অসীম রায়ের জন্ম ১৯২৭ সালের ৯ মার্চ তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ভোলা জেলায়। তার পিতা ছিলেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরিজীবী পিতার বদলির সুবাদে অসীম রায় শৈশব থেকেই বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের জনজীবন ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য দেখার বিরল সুযোগ পান। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তার কথাসাহিত্যে স্থান-কাল-পাত্রের নিখুঁত চিত্রায়ণে সহায়ক হয়েছিল। তিনি কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৪৬ সালে ইংরেজিতে অনার্সসহ স্নাতক এবং ১৯৪৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
এই উচ্চশিক্ষিত ও মার্জিত বুদ্ধিবৃত্তিক রুচি তার সাহিত্যের প্রতিটি ছত্রে মিশে আছে।
সাহিত্যিক জীবনের বিবর্তন : যদিও অসীম রায় ঔপন্যাসিক হিসেবেই বিশ্ববন্দিত, কিন্তু তার সাহিত্যিক জীবনের সূচনা হয়েছিল কবিতার মাধ্যমে। ১৯৫০ সালে তার প্রথম গ্রন্থ ‘ফুটপাথে ফুলের গল্প’ ছিল একটি কাব্যগ্রন্থ। এরপর ১৯৭১ সালে নকশালবাড়ির উত্তাল সময়ে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আমি হাঁটছি’। তবে অচিরেই তিনি অনুভব করেন, সময়ের জটিল আবর্তন এবং সমাজ-রাজনীতির গভীর ক্ষতগুলো প্রকাশের জন্য কবিতার চেয়ে গদ্যের পরিসরই অধিক উপযোগী। ১৯৫৩ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘একালের কথা’ প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা কথাসাহিত্যে তার স্থায়ী আসন নির্মিত হয়।
সাংবাদিক জীবনের প্রভাব : ১৯৫০ সালে তিনি ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ ৩৫ বছরের সাংবাদিক জীবন তার গদ্যকে দিয়েছিল এক ঋজু, সংহত এবং নির্মেদ শক্তি। কর্মজীবনে বারবার বেকারত্বের শিকার হলেও তিনি তার কলমের সততা বিসর্জন দেননি।
রাজনৈতিক দর্শন : ছাত্রজীবন থেকেই অসীম রায় বামপন্থি রাজনীতির সংস্পর্শে এসেছিলেন। তার সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের একটি সুসংহত প্রতিফলন দেখা যায়। তবে তিনি কোনোদিনও দলীয় মতাদর্শের অন্ধ অনুসারী ছিলেন না। নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত তার উপন্যাস ‘গৃহযুদ্ধ’ এবং ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ‘অর্জুন সেনের জিজ্ঞাসা’-তে আমরা দেখি সমকালীন রাজনীতি ও ব্যক্তিগত নীতিবোধের দ্বন্দ্ব। তার ব্যক্তিজীবনের অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে রাজনৈতিক মতান্তর দেখা দিলেও তিনি তার বৈপ্লবিক চেতন থেকে বিচ্যুত হননি।
ইতিহাসের দর্পণে সমকালের বিশ্লেষণ : অসীম রায়ের সাহিত্যজীবনের উত্তর-পর্বটি ছিল ইতিহাস-আশ্রয়ী। সত্তরের দশকের শেষে তিনি ইতিহাসের কালগর্ভে সমকালীন সংকটের শেকড় খুঁজতে চেয়েছেন। এ পর্যায়ে তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হলো- নবাববাদী (১৯৮১) : এটি তার এক অনন্য সৃষ্টি। পলাশী যুদ্ধ ও পরবর্তী প্রশাসনিক ভাঙাগড়ার ইতিহাস এখানে এক নতুন মাত্রায় ফুটে উঠেছে। ঐতিহাসিক ত্রয়ী: ‘পলাশী কতদূর’, ‘নবাব ক্লাইভ’ এবং ‘নবাব আলিবর্দী’Ñএই তিনটি উপন্যাস গ্রন্থাকারে না আসলেও শারদীয় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে বিদগ্ধ মহলের সবিশেষ মনোযোগ কেড়েছিল। মহাকাব্যিক সৃজন:‘আবহমানকাল’ অসীম রায়ের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলোর তালিকায় ‘আবহমানকাল’ (১৯৭৮) উপন্যাসটি বিশেষ সম্মানের অধিকারী। সমকালীন সামাজিক ইতিহাসের বিশাল ক্যানভাস এই উপন্যাসে তিনি এঁকেছেন। দেশভাগ, দাঙ্গা, স্বাধীনতার মোহভঙ্গ, মধ্যবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই মিলিয়ে এটি মহাকাব্যিক দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
ডায়েরি ও জার্নাল : অসীম রায়কে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে গেলে তার ডায়েরি ও জার্নাল পাঠ করা অত্যাবশ্যক। ‘অসীম রায়ের ডায়েরি’, ‘জার্নাল’ এবং ‘ধুলো ধোঁয়া নক্ষত্র’Ñএই আত্মজৈবনিক রচনাগুলোতে তিনি নিজেকে নির্মোহভাবে উন্মোচিত করেছেন। নিজের জীবনের প্রেম-অপ্রেম, একাকিত্ব, বেকারত্বের জ্বালা এবং সাহিত্যিকদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কথা তিনি সেখানে অকপটে লিখেছেন। এ ছাড়া তার প্রবন্ধগ্রন্থ ‘রবীন্দ্রনাথ ও তার উত্তরাধিকার’ (১৯৮৬) তার গভীর সাহিত্য-বীক্ষার পরিচয় দেয়।
সাহিত্যিক মূল্যায়ন : অসীম রায়ের মোট উপন্যাসের সংখ্যা ১৬টি এবং ছোটগল্প ৬৪টি। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রবাদপ্রতিম সমালোচকেরা তার কাজের উচ্চ প্রশংসা করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও, অসীম রায় কোনোদিনই তথাকথিত ‘জনপ্রিয়’ বা ‘বেস্টসেলার’ লেখক হতে পারেননি। তার লেখার জটিল বুনন, মননশীলতা এবং সস্তা ভাবাবেগের অনুপস্থিতি সাধারণ পাঠককে হয়তো কিঞ্চিৎ দূরত্বে রেখেছে। কিন্তু বাংলা উপন্যাসের ‘কালান্তর’ বা আধুনিক
প্রয়াণ ও উত্তরাধিকার : ১৯৮৬ সালের ৩ এপ্রিল অসীম রায় ইহলোক ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে তার বইয়ের কাটতি তেমন ছিল না, এমনকি মৃত্যুর পরেও তিনি এক প্রকার অবহেলিতই থেকে গেছেন। সময় যত এগোচ্ছে, আধুনিক মননশীল পাঠকের কাছে অসীম রায়ের প্রাসঙ্গিকতা তত বাড়ছে। ব্যক্তি অসীম রায়ের সঙ্গে শিল্পী অসীম রায়ের যে নিবিড় সংযোগ, তা বাংলা কথাসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ হয়ে চিরকাল বিরাজ করবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন