ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

শিবিরকে মোকাবিলায় কৌশলী ছাত্রদল

মেহেদী হাসান খাজা
প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২৬, ১০:২৬ পিএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসগুলোতে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক রূপান্তর দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা কিংবা ছদ্মবেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে আসার পর রাজনীতিতে এক নতুন মেরূকরণের সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সম্ভাব্য প্রভাব ও আদর্শিক ভিত্তি সংহত করার প্রচেষ্টাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সাংগঠনিকভাবে নিজেদের আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করার পথ বেছে নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে ছাত্রশিবির যেন ক্যাম্পাসগুলোতে একক প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, সে জন্য ছাত্রদল সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের ভিত্তি জোরদার করছে। হামলা-মামলায় জরাজীর্ণ অতীত কাটিয়ে এসে দলটি এখন নতুন উদ্যমে নতুন কমিটি গঠন, তরুণদের আকৃষ্ট করা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থার জায়গা দখলের নীতি অনুসরণ করছে।

শিবিরের প্রকাশ্যে আগমন ও ক্যাম্পাসের নতুন সমীকরণ : বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ রাজনীতিতে প্রকাশ্যে সক্রিয় ছিল না ইসলামী ছাত্রশিবির। ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিবিরের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমিটির দায়িত্বশীলরা প্রকাশ্যে নিজেদের পরিচয় উন্মোচন করতে শুরু করেন।

শিবিরের এই হঠাৎ উপস্থিতিতে ক্যাম্পাসগুলোতে শুরু হয় বহুমাত্রিক আলোচনা। শিবিরের আদর্শিক প্রভাব এবং তাদের সুশৃঙ্খল ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি সাধারণ শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের কাছে এক নতুন চ্যালেঞ্জ বা সমীকরণ হিসেবে দেখা দেয়। এই শূন্যতা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি রোধ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে দ্রুত মাঠে নেমে পড়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।

ছাত্রদলের পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের কৌশল : সরকার গঠনের পর থেকেই ছাত্রদল দেশের প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং এমনকি জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত তাদের পূর্ণাঙ্গ ও নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গড়ার কাজে গতি এনেছে।

শিক্ষার্থীনির্ভর রাজনীতি : জোরপূর্বক রাজনীতি করানো বা হল দখলের সংস্কৃতি পরিহার করে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অধিকার (সিট সমস্যা, মানসম্মত খাবার, নিরাপত্তা) নিয়ে সোচ্চার হওয়া।

আদর্শিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা : শিবিরের আদর্শিক কাঠামোর বিপরীতে উদার, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করা।

সহনশীল ও গঠনমূলক কার্যক্রম : হিংসাত্মক রাজনীতির পথ পরিহার করে ক্যাম্পাসজুড়ে একটি সুস্থ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা। ছাত্রদলের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মতে, ছাত্রশিবির দীর্ঘদিন ধরে গোপন রাজনীতি চালিয়েছে। তাদের মোকাবিলা করতে হলে কোনো সহিংসতা নয়, বরং উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও মুক্তচিন্তার গণতান্ত্রিক রাজনীতিই সেরা অস্ত্র।

ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতারা যা বলছেন : ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ছাত্রদলের গতিশীল কার্যক্রমের বিষয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতাদের অবস্থান পরিষ্কার।

ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে যে ভয়ের সংস্কৃতি ও আধিপত্যবাদী রাজনীতি চলে আসছিল, তা চিরতরে বন্ধ হওয়া দরকার। ইসলামী ছাত্রশিবির সবসময় গঠনমূলক ও শিক্ষার্থীদের অধিকারকেন্দ্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আমরা কোনো সংগঠনকে প্রতিপক্ষ বা শত্রু মনে করি না। ছাত্রদল বা অন্য যেকোনো ছাত্র সংগঠন যদি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সুসংগঠিত হয়, তবে সেটিকে আমরা স্বাগত জানাই। শিবিরের রাজনীতি গোপন কিছু নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমাদের গোপনে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এখন আমরা ইতিবাচক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মন জয় করতে চাই। আমাদের মূল লক্ষ্য ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।

ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেছেন, ‘কাউকে মোকাবিলা’ করার মানসিকতা রাজনীতিতে সুস্থ প্রতিযোগিতা আনে না। ছাত্রদলের সাংগঠনিক বিস্তারকে আমরা তাদের নিজস্ব বিষয় হিসেবে দেখি। তবে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের ছাত্রসমাজ এখন অনেক সচেতন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের দখলদারিত্ব, তোষণ বা চাপিয়ে দেওয়া আদর্শ আর মেনে নেবে না। আমরা চাই প্রতিটি ছাত্র সংগঠন তাদের নিজস্ব আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে শিক্ষার্থীরাই। বৈষম্যহীন ও মেধাভিত্তিক ক্যাম্পাস গঠনে আমরা ছাত্রদলসহ সব ইতিবাচক রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গেই সংলাপে আগ্রহী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর দেশের রাজনীতিতে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বিগত সময়গুলোতে যেভাবে ‘একচ্ছত্র আধিপত্য’ বজায় রাখা হতো, এখন ছাত্রদল ও শিবিরের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে সে সুযোগ কমে আসছে। ছাত্রদল তাদের বিশাল ছাত্রভিত্তি এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ওপর ভর করে শিবিরের ভাবাদর্শিক প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখার যে রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে, তা যদি সহিংসতামুক্ত থাকে, তবে তা বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে।

তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা- রাজনৈতিক এই লড়াই যেন কোনোভাবেই আবারও হল দখল, টর্চার সেল গঠন কিংবা হিংসাত্মক সংঘাতের দিকে মোড় না নেয়। উভয় সংগঠনই যদি নিজেদের বক্তব্যে অটল থেকে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা বজায় রাখে, তবে দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্রশিবিরকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা কেবল কোনো কৌশলগত পদক্ষেপ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখার সঙ্গে যুক্ত। সরকার গঠনের পর থেকে নিজেদের ঢেলে সাজানো এবং মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করার মাধ্যমে ছাত্রদল এটি প্রমাণ করতে চাইছে যে, ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ কেবল শক্তির জোর নয়, বরং আদর্শ, নীতি ও শিক্ষার্থীদের আস্থার মাধ্যমেই অর্জিত সম্ভব। এই দুই প্রধান শক্তির ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের ক্যাম্পাস রাজনীতির ভবিষ্যৎ।
 
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির বলেছেন, সরকার গঠনের পর থেকে আমরা সারা দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলকে শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দে পরিণত করতে কাজ করে যাচ্ছি। শিবিরকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা মানে লড়াই বা সংঘাত নয়; বরং এটি হলো কাজের প্রতিযোগিতা। শিবির তাদের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কৌশল দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করতে যেন না পারে, সে জন্য আমরা ছাত্রদলের কর্মসূচিগুলোকে সম্পূর্ণ শিক্ষার্থীমুখী করেছি। আমাদের নেতাকর্মীরা প্রতিদিন হলের শিক্ষার্থীদের সমস্যা শুনছে এবং সে অনুযায়ী সমাধান খুঁজছে। ছাত্রদল শক্তিশালী হওয়া মানে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীর বাকস্বাধীনতা সুরক্ষিত হওয়া এবং কোনো চরমপন্থি বা উগ্র ভাবধারা যেন রাজনীতিকে গ্রাস করতে না পারে তা নিশ্চিত হওয়া।

এ বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেছেন, ছাত্রদল সবসময় বাংলাদেশের সার্বভৌমেত্ব, গণতন্ত্র এবং বহুদলীয় রাজনীতির চর্চায় বিশ্বাসী। দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে ক্যাম্পাসে মুক্ত রাজনীতির চর্চা বন্ধ ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ক্যাম্পাসগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরিয়ে আনা। কোনো একটি নির্দিষ্ট আদর্শের বা সংগঠনের অপরাজনীতি যাতে শিক্ষার্থীদের ওপর জেঁকে বসতে না পারে, সে জন্য ছাত্রদল নিজেদের আদর্শিক ও সাংগঠনিক দিক থেকে শক্তিশালী করছে। শিবিরের ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি বা গোপন আঁতাতের রাজনীতির বিপরীতে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে একটি সহনশীল ও উদারপন্থি রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলব। ছাত্রদল কোনো বলপ্রয়োগে বিশ্বাস করে না, বরং যুক্তি ও রাজনীতির মাধ্যমেই সব আদর্শিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে।