ত বিলম্বের সম্মুখীন হচ্ছেন। ‘এর ফলে কাস্টমস ও বন্দরসংশ্লিষ্ট মাশুল বাবদ ব্যবসায়ীদের ওপর ভারি আর্থিক বোঝা চাপছে, যা তাদের পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল করছে’ বলে চিঠিতে বলা হয়।

শুল্কায়নে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ঘটায় এমন বেশ কিছু বিষয়ও চিহ্নিত করেছে চট্টগ্রাম চেম্বার। এর মধ্যে রয়েছে একাধিক সরকারি সংস্থা কর্তৃক একই চালানের বারবার কায়িক পরীক্ষা (ফিজিক্যাল ইন্সপেকশন), কনটেইনার স্ক্যান করার পরও পুনরায় ম্যানুয়াল পরীক্ষা করা এবং স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার (টেস্টিং ল্যাব) না থাকায় নমুনা ঢাকার ল্যাবরেটরিতে পাঠানো।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইলেকট্রনিক সার্টিফিকেট অব অরিজিন (ই-সিও) থাকার পরও সনদের স্বাক্ষর যাচাইয়ের নামে বিলম্বের সমালোচনা করে চিঠিতে বলা হয়, এ ধরনের সনাতন প্রক্রিয়ার কারণে প্রায়ই কার্গো খালাস কয়েক দিন আটকে থাকে। এতে আরও অভিযোগ করা হয়, যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) সনদ বাধ্যতামূলক নয়, সেসব পণ্যের জন্যও আমদানিকারকদের প্রায়শই বিএসটিআই সনদ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা অতিরিক্ত খরচ ও বিলম্ব সৃষ্টি করছে।

ব্যবসায়ীদের সংগঠনটির মতে, এসব অনাকাক্সিক্ষত প্রক্রিয়ার কারণে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স বা শুল্কায়নের সময় প্রায়ই সাত থেকে আট দিন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে কার্গো বারবার খোলা এবং কায়িক পরীক্ষা করা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সিসিসিআই জানায়, পরিদর্শনের সময় আমদানি করা পণ্য প্রায়শই বৃষ্টি এবং অন্যান্য বৈরী আবহাওয়ার সংস্পর্শে আসে। এতে পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেক সময় তা বিক্রির অযোগ্য হয়ে পড়ে।

সংগঠনটি আরও অভিযোগ করে, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান বিধিমালায় নির্ধারিত মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ না করে প্রায়ই নিজেদের ইচ্ছেমতো মূল্য সংযোজন করে আমদানি করা পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করে, যা খালাস প্রক্রিয়াকে আরও জটিল ও সময়সাপেক্ষ করে তোলে।

চট্টগ্রাম চেম্বার জানায়, দীর্ঘায়িত বিলম্বের কারণে আমদানিকারকেরা অতিরিক্ত বন্দর স্টোরেজ চার্জ, কনটেইনার ডিটেনশন ফি এবং ল্যাব পরীক্ষার খরচ দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা আমদানি করা পণ্যের চূড়ান্ত মূল্য এবং সামগ্রিক ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কাস্টমস অ্যাক্ট, ২০২৩-এ আন্তর্জাতিক মানদ-ের সঙ্গে সংগতি রেখে পেপারলেস কাস্টমস, প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং এবং ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষার বিধান প্রবর্তন করা হলেও এই ব্যবস্থাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না থাকায় ব্যবসায়ীরা এর কাক্সিক্ষত সুবিধা পাচ্ছেন না বলে জানায় চেম্বার। বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে সিসিসিআই ভারপ্রাপ্ত এনবিআর চেয়ারম্যানকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কাস্টমস পদ্ধতি চালু, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সহজ, কার্গো দ্রুত খালাস এবং কমপ্লায়েন্স খরচ কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার মনে করে, এসব সংস্কার যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা হলে তা কেবল ব্যবসার খরচই কমাবে না, বরং দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।