ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

এখানেই শেষ মাসুদ রানা!

মির্জা হাসান মাহমুদ
প্রকাশিত: মে ২২, ২০২৬, ০৩:৩৭ এএম

মাসুদ রানা। নামটা শুনলেই চোখের সামনে শৈশবে দেখা অলস দুপুরের একটা ছবি ভেসে ওঠে। চৈত্র কিংবা শ্রাবণের একলা দুপুরে, চড়ুই পাখির ডাকে চারপাশ ঝিমঝিম করা মুহূর্তে একা ঘরের কোণে মাসুদ রানা তথা সেবা প্রকাশনীর নিউজপ্রিন্ট বইগুলো আমাদের জন্য হয়ে উঠত আস্ত মহাবিশ্ব। প্রচ্ছদের ওপর ডানা মেলে থাকা চেনা প্রজাপতি ছিল সেই মহাবিশ্বের প্রবেশদ্বার। কিছুদিন আগে আচমকা খবর এলো সেবা প্রকাশনীর অভ্যন্তরীণ নানা আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক টানাপোড়েনে আপাতত বন্ধ সকল কার্যক্রম। বুকের ভেতরে কেমন ছ্যাৎ করে উঠল, বোঝানো যাবে না। মনে হচ্ছিল, বাঙালি পাঠক সমাজের সামষ্টিক শৈশব-কৈশোরের সোনালি মুকুট বুঝি কেউ এক ঝটকায় কেড়ে নিল।

২. একটু ফ্ল্যাশব্যাকে, স্মৃতির অলিন্দে হেঁটে  আসা যাক। নব্বইয়ের দশক কিংবা এই শতাব্দীর প্রথম দশকটাতেও যাদের কৈশোর কেটেছে, তাদের কাছে মাসুদ রানা পড়া ছিল চরম থ্রিলিং, প্রায় নিষিদ্ধ এক গোপন মিশন। বাড়ির বড়দের নিষেধ, বিশেষ করে মায়েরা ভাবতেন, এই বই পড়া মানে ছেলের পড়াশোনা গোল্লায় যাওয়া। ফলে লুকিয়ে লুকিয়ে রানা পড়ার মধ্যে আরও বেশি উত্তেজনা কাজ করত।

টেবিলে পাঠ্যবই, বিশাল ডিকশনারি কিংবা টেস্ট পেপারটা হা করে খুলে রাখা হতো নিখুঁত শিল্ড হিসেবে। তার পেটের ভেতর সযতেœ গুঁজে রাখা থাকতো মাসুদ রানার ‘অগ্নিপুরুষ’ কিংবা ‘আই লাভ ইউ, ম্যান’। অভিভাবকের দৃষ্টিতে মনে হতো, ছেলে বুঝি জ্যামিতির উপপাদ্য শিখছে কিংবা রসায়নের সমীকরণ মেলাচ্ছে! অথচ তখন আমার চোখের সামনে রানা সাবমেরিন থেকে লাফ দিচ্ছে অশান্ত প্রশান্ত মহাসাগরে, কিংবা জুরিখের কোনো বরফঢাকা রাতে শত্রুঘাঁটি উড়িয়ে দিচ্ছে অসীম সাহসে।

যখনই মা চায়ের কাপ হাতে কিংবা পড়া ধরার জন্য ঘরে ঢুকতেন, চোখের পলকে/সেকেন্ডের ভগ্নাংশে রানা হাওয়া! বইয়ের মলাট বন্ধ। কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের ট্রেনিংটা সাউথ পয়েন্টে রানা নিজে কতটা নিখুঁতভাবে শিখেছিল জানা নেই, তবে আমাদের বুক ধড়ফড় করা কৈশোর তা রপ্ত করেছিল শতভাগ নিখুঁতভাবে।

৩. আজকের জেনারেশনের কিশোর-তরুণেরা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নেটফ্লিক্স-অ্যামাজন প্রাইমে স্ক্রল করে, হাই-ডেফিনিশন গ্রাফিক্সে মেতে থাকে ভিডিও গেমে। কিন্তু আমাদের জেনারেশনের ওটিটি, নেটফ্লিক্স ছিল কাজী আনোয়ার হোসেনের সস্তা দরের পেপারব্যাকগুলো। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে, রিকশায় না উঠে হেঁটে যাতায়াত করে টাকা জমিয়ে নীলক্ষেতের ফুটপাত কিংবা পাড়ার লাইব্রেরি থেকে একটা নতুন রানা হাতে পেয়ে মনে হতো পৃথিবীর সব রহস্য বুঝি ওই মলাটের নিচে বন্দি। নতুন বইয়ের পাতা ওল্টানোর মাদকতাময় নিউজপ্রিন্টের গন্ধটার কাছে আজকের কোনো ফোর-কে আল্ট্রা হাই-ডেফিনিশন স্ক্রিন পাত্তাই পাবে না। সেই বইগুলো, কেবল বই-ই ছিল না; ছিল মধ্যবিত্ত ঘরের চার দেয়াল ভেঙে গোটা পৃথিবী ঘুরে আসার পাসপোর্ট।

