ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আভাস

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৬:২১ এএম

উত্তরাঞ্চলীয় রংপুর বিভাগের ৫ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদ-নদীর পানি সমতল আগামী ৫ দিন পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী (দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) মোস্তফা কামাল জিহানের স্বাক্ষর করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য দেওয়া হয়। এদিকে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে পানি বাড়ছে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে। এ অবস্থায় হ্রদের পানি ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি স্পিলওয়ে গেট (জলকপাট) খুলে দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ু আর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি শক্তিশালী হয়ে ওঠায় দেশের আট বিভাগেই বৃষ্টি হতে পারে।

উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে মোস্তফা কামাল জিহান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে শুক্রবার একই সময় পর্যন্ত) উত্তরাঞ্চলীয় রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস পেয়েছে। তবে আগামী তিনদিন এসব নদীর পানি সমতল বাড়তে পারে। কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম জেলার ওসব নদী-সংলগ্ন নি¤œাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা অববাহিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদ-নদীর পানি সমতল বেড়েছে; যা আগামী পাঁচদিন অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলার কিছু স্থানে এসব নদী সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। একই সঙ্গে নদী-সংলগ্ন নি¤œাঞ্চল কোথাও কোথাও প্লাবিত হতে পারে।

সিলেট অঞ্চলের পরিস্থিতি সম্পর্কে এই কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে কুশিয়ারা নদী সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জের মারকুলি স্টেশনে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কুশিয়ারা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে, অপরদিকে সুরমা নদীর পানি সমতল হ্রাস পেয়েছে। উভয় নদীর পানিই আগামী তিনদিন ফের বাড়তে পারে। ফলে আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় সুরমা-কুশিয়ারা নদী-সংলগ্ন নি¤œাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি থাকতে পারে স্থিতিশীল।

এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ফেনী, মুহুরী, গোমতী ও সিলোনিয়া নদীর পানি সমতল হ্রাস পেয়েছে। এসব নদীর পানি সমতল আগামী একদিন বৃদ্ধি এবং পরবর্তী দুদিন স্থিতিশীল থাকতে পারে বলেও তথ্য দেন তিনি। আবহাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে মোস্তফা কামাল জিহান আরও বলেন, ‘উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় বিরাজমান সুস্পষ্ট লঘুচাপটি দুর্বল হয়ে বর্তমানে উত্তর উড়িষ্যা এবং তৎসংলগ্ন বিহার ও গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এলাকায় অবস্থান করছে।

এদিকে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে পানি বাড়ছে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে। এ অবস্থায় হ্রদের পানি ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। আজ বেলা ১১টার দিকে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি স্পিলওয়ে গেট (জলকপাট) খুলে দেওয়া হতে পারে। কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় কাপ্তাই হ্রদে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১০৩ দশমিক ৯১ ফুট মিন সি লেভেল (এমএসএল)। বাঁধে পানির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুট এমএসএল। হ্রদের পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি চলে আসায় উজান ও ভাটি এলাকার বন্যানিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনার স্বার্থে বাঁধের স্পিলওয়ে গেট খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১৬টি গেটে ৬ ইঞ্চি করে পানি ছেড়ে দেওয়া হবে। এতে প্রতি সেকেন্ডে ৯ হাজার কিউসেক পানি কাপ্তাই হ্রদ থেকে কর্ণফুলী নদীতে নিষ্কাশন হবে বলে জানিয়েছেন পানিবিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা।

গেট খোলার বিষয়ে গতকাল কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আগাম সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হ্রদের পানির উচ্চতা, উজান থেকে আসা পানির ঢল এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাসসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে স্পিলওয়ে খোলার সময় পরিবর্তন হতে পারে। যদি ঢলের পরিমাণ আরও বাড়ে, তবে স্পিলওয়ে গেট খোলার পরিমাণও পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। বিজ্ঞপ্তিতে কাপ্তাই বাঁধের ভাটি অঞ্চল অর্থাৎ রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের এবং নৌযানগুলোকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কাপ্তাই কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট সচল রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি হ্রদ থেকে নিষ্কাশন হচ্ছে। এরপরও পানির চাপ সামাল দিতে অতিরিক্ত ৯ হাজার কিউসেক পানি ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে দেশের আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ু আর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি শক্তিশালী হয়ে ওঠায় দেশের আট বিভাগেই বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও ভারি বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাতেরও সম্ভাবনা রয়েছে। এসব কারণে দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে হবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর ওডিশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় বিরাজমান লঘুচাপটি ঘনীভূত হয়ে সুস্পষ্ট লঘুচাপ আকারে একই এলাকায় অবস্থান করছে। মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, সুস্পষ্ট লঘুচাপের কেন্দ্রস্থল ও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এ ছাড়া মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর মোটামুটি সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে সারা দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে ভারি বর্ষণ হতে পারে। সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।