ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তন

অভিঘাত মোকাবিলায় প্রস্তুত ২৬ হাজার মাধ্যমিক স্কুল

উৎপল দাশগুপ্ত
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৬, ২০২৫, ০৭:১৭ এএম

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বাড়াতে প্রস্তুতি নিয়েছে দেশের সাড়ে ২৬ হাজার মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মাধ্যমিক স্তরের এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলতি বছরসহ আগামী তিন বছরে অনুদান পাচ্ছে ৫৩ কোটি টাকা। প্রথম পর্যায়ে চলতি বছরের জুনে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পাঁচ হাজার টাকা করে মোট ১৩ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এ অনুদান দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি করে ফলদ ও বনজ গাছ রোপণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও সচেতনতা বিষয়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতা আয়োজন ও দেয়ালিকা প্রকাশ করবে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের অধীনে ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (লেইস)’ প্রজেক্টের আওতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই অনুদান পাচ্ছে। প্রথম পর্যায়ের কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় আরও বড় ও বিস্তৃত পরিসরে এই কার্যক্রম চলমান রাখতে বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে লেইস প্রকল্পে ১৫০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাতার ফাউন্ডেশন।

২০২৩ থেকে ২০২৮ সাল মেয়াদি লেইস প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের সাড়ে ২৬ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোপিত অর্ধলক্ষেরও বেশি গাছ স্থানীয়ভাবে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমাতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়নাধীন এ-সংক্রান্ত অন্যান্য কার্যক্রমও শিক্ষার্থীদের সচেতন করবে। তাই জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় এমন কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

লেইস প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শিখন ত্বরান্বিতকরণ এবং ধরে রাখার হার বৃদ্ধি; মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন; মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও সহনক্ষমতা উন্নয়ন। প্রকল্পটির গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রশিক্ষণ, ১০ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, এক হাজার ই-কন্টেন্ট তৈরি, লাইব্রেরি উন্নয়ন ও জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও শিক্ষর্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন। 

জানা গেছে, প্রকল্পের ‘রেজাল্ট এরিয়া এ.৩: ইমপ্রুভড সেকেন্ডারি এডুকেশন সিস্টেম’ এর আওতায় মাধ্যমিক শিক্ষাক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় বিশ^ব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তির শর্তানুসারে প্রথম বছরের ডিসবার্সমেন্ট (ছাড়করণ) লিংকড রেজাল্ট (ডিএলআর)-৬.১ অর্জনের অংশ হিসেবে এরইমধ্যে ‘মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত ম্যানুয়াল’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত কর্মসূচির মধ্যে অন্যতম হলো মাধ্যমিক ও দাখিল স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জলবায়ু সচেতনতা কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বছরে ৫ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হবে। অনুদানের পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে এক হাজার টাকায় একটি করে ফলদ ও বনজ বৃক্ষ রোপণ এবং পরিচর্যা; দুই হাজার টাকায় জলবায়ু বিষয়ে বিতর্ক/উপস্থিত বক্তৃতা আয়োজন ও পুরস্কার ক্রয়; এবং দুই হাজার টাকায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে জলবায়ু সচেতনতামূলক দেয়ালিকা প্রকাশ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে চলতি বছরের জুনে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ৫০০০ টাকা করে ২৬ হাজার ৫৩৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট ১৩ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ২০২৮ সাল পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুদান দেওয়া হবে।

লেইস প্রকল্পের আওতায় জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও অভিযোজন সম্পর্কে সম্পর্কে সচেতন করতে ইতিমধ্যে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর বিয়াম সেন্টারে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল যাচাই করে চূড়ান্ত করা হয়। জলবায়ু সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি এই প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালের উদ্দেশ্য হচ্ছে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শেখার গতি এবং ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ানো; গণিত ও বাংলায় ৮ম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা ৬৫ এবং ৯০ শতাংশে উন্নীত করা; ১০ম শ্রেণিতে (ষষ্ঠ শ্রেণিতে শুরু করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে) ধরে রাখার হার ২০২৮ সালের মধ্যে ৭৪ শতাংশ বাড়ানো ও শিক্ষকদের দক্ষতা ১৫ শতাংশ বাড়ানো। জলবায়ু সচেতনতার বিষয়ে প্রকল্পের প্রথম বছরে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের জন্য মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য একটি নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে। নির্দেশিকা অনুসারে শীর্ষ ১০০টি স্কুলে সার্টিফিকেশন/পুরস্কার বিতরণ করা হবে।

সূত্র জানায়, জলবায়ু বিষয়ে সচেতনতা তৈরির প্রথম পর্যায় সফলভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় আরো বড় ও বিস্তৃত পরিসরে এসব কার্যক্রম চলমান রাখতে বিশ^ব্যাংকের মাধ্যমে লেইস প্রকল্পে ১৫০ কোটি টাকা দিচ্ছে কাতারের ‘এডুকেশন এভাব অল ফাউন্ডেশন’। এ বিষয়ে এরইমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সঙ্গে ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যাডিং (এমওইউ)’ সাক্ষর হয়েছে। কাতারের এই অনুদান পূর্ণাঙ্গ ও একমাত্রভাবে শিক্ষার্থীদের জলবায়ু সচেতনতা তৈরিতে ব্যবহার করা হবে।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় ১০৭টির মধ্যে লেইস প্রকল্পের মাধ্যমে ৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জলবায়ু সচেতনতাবিষয়ক কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় লেইস প্রকল্পের এই কার্যক্রম সময় উপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন বীরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মহাম্মদ জুলফিকার আলী শাহ। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘লেইস প্রকল্পের মাধ্যমে অনুদান পাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের পক্ষে কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হয়েছে। অর্থের পরিমাণ যাই হোক, দুটি গাছ লাগানো ও তদারকি করে বড় করার পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত বিতর্ক আয়োজন ও দেয়ালিকা প্রকাশ, সবকিছুতেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ সার্বিকভাবে জলবায়ু সচেতনতায় বড় প্রভাব রাখবে।’ ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে জলবায়ু সচেতনতা তৈরিতে লেইস প্রকল্পের উদ্যোগকে প্রশংসনীয় বলে মন্তব্য করেছেন সিলেটের দক্ষিণ সুরমার হাজী মোহাম্মদ রাজা চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রান্টু রঞ্জন রায়। তিনি বলেন, ‘আমার স্কুলে এ নিয়ে বড় একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল লক্ষ্যণীয়। কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবার মধ্যেই ব্যাপক উৎসাহ ছিল।’ এ ধরনের কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা উত্তরোত্তর বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

টেকনাফের হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, ‘শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সরাসরি অংশগ্রহণে জলবায়ু সচেতনতা তৈরিতে এই কার্যক্রম অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। প্রকল্পের মাধ্যমে বা সরাসরি সরকারের মাধ্যমে যেভাবেই হোক, ধারাবাহিকভাবে এমন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।’ পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করে বা ইউক্যালিপটাস গাছ লাগিয়ে যেভাবে পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে তাতে লেইস প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হতে পারবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

লেইস প্রকল্পের কর্মসূচিগুলো এরইমধ্যে দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রকল্পের পরিচালক প্রফেসর শিপন কুমার দাস। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে কাতার ফাউন্ডেশন এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে আরও ১৫ মিলিয়ন ডলারের জলবায়ু অনুদান প্রদানে আগ্রহ ব্যক্ত করেছে।’ প্রশিক্ষণের মাধ্য্যমে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের এ বিষয়ে প্রস্তুত করা হবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, এ প্রকল্প জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহকে প্রস্তুত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’