জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন দেশের সাধারণ মানুষ। গণঅভ্যুত্থানের সেই আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে মানুষের স্বপ্নপূরণ হয়েছে কতটুকু? এ বিষয়ে মুখোমুখি হয়েছেন অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক এফ এ শাহেদ।
রূপালী বাংলাদেশ : জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যা ও দমন-পীড়নের যে প্রথম রায় হয়েছে সেটি কীভাবে দেখছেন?
সামান্তা শারমিন : ’২৪-এর জুলাই আন্দোলন, যা পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যেটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের অধিকার আদায় এবং শোষণ-পীড়নের তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তবে সেই আন্দোলন বানচাল করতে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার যে নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন চালিয়েছিল তা প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে। হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের যে রায় দেওয়া হয়, তা প্রপোরশনেট এবং ন্যায্যবিচার। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় অবিলম্বে এ রায় কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত ও ভারত সরকারের উচিত হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্ত হওয়া।
এ রায় ভবিষ্যতের জন্য বার্তা যে ক্ষমতার দম্ভ চিরদিন স্থায়ী হয় না। স্বৈরশাসকরা মনে করে তারা অজেয়। ভবিষ্যৎ রাজনীতিবিদ ও সংসদ সদস্যদের জন্য এ রায় ন্যায়বিচারের ঐতিহাসিক মাইলফলক।
রূপালী বাংলাদেশ : মেধার ভিত্তিতে চাকরি এবং সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে চাকরির নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি?
সামান্তা শারমিন : প্রকৃত অর্থে ক্ষমতা ছাড়া এগুলো নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এমনকি ক্ষমতা থাকলেও মেধার মূল্যায়ন এবং চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিতে কতটুকু সম্ভব তা আমরা দেখছি। তবে এনসিপি ক্ষমতায় গেলে অবশ্যই এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে। বড় দলগুলো বলছে, এক কোটি কর্মসংস্থান করবে, তবে তাদের কোনো রোডম্যাপ দেখি না। কী ধরনের কর্মসংস্থান হবে সেটি তারা পরিষ্কার করেননি।
রূপালী বাংলাদেশ : অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের রাজনীতি কেমন হবে?
সামান্তা শারমিন : আমরা এখনো নতুন রাজনীতি আনতে পারিনি। অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাবের রাজনীতি এখনো চলছে। আদর্শ ও নীতিনির্ভর রাজনীতি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমরা ভারত ও পাকিস্তানের রাজনীতির মধ্যে আছি। দেশের রাজনৈতিক কৌশল এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে এখনো আধুনিক ও বাস্তবসম্মত হতে পারিনি। সাংবিধানিক সংকট শেখ হাসিনার পছন্দের শব্দ ছিল। কিন্তু আজ যে প্রক্রিয়া চলছে, তা আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
রূপালী বাংলাদেশ : তরুণদের দল এনসিপি ক্ষমতায় গেলে কেমন হবে আধুনিক রাজনীতি এবং অর্থনীতি?
সামান্তা শারমিন : বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গত ৫৩ বছরে একটি ‘মাফিয়াতন্ত্র’ ‘গু-ামিতন্ত্রে’ পরিণত হয়েছে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি জায়গায় সিন্ডিকেট ও দখলদারত্বের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় দেশে কার্যত একটি অর্থনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। দেশ স্বাধীন হলেও রাষ্ট্রের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো এখনো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আইনেই পরিচালিত হচ্ছে। অতীতের রাজনৈতিক দলগুলো একচ্ছত্র আধিপত্য, গু-া-মাস্তান নিয়ন্ত্রণ, দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে রাজনীতি পরিচালনা করেছে, ফলে প্রতিটি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপি দেশের জন্য একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ভাবনা সামনে আনতে চায়।
রূপালী বাংলাদেশ : দেশের রাজনীতিতে নারীদের যুক্ত হওয়ার পরিবেশ কতটা সহায়ক?
সামান্তা শারমিন : রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রয়োজন। দলগুলো শুধু নির্বাচন নিয়ে পড়ে থাকায় ছোটখাটো সংস্কারগুলো পিছিয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলোয় বড় কোনো পদে নারীরা স্থান পান না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হলো অর্থ, অস্ত্র ও পেশিশক্তিভিত্তিক। তাই রাজনীতিতে পুরুষরা অগ্রাধিকার পান। মূল কথা, নারীদের রাজনীতি করার পরিবেশ একেবারেই অনুকূলে নয়। নারীরা নানাভাবে হ্যারেজমেন্ট এবং বুলিংয়ের শিকার হন। এ কালচার থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
রূপালী বাংলাদেশ : জাপার বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?
সামান্তা শারমিন : জাতীয় পার্টি (জাপা) তৈরি করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন সংকট সৃষ্টির জন্য। এনসিপি মনে করে জাপার সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের আমলে একের পর এক অবৈধ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে সেগুলোকে বৈধতা দেওয়া এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দলের পক্ষে ঝা-া ধরার জন্য তাদের বিচার হওয়া প্রয়োজন।
রূপালী বাংলাদেশ : কোন আসন থেকে নির্বাচন করছেন আপনি?
সামান্তা শারমিন : আমার ক্ষেত্রে বলব, আমি আসনভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। একজন রাজনীতিকের দায়িত্ব পুরো বাংলাদেশ। আমি সেভাবেই চিন্তা করেছি। তবে কোন আসন থেকে আমি নির্বাচন করব, সে বিষয়ে আমার দল নিশ্চয় আমার বিষয়ে যথাযোগ্য সিদ্ধান্ত নিবে। সেই বিশ্বাস আছে এবং সেটিই হবে আশা করি।
রূপালী বাংলাদেশ : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ রূপালী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।
সামান্তা শারমিন : আপনাকেও ধন্যবাদ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন