× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আসাদুজ্জামান খান মুকুল

প্রকাশিত: মে ১, ২০২৬, ০৬:২৫ এএম

প্রবন্ধ

মে দিবস : ঘাম ও অধিকারের অমর উপাখ্যান

আসাদুজ্জামান খান মুকুল

প্রকাশিত: মে ১, ২০২৬, ০৬:২৫ এএম

মে দিবস : ঘাম ও অধিকারের অমর উপাখ্যান

রক্তে রাঙানো ইতিহাস শত সহস্র বছর পরে হলেও কথা বলে। এটিকে কখনো কোনো মেকি গল্প দিয়ে টেকানো যায় না। মে দিবস তেমনই এক অধ্যায়, যা কেবল ক্যালেন্ডারের লাল দিয়ে চিহ্নিত করা তারিখ নয়। মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের টিকে থাকার তীব্র লড়াইয়ের দিন। ১৮৮৬ সালের সেই সময়ে শিকাগো শহরের কলকারখানাগুলো ছিল যেন একেকটি জীবন্ত নরক। সূর্য ওঠার আগে শ্রমিকরা যন্ত্রের সামনে দাঁড়াত, আর সূর্য ডোবার বহু পরে আধমরা হয়ে ঘরে ফিরত। কোনো বিশ্রাম নেই, কোনো নিরাপত্তা নেই। মানুষের পরিচয় তখন ছিল কেবল সস্তা শ্রমঘণ্টা। কারখানার গুমোট পরিবেশে ফুসফুস ক্ষয়ে যেত হাজারো মানুষের। মালিকপক্ষ তখন কেবল বুঝত মুনাফা। শ্রমিকের শরীর বা মন নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। শিকাগো হিস্টোরিকাল সোসাইটির নথিগুলো পড়লে আজও শিউরে উঠতে হয় সেই অমানবিক দাসত্বের বিবরণ দেখে।

এই চরম অবমাননার বিরুদ্ধেই প্রথম সংগঠিত আওয়াজ উঠেছিল। আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম আর আট ঘণ্টা বিনোদন। খুব সাধারণ এই দাবির পেছনে ছিল মানুষের মতো বেঁচে থাকার করুণ আর্তি। পহেলা মে যখন শিকাগোর রাস্তায় হাজার হাজার শ্রমিক নামে, তারা জানত না এই মিছিলের শেষ গন্তব্য হবে শ্মশান কিংবা ফাঁসির মঞ্চ। ৪ মে হে-মার্কেটের সেই গোধূলি বেলায় যখন ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে বোমার শব্দ হলো, পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ল সাধারণ মানুষের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথ রক্তে ভেসে গেল। এগারোজন মানুষ লুটিয়ে পড়ল ধুলোয়। তাদের অপরাধ ছিল কেবল তারা মানুষের মতো বাঁচতে চেয়েছিল। সেই বৃষ্টির সন্ধ্যায় রাজপথের রক্তের দাগ ধুয়ে যায়নি, বরং তা ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী কালি হয়ে বসে গেছে।

বিচারের নামে যা হয়েছিল, তাকে ইতিহাস আজীবন প্রহসন বলে চেনে। আনন্দের জেরে আগস্ট স্পীজ আর তার সহযোদ্ধাদের যখন ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হলো, তারা একটুও বিচলিত হননি। মৃত্যুর হিমশীতল পরশ সামনে রেখেও স্পীজ যে অমর জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তা আজও পৃথিবীর প্রতিটি শ্রমিকের হৃৎস্পন্দন। তিনি বলেছিলেন, আমাদের এই নীরবতা তোমাদের শোরগোলের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হবে। আজ সারা বিশ্বের অগণিত কলকারখানার সাইরেনে সেই নীরবতা গর্জে ওঠে। বিচার বিভাগীয় সেই পুরোনো রেকর্ডগুলো আজও সাক্ষ্য দেয় যে, অন্যায় বিচারে মানুষকে মারা যায় কিন্তু তার আদর্শকে নয়। সেই ফাঁসির মঞ্চই আসলে শ্রমিকের জয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।

আন্দোলনের সেই আগুনের শিখা দ্রুতই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশে। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল সোশালিস্ট কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ১ মে বিশ্বজনীন রূপ পায়। পরবর্তী সময়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবগুলো শ্রমিকের হাতে ক্ষমতার হাতল ধরিয়ে দিয়েছিল। রাষ্ট্র বুঝতে বাধ্য হয়েছিল যে, মালিকের পুঁজি আর শ্রমিকের ঘাম দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও-র আর্কাইভ ঘাটলে দেখা যায়, কীভাবে এই একটি দিনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম বিশ্বজুড়ে শ্রম আইন ও নীতিমালার আমূল পরিবর্তন এনেছে। শ্রমিকরা এখন আর স্রেফ দয়া ভিক্ষা করা কোনো শ্রেণি নয়। তারা অধিকার সচেতন এক অনন্য সামাজিক শক্তি।

বাংলাদেশে এই দিনটির গুরুত্ব ও আবেগ একটু আলাদা। এদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা মানুষগুলো রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে। আমাদের পোশাক কারখানা থেকে শুরু করে নির্মাণাধীন প্রতিটি দালানের ইটে মিশে আছে শ্রমিকের স্বপ্ন আর বঞ্চনার করুণ গল্প। বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশনের অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে সরকারিভাবে মে দিবস পালন করে ঠিকই। কিন্তু মাঠপর্যায়ে আজও অনেক শ্রমিক তাদের ন্যায্য মজুরি পায় না। আট ঘণ্টার কাজের সীমা অনেক ক্ষেত্রে কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। উৎসবের আলোকসজ্জায় সেই ঘর্মাক্ত মুখগুলো আজও আড়ালেই রয়ে যায়। রাস্তার ধারের চা দোকান থেকে শুরু করে বিশাল শিপইয়ার্ড, সবখানেই শ্রমিকের ঘামের ঘ্রাণ লেগে আছে।

মে দিবস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, কোনো অধিকারই কোনোদিন বিনাশ্রমে অর্জিত হয়নি। এটি কেবল শোক পালনের দিন নয়, পহেলা মে নতুন করে শপথ নেওয়ার দিন। মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক যদি কেবল প্রভু আর দাসের হয় তবে জাতীয় উন্নয়ন কখনোই স্থায়ী হতে পারে না। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে শ্রমের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার যে চিরন্তন মানবিক নীতি, তার প্রতিফলন ঘটলে তবেই শিকাগোর শহিদদের আত্মা প্রকৃত শান্তি পাবে। শোষণের হাত বদলে যায় কিন্তু শোষিত মানুষের কষ্ট একই থাকে, এই সত্যটি আমাদের প্রতিটি মে দিবসে গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন।

ইতিহাস বদলে যায়, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কাজের ধরনও হয়তো পাল্টেছে। কিন্তু শ্রমের গুরুত্ব ও মূল্য আজও অমলিন। আজকের এই দিনে আমাদের সামাজিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত এমন এক বৈষম্যহীন সমাজ গড়া, যেখানে কোনো শ্রমিককে তার মৌলিক বেঁচে থাকার দাবির জন্য রাজপথে রক্ত দিতে হবে না। মে দিবস বেঁচে থাক প্রতিটি মেহনতি মানুষের লড়াকু চেতনায় ও প্রেরণায়। শোষণমুক্ত এক সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাক এই পহেলা মে। মানুষের জয় হোক, শ্রমের জয় হোক। পৃথিবীর সব মেহনতি হাত এক হোক। শ্রমিকের রক্ত যেন কখনো বৃথা না যায়।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!