২০২২ সালে কাজীদা চিরতরে বিদায় নিলেন, তখনই আমাদের বুক প্রথম ভেঙেছিল। রানা সাহিত্যের মূল কারিগর, নেপথ্য জাদুকরের চলে যাওয়াটা ছিল একটা যুগের অবসান। তাও হৃদয়ে একটা সান্ত¡না ছিল যে, তার উত্তরসূরিরা লিখছেন, সেবা প্রকাশনী টিকে আছে, রানা বেঁচে আছে বুকস্টলের তাকে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশনীর স্থবিরতার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেবা কমিউনিটিগুলোর দিকে তাকালে হাহাকার অনুভূত হয়। আবার সেখানে গভীর বাঙালি আবেগের মেলবন্ধন দেখে বুকটা গর্ভে ভরে ওঠে। চুল পেকে যাওয়া পঞ্চাশোর্ধ্ব কোনো প্রবীণ এবং এই প্রজন্মের সদ্য গোঁফ ওঠা ভার্সিটি পড়ুয়া তরুণ; দুজনে এক লাইনে এসে দাঁড়িয়েছেন রানা তথা সেবা প্রকাশনীকে ভালোবেসে। সবার কণ্ঠে একই আকুলতা, রানা কি আর ফিরবে না? প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এই যে আবেগের অবিচ্ছিন্ন ধারা, এ থেকে বোঝা যায়, রানা কোনো সস্তা বিনোদন না, রানা হলো বাঙালির মজ্জাগত আবেগ।

৪. আজকের দিনে আমরা পেছন ফিরে তাকিয়ে সোহানা, কবীর চৌধুরী, রাহাত খান, কিংবা বিশ্বস্ত গিলটি মিয়াকে দেখলে, তাদের তো কেবল কাল্পনিক চরিত্র মনে হয় না। এরা আমাদের ফেলে আসা কৈশোরের এক একটা জীবন্ত ইমোশন, এক একটা চেনা ছায়া।

অন্যদিকে কাজী আনোয়ার হোসেন খুব সচেতনভাবে একটা কাজ করে গেছেন। তিনি রানার কোনো স্পেসিফিক, ধরাবাঁধা শারীরিক অবয়ব নিখুঁতভাবে এঁকে দেননি। কেন জানেন? যাতে ওই বইটা পড়ার সময় ঘরের আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলটা একটু ব্যাকব্রাশ করে নিয়ে কিশোর-যুবক বা যে কেউ নিজেই মনে মনে ‘এমআর-নাইন’ সেজে বসতে পারে।

৫. যারা আজ সেবা প্রকাশনীর বর্তমান সংকট দেখে বলছেন, মাসুদ রানা কি এখানেই শেষ? রানা কি তবে ইতিহাস হয়ে

গেল? তাদের সগর্বে বুক ফুলিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, রানা এত সহজে মরে না। সাড়ে চারশরও বেশি বইয়ের পাতায় রানা কতবার খাদের কিনার থেকে ফিরে এসেছে, কতবার নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে, প্লট সংকটে পড়েও আবার রাজকীয়ভাবে বাউন্স ব্যাক করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। আইনি ঝামেলা, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতা, চারপাশের নোংরামি কাটিয়ে সেবা প্রকাশনীকে ফিরতেই হবে। কারণ সেবা কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি আমাদের কল্পনাশক্তির বাতিঘর।

৬. পড়ালেখার ফাঁকে লুকিয়ে টেবিলের নিচে বই পড়া অবাধ্য ছেলেটা আজ হয়তো জীবনের তাগিদে করপোরেট অফিসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডেস্কে বসে কম্পিউটারের কি-বোর্ডে আঙুল চালাচ্ছে, কিংবা কোনো কারখানার ক্লান্তিকর শিফটে ঘাম ঝরাচ্ছে। কিন্তু তার মনের গভীর, গোপন কোণে এখনো রানা স্যুট-টাই পরে, ডানহাতে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল উঁচিয়ে অদম্য সাহসে দাঁড়িয়ে আছে। সেই ছেলেটি এখনো সুযোগ পেলে মাসুদ রানা হয়ে উঠতে চায়...