× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২৬, ০৬:৩১ এএম

অদৃশ্য ঘাতক ও নীলকুঠির রহস্য

ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২৬, ০৬:৩১ এএম

অদৃশ্য ঘাতক ও নীলকুঠির রহস্য

রাত তিনটা। গুলশান ২-এর রাস্তা প্রায় ফাঁকা। দূর থেকে মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। উঁচু অ্যাপার্টমেন্টগুলোর বেশিরভাগ আলো নিভে গেছে। প্রতিবেশীরা গন্ধ পেয়ে পুলিশের কাছে ফোন করেছে। ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর নাফিসা করিম দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলেন। ঘরের মাঝখানে চেয়ারে বসে আছেন মন্ত্রী আজমল হোসেন চৌধুরী, মন্ত্রিসভার অন?্যতম ক্ষমতাধর ব?্যক্তি। চোখ খোলা। মুখে অদ্ভুত হাসি। কিন্তু নিঃশ্বাস নেই। মৃত্যুর কারণ অজানা। শরীরে কোনো আঘাত নেই। বিষের চিহ্ন নেই। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ নেই। তবুও মানুষ টা মরে গেছে, ঠিক যেন ভয়ে। নাফিসা অনুভব করলেন ঘরের ভেতর অদ্ভুত এক ঠান্ডা নীরবতা। যেন এই ঘরে কিছু একটা ঘটেছে, কিন্তু তার কোনো চিহ্ন নেই।

নাফিসার সহকারী কনস্টেবল রাহুল টেবিলের ওপর একটি খাম দেখাল। খামের ওপর লেখা, এটা প্রথম। এখনো অনেক বাকি। নাফিসা করিম এই বিভাগে এসেছেন মাত্র ছয় মাস হলো। আগে ছিলেন সাইবার ক্রাইম ইউনিটে। তাকে বদলি করানো হয়েছে এক রহস্যময় কারণে, যেটা তিনি নিজেও পুরোপুরি জানেন না। তার বস এডিসি রাশেদ ফারুক ঘরে ঢুকে ফিসফিস করলেন, নাফিসা, এই মামলাটা যেন বাইরে না যায়। উপরের চাপ আছে। নাফিসা সরাসরি তার চোখে তাকালেন। স্যার, লাশ কি আমরা লুকাতে পারব? রাশেদ ফারুক কিছু বললেন না। নীরবে চলে গেলেন। পরদিন সকালে নাফিসা অফিসে ঢুকে দেখলেন, তার ডেস্কে একটি পুরোনো ফাইল রাখা। খুলতেই বুকটা ধক করে উঠল। পঁচিশ বছর আগে ঠিক একইভাবে মারা গিয়েছিলেন চারজন মানুষ। একই রকম অক্ষত শরীর, একই রকম মুখের হাসি, একই রকম রহস্যময় চিঠি। মামলাটা তদন্ত করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন ডিটেক্টিভ ইন্সপেক্টর আনোয়ার করিম। নাফিসার বাবা। হঠাৎ মনে পড়ল ছোটবেলায় তার বাবার কথা। বাবা বলতেন, সত্যকে খুঁজতে গেলে ভয়কে বন্ধু বানাতে হয়। নাফিসার হাত কাঁপছে। তিনি এতদিন এটা জানতেন না। মা বলতেন, তোর বাবা কাপুরুষ ছিল না। কিন্তু ফাইলের শেষ পাতায় আনোয়ার করিমের হাতের লেখা একটি নোট, এটা মানুষ করেনি। কিন্তু মানুষকে দিয়ে করানো হয়েছে। যে সত্যটা জানবে, সে আর ফিরে আসবে না, যদি সে সত্যকে ভয় পায়।

নাফিসা মামলার তদন্ত শুরু করলেন। মন্ত্রীর শেষ চব্বিশ ঘণ্টার ট্র্যাক করতে গিয়ে জানলেন, মৃত্যুর আগের রাতে তিনি গিয়েছিলেন পুরান ঢাকার একটি পুরোনো হাভেলিতে। জায়গাটার নাম নীলকুঠি। সেখানে একটি গোপন সংগঠনের বৈঠক হয়। সংগঠনের নাম, চতুর্থ স্তম্ভ। পুলিশের পুরোনো নথিতে এই নামের কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব নেই। কিন্তু গোপন সূত্রে মাঝে মাঝে একটি নাম শোনা যায় চতুর্থ স্তম্ভ। রাহুল ইন্টারনেটে খুঁজে বলল, ম্যাডাম, এদের সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই, একটাও না। যেন এরা অস্তিত্বহীন। কিন্তু নাফিসা জানেন, যে জিনিস নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে এতটা নিখুঁতভাবে, সে আসলে অনেক বেশি ক্ষমতাধর। সেদিন রাতে নাফিসার ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে মেসেজ আসে। তুমিও তোমার বাবার মতো ভুল করো না। সরে যাও। নাফিসা উত্তর দিলেন, আমি কোথাও যাচ্ছি না। দশ সেকেন্ড পরে জবাব এলো, আমরা জানতাম তুমি এটাই বলবে। দ্বিতীয় লাশটি পাওয়া গেল সংসদ ভবনের পাশে

এবারের শিকার সিনিয়র সাংবাদিক করিমুল ইসলাম। যিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন। একই চিত্র। অক্ষত শরীর। হাসি মুখ। একটা চিঠি। কিন্তু এবার চিঠিতে আরও কিছু ছিল সঙ্গে একটি ছবি। ছবিতে নাফিসা নিজে নীলকুঠির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে। নাফিসা তখন ফরেনসিক ডাক্তার ডা. তানভীরের কাছে গেলেন। তানভীর রিপোর্ট দিলেন, নাফিসা, দুটো লাশের ব্রেন স্ক্যান দেখ। স্ক্যানে দেখা গেল, মৃত্যুর ঠিক আগে দুজনের ব্রেনে অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক তরঙ্গ তৈরি হয়েছিল। যেন কেউ বাইরে থেকে তাদের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করছিল। এটা কি সম্ভব? নাফিসা জিজ্ঞেস করলেন। তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, বিজ্ঞান বলে না। কিন্তু যা দেখছি সেটা বাস্তব। নাফিসা নীলকুঠিতে গেলেন। রাহুলকে বললেন বাইরে থাকতে।ভেতরে ঢুকতেই বুঝলেন বাড়িটা দুই’শ বছরের পুরোনো। ব্রিটিশ আমলের।

দেওয়ালে পুরোনো পোর্ট্রেট। অন্ধকার করিডর। এখানে যাওয়ার আগে বাড়ির পুরাতন কাগজপত্র পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি একটা পুরাতন ডায়েরি পান । ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা, আনোয়ার করিম, ১৯৯৭। বাবার ডায়েরি।  ডায়েরি পড়তে পড়তে জানলেন, চতুর্থ স্তম্ভ আসলে একটি গোপন রাজনৈতিক সংগঠন যারা দেশের শীর্ষ ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু তাদের আসল শক্তির উৎস রাজনীতি নয়। তারা ব্যবহার করে একটি প্রাচীন পদ্ধতি, মানুষের ভয়কে অস্ত্র বানানো। বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, ওষুধ, এবং অজানা প্রযুক্তির মিশ্রণে তারা মানুষকে এতটাই আতঙ্কিত করে তোলে যে হৃদপি- নিজে থেকে থেমে যায়। যারা তাদের বিরুদ্ধে যায় তারা হয় মরে, না হয় পাগল হয়ে যায়। আনোয়ার করিম লিখেছেন, আমি জেনে গেছি তারা কে। তাই আর বেশিদিন হয়তো বাঁচব না। কিন্তু যদি কেউ এটা পড়েন, জেনে রাখবেন, ভয়টাই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ভয় না পেলে তারা কিছুই করতে পারে না। নাফিসা, যদি তুই কোনোদিন ডায়েরিটা খুঁজে পাস,মনে রাখিস, বাবা তোকে ভালোবাসে। ডায়েরির পাতায় বাবার হাতের লেখা দেখে তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। এত বছর পর মনে হলো বাবা যেন তার সঙ্গে কথা বলছেন। নাফিসা বাবার ডায়েরি বুকে চেপে ধরলেন ও কিছুক্ষণ কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারপর রাগে ক্ষুব্ধ হয়ে ডায়েরিটা বাড়িতে রেখে নীলকুঠির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন। এখানে ঢুকার অল্প একটু সময় পার হওয়ার পর পেছনে আওয়াজ হলো। ঘুরে দেখলেন, তার বস রাশেদ ফারুক। পাশে আরও দুজন। তোমার বাবাও এভাবেই এখানে এসেছিল, রাশেদ বললেন শান্ত গলায়। তুমি তার মেয়ে, এটা মানতেই হবে।

নাফিসা টের পাচ্ছিলেন কিছু একটা হচ্ছে। মাথা ভারী হয়ে আসছে। নাফিসার মনে হলো বুকের ভেতর যেন কেউ মুঠো করে ধরেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সব শেষ হয়ে যাবে। চোখের সামনে সব ঝাপসা লাগছে। তারা তাকেও দিয়েছে। কিছু একটা হয়তো বাতাসে, নয়তো দরজার হাতলে। মস্তিষ্কে ঢেউয়ের মতো ভয় আসতে শুরু করল। বাবার স্মৃতি। একাকিত্ব। মায়ের অভিযোগ। পুরোনো ব্যর্থতা। সব একসঙ্গে ধাক্কা দিচ্ছে। হৃৎপি- দ্রুত চলছে। কিন্তু তখনই বাবার কথাটা মাথায় এলো, ভয় না পেলে তারা কিছুই করতে পারে না। নাফিসা চোখ বন্ধ করলেন। শ্বাস নিলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন, ভয় পাবেন না। মাথার ঝাপসাভাব সরে গেল। রাশেদ অবাক হয়ে দেখলেন, নাফিসা সোজা দাঁড়িয়ে। এই পদ্ধতি কাজ করে যখন মানুষ ভয় পায়, নাফিসা বললেন। আমি আল্লাহ্ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না। হঠাৎ বাইরে ধাতব শব্দ। তারপর জোরে দরজা ভাঙার আওয়াজ। রাহুলের কণ্ঠ ভেসে এলো, পুলিশ! কেউ নড়বে না। রাহুল পুরো টিম নিয়ে এসেছে। নাফিসা শুরু থেকে ফোন অন রেখেছিলেন। রাশেদ ফারুকসহ চতুর্থ স্তম্ভের সাতজন সদস্য গ্রেপ্তার হলো। তদন্তে বেরিয়ে এলো, দেশের একটি গোপন ল্যাবে তৈরি হতো বিশেষ নিউরো-কেমিক্যাল অস্ত্র। যা মানুষের ভয়কে কয়েক’শ গুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রযুক্তিটা এসেছিল বিদেশ থেকে। কিন্তু পঁচিশ বছর ধরে ব্যবহার হচ্ছিল দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে। সংবাদ সম্মেলনে নাফিসাকে প্রশ্ন করা হলো, আপনি কীভাবে বাঁচলেন, যেখানে সবাই মারা গেছে?

নাফিসা একটু হাসলেন। আমার বাবা শিখিয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন রাতে নাফিসা কবরস্থানে গেলেন। বাবার কবর নেই। শরীর কখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু মা একটি নামফলক রেখেছিলেন। নামফলকের ওপর হাত রেখে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। এতদিন পর মনে হলো, বাবার অসমাপ্ত যুদ্ধটা তিনি শেষ করতে পেরেছেন। হালকা বাতাস এলো সঙ্গে রাতের অন্ধকারের মৃদু আলো। সে ফিসফিস করে বললেন, তুমি কাপুরুষ ছিলে না, বাবা।

তুমি শুধু একা ছিলে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!