ঢাকার মিরপুরে যুবদলকর্মী ইউসুফ পারভেজ হত্যা মামলার তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানতে পেরেছে, ঘটনাচক্রে তার প্রাণ গেলেও নিশানায় ছিলেন যুবদলের এক নেতা। আর তাকে মেরে ফেলতে ২৫ লাখ টাকায় চারজন শুটারকে ভাড়া করেছিলেন তারই রাজনৈতিক সহকর্মী। এদিকে, গ্রেপ্তার সাত আসামির মধ্যে ৪ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে আরেক আসামি প্রথমে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চাইলেও পরে অস্বীকৃতি জানান বলে তথ্য দেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই ওয়াজেদ আলী খান।
এর আগে, গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন ডিএমপির ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার জন্য শুটারদের ভাড়া করেছিলেন একই থানার স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজ। তবে বাবু প্রাণে বেঁচে গেলেও গুলিতে নিহত হন যুবদলকর্মী ইউসুফ। আহত হন সবজি বিক্রেতা সালাম সরদার ও মনির হোসেন।
গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে মিরপুর-১৩ নম্বরের ই-ব্লকের ওপেক্স পোশাক কারখানার সামনে গুলিতে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর পালানোর সময় মিরপুর-১৩ এলাকার একটি দোকানের সামনে থেকে চঞ্চল মোল্যাকে লোকজন আটক করে পিটুনি দিয়ে পুলিশে দেয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল জানান, হত্যাকা-ে অংশ নেওয়া চার শুটারকে মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে আনা হয়েছিল। তাদের সঙ্গে চার সহযোগী ছিল। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তাররা হলেনÑ চঞ্চল, জিহাদ মোল্লা, জিয়ারুল মোল্লা, মাসুম বিল্লাহ, নাহিদ হাসান, আবির হাওলাদার, আলী হোসেন ও শাফিন আহমেদ।
ডিবিপ্রধান বলেন, স্থানীয় আধিপত্য, ময়লার টেন্ডার; ফুটপাতের দোকান, ব্যবসা ও জমি দখল এবং আসন্ন কাউন্সিলর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ২৫ লাখ টাকার চুক্তির একটি অংশ অগ্রিম পরিশোধ করা হয়েছিল। ভাড়াটে শুটারদের থাকা-খাওয়াসহ অন্যান্য ব্যয়ও বহন করা হয়।
তিনি বলেন, প্রথম দফায় গত ২৯ জুন বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু অস্ত্রে গুলি ভরার সময় মিসফায়ার হওয়ায় সেদিন হামলা করা সম্ভব হয়নি। পরে ২২ জুলাই অভিযুক্তরা আবার ঢাকায় এসে মিরপুর-২ এলাকার একটি হোটেলে ওঠে। পরদিন রাতে বাবুর অফিসের সামনে অবস্থান নিয়ে হামলার প্রস্তুতি নেয়। ঘটনাস্থলে সন্দেহজনকভাবে অবস্থান নেওয়া কয়েকজনের পরিচয় জানতে চাইলে তারা নিজেদের স্থানীয় বাসিন্দা বলে দাবি করে। পরে তল্লাশির চেষ্টা করলে একজন অস্ত্র বের করে গুলি চালায়। সেই গুলিতে ইউসুফ নিহত হন। এ সময় এলোপাতাড়ি গুলিতে আহত হন সালাম সরদার ও মনির হোসেন। হামলার পর পালানোর সময় স্থানীয় লোকজন অস্ত্রসহ চঞ্চলকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।
শফিকুল ইসলাম বলেন, চঞ্চলকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত চালিয়ে নাহিদ হাসান ও শাফিন আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জিয়ারুল মোল্লা, আলী হোসেন, জিহাদ মোল্লা ও মাসুম বিল্লাহকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আবির হাওলাদারকে স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে বলে জানান তিনি।
অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম বলেন, একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। অন্য অস্ত্রগুলোর উৎস শনাক্তে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় ‘আব্বাস’ ও ‘ইব্রাহিম’ নামে পরিচিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম আসার বিষয়ে তিনি বলেন, অপরাধীরা অনেক সময় নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরতে এসব নাম ব্যবহার করে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আদালতে চার আসামির ‘স্বীকারোক্তি’ : গতকাল সোমবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পল্লবী জোনাল টিমের এসআই রায়হান হোসাইন গ্রেপ্তার ৭ আসামিকে আদালতে হাজির করেন। এদের মধ্যে জিহাদ মোল্লা, জিয়ারুল মোল্লা, মাসুম বিল্লাহ, নাহিদ হাসান ও আবির হাওলাদারের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড এবং আলী হোসেন ও শাফিন আহমেদকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলমের আদালতে জিহাদ, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলমের আদালতে মাসুম বিল্লাহ, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে নাহিদের এবং মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে আবির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
অন্যদিকে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে জিয়ারুলকে নেওয়া হয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য। তবে জিয়ারুল জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
যুবদলকর্মী ইউসুফ হত্যা মামলায় গত রোববার বিকেলে মিরপুর-১৩ নম্বরের পাঁচতলা মোড়সংলগ্ন মীনা বাজারের একটি গ্যারেজ থেকে এই ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন