ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

এলইডি টিভির রমরমা বিজ্ঞাপন ব্যবসা

কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত চসিক

মো. গিয়াস উদ্দিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০২:৩২ এএম

চট্টগ্রাম মহানগরের বাণিজ্যিক এলাকার মোড়ে-মোড়ে জ্বলছে রঙিন এলইডি স্ক্রিন। চোখ ধাঁধানো আলো, ঝলমলে বিজ্ঞাপন। তাতে কোটি টাকার বাণিজ্য। কিন্তু এই রঙিন আলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে রাজস্ব ফাঁকির কারবার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরের ২নং গেট, মুরাদপুর, জিইসি মোড়, প্রবর্তক মোড়, ভিআইপি টাওয়ারের সামনে, কাজীর দেউরি মোড়, কাজীর দেউরির ইন্টান্যাশনাল কনভেনশন হলের সামনে শপিং ব্যাগ, গোল পাহাড় মোড়, নূর আহমদ সড়ক, আগ্রাবাদ বাদামতল মোড়, অলংকার মোড়, হালিশহর এলাকার বড়পোল মোড়, চকবাজারের বালি আর্কেট, বহদ্দারহাট মোড়সহ আরও একাধিক স্থানে চলছে বড় পর্দায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এলইডি টিভির মাধ্যমে রমরমা বিজ্ঞাপন ব্যবসা।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নগর পরিকল্পনা শাখার তথ্যমতে, আগ্রাবাদ বাদামতল মোড়ের এলইডি টিভি পরিচালনা করছেন মো. সেলিম, কাজীর দেউরি মোড়ে আলবাট্রস ইন্টারন্যাশনাল, ২নং গেট বিপ্লব উদ্যানের সামনে নুসাইফা এন্টারপ্রাইজ এবং প্রবর্তক মোড়ে এলইডি টিভির ব্যবসা পরিচালনা করছেন আলবাট্রস ইন্টারন্যাশনাল। নগরের আরও একাধিক স্থানে চলমান এলইডি টিভির বিজ্ঞাপন ব্যবসার কোনো রেকর্ড  চসিকের দপ্তরেও নেই।

চসিকের আইন মতে, করপোরেশনের নিজস্ব ভূমিতে এলইডি টিভির প্রতি বর্গ ইঞ্চির ভাড়া বছরে ২০ হাজার টাকা। নিজেদের ভূমিতে হলে বছরে প্রতিবর্গ ইঞ্চিতে ভাড়া দিতে হয় বছরে ১০ হাজার টাকা। তবে চসিক থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমতি নিয়েছে এলইডি টিভির ৬০ বর্গ ইঞ্চি সাইজ। এতে করে প্রতিটি বেসরকারি ভূমিতে বছরে ভাড়া আসে ৬ লাখ টাকা এবং করপোরেশনের ভূমিতে ভাড়া আসে ১২ লাখ টাকা।

রাজস্ব শাখার তথ্যমতে, ২নং গেট বিপ্লব উদ্যানের সামনে নুসাইফা এন্টারপ্রাইজ গত বছরের ২৫ জানুয়ারি চসিকের সাথে ৫ বছরের চুক্তি করেছে ৩০ লাখ ৮৪ হাজার টাকায়। শুরুতে ৩ লাখ টাকা দিলেও অদ্যাবধি প্রতিষ্ঠানটি চসিককে কোনো টাকা দেয়নি।

প্রবর্তক মোড়ে এলইডি টিভির ব্যবসা পরিচালনা প্রতিষ্ঠান আলবাট্রস ইন্টারন্যাশনাল চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি বার্ষিক ১৯ লাখ ২ হাজার টাকার চুক্তিতে ১ লাখ ৫০ হাজার প্রদান করলেও প্রতিষ্ঠানটি আর কোনো অর্থ জমা দেয়নি চসিকের হিসাবে।

গত জাতীয় নির্বাচনের আগে থেকে চসিকের কোনো অনুমতি ছাড়া নগরের কাজীর দেউরি মোড়ে আলবাট্রস ইন্টারন্যাশনাল বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। সম্প্রতি রাজস্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠানটির এলইডি টিভির বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিলে ১ লাখ টাকা জমা দেওয়ার কথা থাকলেও দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।

অপরদিকে আগ্রাবাদ মোড়ের এলইডি টিভি পরিচালনা করছে মো. সেলিম। যিনি প্রতি বছর চসিককে প্রদান করছেন ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। একইসাথে নগরের জিইসি মোড়ের এলইডি টিভি ও অন্যান্য বিজ্ঞাপন বাবদ এড ফ্রেম প্রতিষ্ঠানটি চসিককে প্রদান করছে বছরে ৭১ লাখ ৪২ হাজার ৮৫৭ টাকা।

চসিক সূত্রে জানা যায়, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করে এলইডি টিভির সাইজ নির্ধারণ করে দেয় করপোরেশন। যার প্রতিটি হতে হবে ৮ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, ১২ ইঞ্চি প্রস্থ। অভিযোগ রয়েছে বাস্তবে বাণিজ্যিকভাবে চলমান এলইডি টিভির সাইজ চুক্তির বিপরীতে ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি। ফলে প্রতি মাসে এ খাতে কোটি টাকার চসিককে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। দিন-দুপুরে এমন জালিয়াতি চললেও চসিকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও  সরকারদলীয় নেতাদের ভয়ে কেউ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে করপোরেশনের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, নিজেদের দলীয় পরিচয়ে এলইডি টিভি বসিয়ে জিয়া পরিবার ও বিএনপির মতাদর্শ প্রচারের কথা বলে মেয়রের সহানুভূতি আদায় করেন। যারা এসব করেন, তারা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের মহানগরের নাম ডাক নেতা। ফলে মেয়রের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে এ ব্যবসা নিয়ে চসিকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী মুখ খুলতে সাহস পান না।

তিনি আরও বলেন, সামনে মেয়র নির্বাচন, তাই হয়তো মেয়র এ ব্যাপারে কঠোর হচ্ছেন না। তবে দিন শেষে মেয়রকেই তো জবাবদিহি করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক তদারকি ও স্বচ্ছ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে শুধু এলইডি বিজ্ঞাপন খাত থেকেই বছরে কোটি কোটি টাকা আয় সম্ভব। সেই অর্থ ব্যয় হতে পারত জলাবদ্ধতা নিরসন, সড়ক উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবায়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই পুরো কারবার চলছে প্রকাশ্যে। তবুও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেই। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এসএম সরওয়ার কামাল এ প্রতিবেদককে মেয়রের সাথে আলাপের পরামর্শ দেন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগ এসব বিষয় দেখছে। রাজস্ব আদায়ের জন্য তাদের কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া আছে। অননুমোদিত কোনো এলইডি টিভি নগরীতে চলতে পারবে না। যদি কেউ এ ব্যবসা করতে চান, তাকে অবশ্যই নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে বলে মেয়র জানান।