উনিশ শতকের গোড়ার দিকে নদীয়া, যশোর, চব্বিশ পরগনা, খুলনা জেলা তথা নি¤œবাংলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা নীল কনসার্নকে ঘিরে নির্মিত হতে থাকে ইংলিশ স্টাইলে সুদৃশ্য বাসভবন, নীল কারখানা, কুঠিবাড়ি। ইউরোপ থেকে আগত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, বেঙ্গল ইন্ডিগো কোম্পানি, রবার্ট ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানির মতো বড় বড় কোম্পানি নীলচাষ ও নীল কারবারের সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রতাপশালী নীলকর জেমস হিলসের বেঙ্গল ইন্ডিগো কোম্পানির সদর কুঠি স্থাপিত হয় ইছামতি তীরবর্তী মোল্লাহাটি, যার আরেক নাম মুলনাথ। এই কুঠির কাছাকাছি নদীয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম চৌবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন কালজয়ী নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র। তার পিতৃদত্ত নাম গন্ধর্বনারায়ণ, স্কুলে পড়ার সময় নিজেই নামটি বদলে নিয়েছিলেন। যে-পরিবারে তিনি জন্ম নেন সেই পরিবারের উল্লেখ করার মতো আভিজাত্য, বিত্ত-বৈভবের জৌলুস, বর্ণাঢ্যতা কোনো কিছুই ছিল না। তবে দীনবন্ধুর জীবন কাহিনির ভেতর কিছুটা হলেও বর্ণাঢ্যতা, রোমাঞ্চ ও নাটকীয়তা ছিল। দীনবন্ধু মিত্র কলেজে অধ্যয়নকালেই ঈশ্বর গুপ্তের সংস্পর্শে এসে সংবাদ প্রভাকর, সাধুরঞ্জন প্রভৃতি পত্রিকায় কবিতা লিখতে শুরু করেন। তবে বাংলা সাহিত্যে নাটক ও প্রহসন লিখেই তিনি সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেন। দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকটি তৎকালীন সমাজে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং অবহেলিত কৃষকদের নীল বিদ্রোহে ইন্ধন জোগায়। সমকালীন নীল চাষ ও নীলকর সাহেবদের প্রজাপীড়ন এবং শাসক শ্রেণির পক্ষপাতমূলক আচরণ নাটকটির মূল বিষয়বস্তু। বাংলার স্বাধীনতা সূয অস্তমিত হওয়ার শতবর্ষ পেরিয়ে ১৮৬০ সালে বের হয় ‘নীল দর্পণ’ নাটক। প্রথমে নাম ছিল ‘নীল দর্পনং নাটকং’। দীনবন্ধু মিত্রের পরিবর্তে ছদ্মনামে বেরিয়েছিল বইটি। স্বাদেশিকতা, নীল বিদ্রোহ ও সমসাময়িক বাংলার সমাজ ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে লেখা এ বইটি পরবর্তীতে ১৮৬১ সালে ‘ঘরষষ উঁৎঢ়ধহ,ঙৎ ঃযব রহফরমড় ঢ়ষধহঃরহম সরৎড়ৎ’ নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়, প্রকাশক ছিলেন রেভারেন্ড জেমস লঙ।
এটিই প্রথম বাংলা নাটক, যা ইংরেজিতে অনূদিত হয়। বিদেশি পত্রিকায় প্রথম কোনো বাংলা বইয়ের ওপর সমালোচনামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার দাবিদার নীল দর্পণ বইটি। বইটির ইংরেজি অনুবাদ ইংল্যান্ডে প্রকাশিত হওয়ার পর এবং দেশ বিদেশে নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন ও সমালোচনা শুরু হলে সরকার শেষ পর্যন্ত নীল কমিশন স্থাপন করতে বাধ্য হয়। যা নীলকরদের দৌরাত্ম্য থেকে দরিদ্র কৃষকদের বাচাতে সহায়ক হয়। গ্রামের নাম স্বরপুর। গোলকচন্দ্র বসু এ গ্রামেরই সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত ও গৃহস্থ সম্পন্ন। স্ত্রী সাবিত্রী, দুই পুত্র নবীন মাধব ও বিন্দু মাধব এবং দুই পুত্রবধূ সৈরিন্ধ্রী ও সরলতাকে নিয়ে তার সুখের সংসার। নবীন মাধব উদারচেতা, প্রজাবৎসল ও হৃদয়বান পুরুষ; বাড়িতে থেকেই বিষয়কর্মের দেখাশোনা করেন। তার ছোট ভাই বিন্দুমাধব কলকাতার কলেজে পড়াশোনা করে। এই পরিবারের বাইরেএ আরেকটি পরিবারের কথাও নাটকে উল্লেখ আছে, সাধুচরণের পরিবার। স্ত্রী রেবতী, কন্যা ক্ষেত্রমনি আর ভাই রাইচরণকে নিয়ে তাদের সংসার। ‘বাড়া ভাতে ছাই তব বাড়া ভাতে ছাই ধরেছে নীলের যমে আর রক্ষা নাই।’
ইংল্যান্ডে নীলের চাহিদা বেড়ে গেলে, বহু নীলকর ইংল্যান্ড থেকে এদেশে আগমন করে। তেমনি এক নীলকরের গ্রাসে পরিণত হয় তাদের ফসলি জমিগুলো। কিন্তু সমস্ত ভালো জমিতে নীল বুনলে তাদের সারা বছরের ভাত জুটবে কি করে? নবীন মাধব কিছু জমি ফসলের জন্য ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানালে নীলকর সাহেব গোলকবসুর নামে মামলা করে। কারণ বাবাকে গ্রেপ্তার করলেই নবীন মাধব গোল বাধাতে সাহস করবে না। বিচারের সম্মুখীন করা হয় গোলক বসুকে। কিন্তু বিচারের নামে হয় প্রহসন! শেষ পর্যন্ত লজ্জা আর লাঞ্ছনা মাথায় নিয়ে কারাগারেই মৃত্যুবরণ করে গোলক বসু। ওদিকে বিবাহিত ক্ষেত্রমনির ওপর লোলুপ দৃষ্টি পড়ে নীলকর সাহেবের। জোর করে কুঠিতে তুলে নেয় তাকে। সতীত্ব নাশের চেষ্টাকালে নবীন মাধব কয়েকজন অনুগত প্রজাকে নিয়ে ক্ষেত্রমনিকে উদ্ধার করে।
কিন্তু তারপরও সাহেবের লাথির আঘাতে সন্তান সম্ভাব্য ক্ষেত্রমনির অবস্থা ক্রমশই খারাপের দিকে যেতে থাকে। বাবার শ্রাদ্ধের আগ পর্যন্ত পুকুর পাড়ের জমিতে নীল না বোনার জন্য নীলকরের প্রতি অনুরোধ জানায় নবীন মাধব, ৫০ টাকা সেলামিও দিতে চায়। কিন্তু প্রতি উত্তরে নীলকর সাহেব মৃত বাবার উদ্দেশ্যে হীনমন্তব্য করলে ক্ষীপ্ত হয়ে নবীন মাধব সাহেবের বুকে পদাঘাত করে। ভাড়াটে লাঠিয়ালরা নবীন মাধবকে ঘিরে ফেললে নীলকর সাহেব লাঠি দিয়ে নবীনের মাথায় আঘাত করলে মাটিতে পড়ে যায় সে। এভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে নাটকের বিভ ঘটনা এবং শেষ পর্যন্ত এক ট্রাজিক পরিণতির মাধ্যমে শেষ হয় নাটকের।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন