× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রেজাউল করিম মানিক, রংপুর

প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬, ০২:৫৪ এএম

নেপিয়ার ঘাসে সচ্ছলতা বুনছেন উত্তরের কৃষক

রেজাউল করিম মানিক, রংপুর

প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬, ০২:৫৪ এএম

নেপিয়ার ঘাসে সচ্ছলতা  বুনছেন উত্তরের কৃষক

উত্তরের জেলাগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে দিনে দিনে বাড়ছে উন্নত জাতের নেপিয়ার ঘাসের চাষাবাদ। বাজারে খড় ও কৃত্রিম গোখাদ্যের বিকল্প হিসেবে এই ঘাস এখন খামারিদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, অনেক এলাকায় প্রথাগত ধান চাষের চেয়ে নেপিয়ার ঘাস চাষে কয়েক গুণ বেশি লাভ হওয়ায় কৃষক এখন ধান ছেড়ে মাঠের পর মাঠ ঘাস চাষের দিকে ঝুঁকছেন। আর এই ঘাস চাষ করেই অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরেছে উত্তরের কৃষকদের।

জেলার বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, পীরগাছা, মিঠাপুকুর, সদর উপজেলাসহ লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, একসময়ের ফসলি জমি, পতিত জমি ও বাড়ির আশপাশে এখন নেপিয়ার ঘাসের সবুজ সমারোহ। দূর থেকে দেখলে ধানখেত মনে হলেও বাস্তবে এগুলো উন্নত জাতের ঘাসের খেত।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক একর জমিতে বছরে দুবার ধান চাষ করে খরচ বাদে যেখানে প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাভ করা কঠিন, সেখানে বছরে চার থেকে পাঁচবার ঘাস কেটে বিক্রি করে খরচ বাদে লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।

বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের কৃষক মমদেল হোসেন বলেন, ‘আগে খড়ের দাম বেশি হওয়ায় গরু পালন কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন নিজের দুই বিঘা জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করছি। নিজের খামারের চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত ঘাস বাজারে বিক্রি করে প্রতি বিঘায় (৩০ শতাংশ) বছরে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা বাড়তি লাভ হচ্ছে। ঘাস বিক্রির টাকায় এখন ছেলেমেয়ের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ খুব সহজেই চলে যাচ্ছে।’

কৃষকেরা বলছেন, ধান বা অন্য ফসলের তুলনায় এই ঘাস চাষে সার, কীটনাশক ও মজুরি খরচ অনেক কম লাগে। একবার চারা রোপণ করলে চার থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত অনবরত ফলন পাওয়া যায়।

লালমনিরহাটের কালিগঞ্জের শিয়াল খোওয়া গ্রামের ঘাসচাষি সোলায়মান মন্ডল জানান, তিন বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করে তার বছরে আয় ২ লাখ টাকা। তাই তিনি ধান চাষ ছেড়ে ঘাসের চাষ করছেন। রংপুর সদর উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের কৃষক খয়বার আলী বলেন, ‘উঁচু মাটিতে এই ঘাসের চাষ ভালো হয়। একবার ঘাসের মুড়া লাগালে চার থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত ঘাস পাওয়া যায়। সারি থেকে সারির দূরত্ব সাড়ে তিন থেকে চার ফুট করতে হয়। সারা বছর ঘাস লাগানো যায়। তবে বর্ষাকালে ঘাস লাগালে ভালো হয়। ঘাস লাগানোর সময় জমিতে প্রচুর গোবর সার দিতে হয়। ২০ দিন পর একরে ৫০ কেজি ইউরিয়া, ১৫ কেজি টিএসপি দিলে ৫০ দিনের মাথায় ঘাস কাটা যায়।’

পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের বগুড়াপাড়ার কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আগে বাজারে কেনা ভুসি আর খৈল খাওয়াতে গিয়ে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খেয়ে যেত। গত বছর থেকে এক বিঘা জমিতে নেপিয়ার ঘাসের চাষ শুরু করি। এখন গরুর খাবারের পেছনে খরচ অর্ধেক হয়ে গেছে আর গাভির দুধের পরিমাণও আগের চেয়ে বেড়েছে।’

ঘাসচাষিদের ভাষ্য, ধান কাটার পর আবার নতুন করে চাষের জন্য জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে নানা কাজ করতে হয়। এতে যেমন খরচ হয়, তেমন লাভ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে নেপিয়ার জাতের ঘাস একবার চাষ করলে চার-পাঁচ বছর বিক্রি করা যায়। এর মধ্যে শুধু জমি পরিচর্যার খরচ লাগে।

স্থানীয় বাজারগুলোতেও এখন ধানের মতোই নেপিয়ার ঘাস আঁটি বেঁধে বাণিজ্যিকভাবে কেনাবেচা হচ্ছে। রংপুর নগরীর খামার মোড়ে কথা হয় ঘাস বিক্রেতা সবুর আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, এক গোছা নেপিয়ার ঘাস ৪ টাকা করে কৃষকদের কাছ থেকে কিনে বাজারে এনে বিক্রি করছেন ৯ থেকে ১০ টাকা। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদে এই ঘাসের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে ডেইরি শিল্পের বিপ্লব ধরে রাখতে হলে নেপিয়ার ঘাসের মতো উন্নত জাতের সবুজ ঘাস চাষের বিকল্প নেই। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কাটিং সরবরাহ আরও সহজলভ্য করা গেলে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে।

মিঠাপুকুর ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আমজাদ সরকার বলেন, ‘নেপিয়ার ঘাস চাষের বেশ কিছু অনন্য সুবিধা রয়েছে। এই ঘাস দ্রুত বাড়ে। একবার রোপণ করলে বছরে প্রায় চার থেকে ছয়বার পর্যন্ত ঘাস কাটা যায়। সাধারণ ঘাসের তুলনায় নেপিয়ারে প্রোটিন ও ফাইবারের পরিমাণ অনেক বেশি, যা গাভির দুধ উৎপাদন বাড়াতে এবং গবাদি পশুর দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। যেকোনো পরিত্যক্ত জমি, রাস্তার ধার বা বাড়ির আঙিনায় সামান্য সার ও সেচ দিয়েই এই ঘাস চাষ করা সম্ভব। এতে রোগবালাইয়ের উপদ্রবও অনেক কম।’

রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় গবাদিপশুর সংখ্যা ও খামারের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। খামারিদের নিরাপদ ও পুষ্টিকর গোখাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতে সরকারের পক্ষ থেকে বিনা মূল্যে উন্নত জাতের নেপিয়ার ঘাসের কাটিং (কা-) বিতরণ এবং চাষ পদ্ধতিবিষয়ক নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এ বিভাগের আট জেলায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ হাজার ৪০ একর জমিতে নেপিয়ার ঘাসের চাষ হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে নেপিয়ার চাষের জমির পরিমাণ অনেক বেড়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১১ হাজার ৯০ একরের বেশি জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৯৭ হাজার টন।

রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নাজমুল হুদা বলেন, ‘সারা দেশেই গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে উচ্চফলনশীল নেপিয়ার ঘাস। বাজারে কৃত্রিম গোখাদ্যের দাম বাড়ার কারণে পশুপালনে খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন খামারিরা। এই পরিস্থিতিতে খড়ের বিকল্প এবং পুষ্টিকর সমাধান হিসেবে নেপিয়ার ঘাস চাষে ঝুঁকছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ডেইরি ফার্মের মালিকেরা। নেপিয়ার ঘাস চাষ করে একদিকে যেমন পশুর পুষ্টির চাহিদা মেটানো যাচ্ছে, অন্যদিকে খামারিদের উৎপাদন খরচ কমে আসছে প্রায় ৪০ শতাংশ।’

নাজমুল হুদা আরও বলেন, ‘নেপিয়ার ঘাস গবাদি পশুর জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর। এটি খাওয়ালে গাভির দুধ উৎপাদন যেমন বাড়ে, তেমনি পশুর রোগবালাইও কম হয়। রংপুর অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করতে এবং ডেইরি শিল্পের বিপ্লব ধরে রাখতে নেপিয়ার ঘাসের চাষ আগামীতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছি।’

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!