ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

চট্টগ্রামে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চলছে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি

বিদেশে বসে ঘুঁটি নাড়ছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ

সাহাব উদ্দিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৬:১৯ এএম

চট্টগ্রামে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজি, হামলা, গুলিবর্ষণ ও লুটপাটের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ী ও ভবন মালিকসহ স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। দাবি অনুযায়ী টাকা না দিলে প্রকাশ্যে হামলা, গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হচ্ছে। এসব ঘটনায় বারবার বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে আসছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি বলে জানা গেছে।

সর্বশেষ গত সোমবার নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেটের (ডিডিএন) কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও ৩৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানের মালিক আদিল বিন মামুন জানান, দুই দিন আগে বিদেশি নম্বর থেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয়ে ফোন করে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং মাসিক ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল অফিসে হামলা চালায়।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলাকারীরা অফিসে ঢুকে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নগদ অর্থ লুট করে নিয়ে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, হামলায় বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা জড়িত থাকতে পারে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এর আগে গত ডিসেম্বরে স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান সিআইপির কাছেও দুবাইয়ে একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি তার চন্দনপুরার বাসভবন লক্ষ করে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া জুন মাসে কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকায় একটি পোশাক কারখানার সামনে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেই ওই ঘটনা ঘটেছিল।

একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা আতঙ্কের মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। একের পর এক এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া শুধু ব্যবসায়ী সমাজ নয়, সাধারণ মানুষকেও আতঙ্কিত করে তুলছে। এ ছাড়া নগরীতে কোনো ভবন নির্মাণ করতে গেলে সেখানেও হাজির হচ্ছে চাঁদাবাজরা।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করেই সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ চট্টগ্রামের একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন। ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাভুক্ত এই সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। তার অনুসারীরা নগরীর চান্দগাঁও, বায়েজিদ, পাঁচলাইশ, বাকলিয়া এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় বলে দাবি পুলিশের।

তথ্যসূত্র বলছে, বাহিনীটির বর্তমানে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে প্রধান হলেন মোহাম্মদ রায়হান। এ ছাড়া রয়েছেন বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী মোবারক হোসেন ইমন, যিনি ডেভিড ইমন নামেও পরিচিত। অন্য সক্রিয় সদস্যরা হলেনÑ খোরশেদ আলম, ববি আলম, নাজিম উদ্দিন, মোহাম্মদ (ভাতিজা), কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মুবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদ। তাদের সবার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি, হত্যা, মারামারি ও অস্ত্র আইনে মামলা রয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, বড় সাজ্জাদ বাহিনীর অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদেরও গ্রেপ্তারে কাজ করছে পুলিশ। কেউ অপরাধ করে পার পাবে না।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি পুলিশের সোর্স নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে। গ্রুপের গ্রেপ্তার হওয়া সদস্যদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য ধরে তাদের নেটওয়ার্কের ভেতরে ঢুকে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় বন্ধ করতে হবে।