ঢাকা শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫

‘স্বপ্নের দেশে স্বপ্নভঙ্গ’ যুক্তরাজ্য ফেরত পাঠাল ১৫ বাংলাদেশিকে 

জুবায়ের আহমেদ, লন্ডন থেকে
প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৫, ১১:২৪ এএম
যুক্তরাজ্য

পরিবারে স্বপ্নের পসরা সাজিয়ে তারা পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রিটেনে। নানা প্রতিকূলতায় নিজের নথিপত্র সময়মতো ঠিক করতে না পারায় অবৈধ হয়ে যান হাজারো যুক্তরাজ্যপ্রবাসী। অভিবাসননীতি কঠোর করে এরই মধ্যে তা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। তারই অংশ হিসেবে ১৫ অবৈধ বাংলাদেশিকে গতকাল শুক্রবার একটি বিশেষ চার্টার ফ্লাইট এইচএফএম ৮৫১ লন্ডনের স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশে পাঠায় তারা। জানা যায়, অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। গত বছর জানানো হয়, ব্রিটেন থেকে প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশিকে নির্বাসিত করা হবে। তাদের অধিকাংশই ছাত্র, ওয়ার্কার বা ভিজিটর ভিসায় ব্রিটেনে এসে আশ্রয় দাবি করে ব্যর্থ।

লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, কনস্যুলার শাখা এসব অবৈধ অভিবাসীর দেশে ফেরত যাওয়ার উদ্দেশ্যে ট্র্যাভেল পারমিট ইস্যু করে। ফেরত পাঠানো তালিকায় বৈধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টধারী বাংলাদেশি রয়েছেন। যাত্রীদের মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ঢাকার বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা আছেন। এই তালিকায় নারী অভিবাসীও রয়েছেন। ইস্যু করা ট্র্যাভেল পারমিটগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৫ জন বাংলাদেশির মধ্যে ছয়জনের কোনো নির্দিষ্ট পেশা নেই। অন্যদের মধ্যে ওয়েটার এবং শিক্ষার্থীও আছেন। যুক্তরাজ্য কর্তৃপক্ষ অভিবাসন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করছে এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে এই ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনেক অভিবাসী ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন। এসব ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং এই ফেরত পাঠানো তারই একটি অংশ।

ব্রিটেনের অবৈধ অভিবাসনমন্ত্রী মাইকেল টমলিনসন জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে একটি দ্রুত ট্র্যাক রিটার্ন চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, যাতে কেবল ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীই নয়, বিদেশি নাগরিক অপরাধী এবং ব্যক্তিদেরও যারা তাদের ভিসা অতিবাহিত করেছেন, তাদের নির্বাসনকে সহজতর করতে চুক্তিটি করেছেন। 

হোম অফিসের একটি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য হচ্ছে, গত এক দশকে ১ লাখ ২ হাজারেরও বেশি লোক শুধু অস্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি চায়, এরপর তারা স্থায়ীভাবে থাকার জন্য আবেদন করেন।

দাবিদারদের মধ্যে পাকিস্তান ছিল বৃহত্তম দেশ, প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ মামলা রয়েছে, এরপর বাংলাদেশ (১১ হাজার), ভারত (৭ হাজার ৪০০), নাইজেরিয়া (৬ হাজার ৬০০) এবং আফগানিস্তান (৬ হাজার)।

উল্লেখ্য, অবৈধ অভিবাসন রুখতে নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী। নিজের ফেসবুক পোস্টে এক বাস্তব অভিবাসীর ছবি ব্যবহার করে তিনি জানিয়েছেন, অবৈধভাবে ব্রিটেনে প্রবেশ করলে আটক ও ফেরত পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘অবৈধ অভিবাসন হলো অপরাধচক্রের ব্যবসা, যাদের মানুষের জীবনের প্রতি কোনো তোয়াক্কা নেই। আমার প্রথম অগ্রাধিকার হলো এই নোংরা ব্যবসার অবসান ঘটানো।’

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি দেশজুড়ে চালানো অভিযানে রেইড ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৫০ শতাংশ বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন, তার নেতৃত্বে সীমান্ত সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে এবং অবৈধ পথে ব্রিটেনে ঢোকা আর সম্ভব হবে না। তবে প্রধানমন্ত্রীর ফেসবুক পোস্টে ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। হাজারো মন্তব্যের বেশির ভাগই লেবার সরকারের অভিবাসননীতি এবং ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া অভিবাসীদের দমনে সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করছে। সমালোচকেরা বলছেন, শুধু ঘোষণা নয়, কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। সরকারি তথ্যই দেখাচ্ছে যে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিরোধী দলগুলো বলছে, সরকারের নীতিগুলো বাস্তবে কার্যকর না হওয়ায় অপরাধচক্র আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং দেশজুড়ে অভিবাসনসংকট আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।