ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

ঝুঁকির কেন্দ্রে বাংলাদেশ

প্রকৃতির রুদ্ররূপে অস্থির বিশ্ব

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৬:১৯ এএম

পৃথিবী যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সময় পার করছে। কোথাও মানুষ পানির তোড়ে ভেসে যাচ্ছে, কোথাও আবার ফেটে চৌচির মাটি বৃষ্টির জন্য হাহাকার করছে। ইউরোপে রেকর্ড গড়া তাপপ্রবাহে শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটছে, উত্তর আমেরিকায় দাবানল গিলে খাচ্ছে বিস্তীর্ণ বনভূমি, আফ্রিকায় বন্যা ও ভূমিধসে হারিয়ে যাচ্ছে জনপদ।

একই সময়ে বাংলাদেশের মানুষও পার করছে একের পর এক চরম আবহাওয়ার ধাক্কা। কখনো তীব্র দাবদাহ, কখনো আকস্মিক বন্যা, কখনো পাহাড়ি ঢল, আবার কখনো বজ্রপাত ও ভূমিধস। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এগুলো আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘ ছায়া এখন পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একযোগে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ। ইউরোপের বহু দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। স্পেনে তাপজনিত কারণে এক মাসেই এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক ও পানিশূন্যতায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। একই সঙ্গে গ্রিস, স্পেন, তুরস্ক, ক্রোয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে হাজার হাজার দমকলকর্মীকে দিনরাত কাজ করতে হচ্ছে। কোথাও আগুন গ্রাস করছে বনাঞ্চল, কোথাও আবার বসতবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে আগুনের লেলিহান শিখা।

বিশ্বের জলবায়ুবিদদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে মহাসাগরের তাপমাত্রা। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ইতিহাসের সর্বোচ্চ গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা বৈশ্বিক আবহাওয়াকে আরও অস্থির করে তুলছে। এর সঙ্গে যদি শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হয়, তাহলে আগামী মাসগুলোতে পৃথিবী আরও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি এবং দাবানলের মুখোমুখি হতে পারে।

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকির দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এর প্রভাব আরও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একদিকে তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, অন্যদিকে মৌসুমি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আকস্মিক বন্যায় প্লাবিত হয়েছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনার বহু গ্রাম পানির নিচে চলে গেছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজারো পরিবার।

বাংলাদেশের আবহাওয়া এখন যেন চরম বৈপরীত্যের প্রতিচ্ছবি। কয়েক দিন আগেও যে অঞ্চলে তীব্র গরমে মানুষ হাঁসফাঁস করেছে, অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই অঞ্চলই আবার ভারি বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরন বদলে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হয়ে হঠাৎ অল্প সময়ের মধ্যে অতিবৃষ্টি হচ্ছে। এতে নদী-নালা দ্রুত ফুলে ওঠে এবং আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।

শুধু বন্যা নয়, দেশের পাহাড়ি এলাকাগুলোতেও বাড়ছে ভূমিধসের আশঙ্কা। অতিবৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে বজ্রপাতও এখন বড় ধরনের দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর শত শত মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারাচ্ছেন। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং বায়ুম-লের পরিবর্তনের কারণে বজ্রঝড়ের প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি পড়ছে কৃষিতে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি, যা এখন ক্রমেই অনিশ্চয়তার মুখে। অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, লবণাক্ততার বিস্তার এবং আকস্মিক বন্যাÑ সব মিলিয়ে কৃষককে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় বীজতলা নষ্ট হচ্ছে, আবার অতিবৃষ্টিতে পাকা ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু ফলন কমে যাচ্ছে। এতে কৃষকের আয় কমার পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বিশেষ করে তাপপ্রবাহ এখন শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি করছে। অতিরিক্ত গরমে নির্মাণশ্রমিক, কৃষক, রিকশাচালক, দিনমজুরসহ খোলা আকাশের নিচে কাজ করা লাখো মানুষের কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া, কিডনিজনিত সমস্যা এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। শিশু, বৃদ্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি নীরব সংকট হলো নিরাপদ পানির অভাব। উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ধীরে ধীরে মিঠাপানির উৎসে প্রবেশ করছে। ফলে সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে। আবার দীর্ঘ খরার সময় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। বন্যার সময় পানির উৎস দূষিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ। ফলে একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবেশÑ দুই ক্ষেত্রেই নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের পেছনে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সৃষ্টি হয় এল নিনো। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত, খরা, তাপপ্রবাহ ও ঝড়ের স্বাভাবিক চক্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হলে বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বৃষ্টির ঘাটতি, পানিসংকট এবং কৃষিতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন নয়, দেশের ভেতরের কিছু মানবসৃষ্ট কারণও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। নির্বিচারে বন উজাড়, জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সবুজের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরগুলোতে কংক্রিটের বিস্তার এবং খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় তৈরি হচ্ছে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপ। ফলে একই তাপমাত্রাও মানুষের কাছে আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু প্রকৃতি বা অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপরও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নির্বাচন স্থগিত, ভোটগ্রহণ ব্যাহত এবং মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। গবেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যতে জলবায়ু সংকট গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ অবশ্য দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়ে আসছে। ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং উদ্ধারব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে অতীতের তুলনায় প্রাণহানি অনেক কমেছে। তবে পরিবর্তিত জলবায়ুর বাস্তবতায় শুধু দুর্যোগ মোকাবিলা নয়, দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনাকেও আরও শক্তিশালী করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখনই তাপপ্রবাহ ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা জাতীয় নীতি প্রয়োজন। নগর এলাকায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, জলাধার সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আধুনিক আগাম সতর্কবার্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে দেশের অবদান অত্যন্ত সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকেই। তাই জলবায়ু তহবিল, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পরিসরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

প্রকৃতি আজ যে ভাষায় সতর্কবার্তা দিচ্ছে, তা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাপপ্রবাহ, বন্যা, দাবানল, ভূমিধস কিংবা সমুদ্রের উষ্ণতাÑ সব কিছু যেন একই গল্পের ভিন্ন অধ্যায়। এই সংকট শুধু আগামী প্রজন্মের নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। তাই এখন প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ। অন্যথায় প্রকৃতির এই পরিবর্তন শুধু ঋতুর রূপই বদলে দেবে না, বদলে দেবে মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার চিত্রও।