বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের কিছু পত্রিকা এখনো মানুষকে ভাবায় কাঁদায় হাসায়। সেই রকম একটা মানুষকে ভয় রহস্য চিন্তা ভাবনায়বুদ করে রাখে একটি নিউজপ্রিন্টের বই। প্রতি মাসের প্রথম দিকে হাতে পাওয়া এই রহস্যের ভান্ডারে ছিল চেনাজানা দাদি-নানির কাছে শোনা গল্প, ভয় উত্তেজনায় ভরা ঘটনার মতো গল্পে ঠাসা একটি নিউজপ্রিন্টের ম্যাগাজিন। বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরদের চোখে তখন অন্যরকম উচ্ছ্বাস দেখা যেত।
যে সময়টাতে টেলিভিশন ছিল সীমিত, ইন্টারনেট ছিল না, আর বিনোদনের বড় মাধ্যম ছিল বই, সেই সময় রহস্য পত্রিকা হয়ে উঠেছিল কিশোর-তরুণদের কল্পনার এক বিশাল জানালা। রহস্য, গোয়েন্দাগিরি, ভূতুড়ে গল্প, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, রোমাঞ্চ, অ্যাডভেঞ্চারÑ সবকিছুর এক অনন্য মিশেল ছিল এই পত্রিকা। অনেক পাঠকের কাছে রহস্য পত্রিকা শুধু একটি ম্যাগাজিন নয়; বরং মাসজুড়ে অপেক্ষা করার মতো এক আনন্দ। নতুন সংখ্যা হাতে পাওয়ার পর প্রথমে সূচিপত্র দেখে প্রিয় লেখকের গল্প খোঁজা, তারপর একে একে সব গল্প পড়ে শেষ করা এসব ছিল এক সময়ের চিরচেনা দৃশ্য।
বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘদিন ধরেই রহস্য ও গোয়েন্দা গল্পের জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু নিয়মিতভাবে শুধু রহস্য, রোমাঞ্চ ও কল্পবিজ্ঞানের গল্প নিয়ে প্রকাশিত পত্রিকা ছিল খুব কম। সেই শূন্যস্থান থেকেই রহস্য পত্রিকার উত্থান। পত্রিকাটি খুব দ্রুত কিশোর ও তরুণ পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ এখানে একইসঙ্গে পাওয়া যেত নানা স্বাদের গল্প। কোনো গল্প পাঠককে নিয়ে যেত অন্ধকার গলির অপরাধজগতে, কোনো গল্পে থাকত ভূতুড়ে বাড়ির আতঙ্ক, আবার কোনো গল্পে দেখা মিলত অজানা গ্রহ কিংবা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ভয়ংকর পরিণতি।
রহস্য পত্রিকার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর বৈচিত্র্য। এটি কখনো শুধু গোয়েন্দা গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং প্রতিটি সংখ্যায় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের গল্প স্থান পেত।
কখনো থাকত টান টান থ্রিলার, যেখানে একজন গোয়েন্দা খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করছে। কখনো থাকত অতিপ্রাকৃত গল্প, যেখানে পুরোনো জমিদারবাড়ির অন্ধকার করিডরে লুকিয়ে থাকে ভয়। আবার কখনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি পাঠককে নিয়ে যেত ভবিষ্যতের পৃথিবীতে। এই বৈচিত্র্যের কারণেই একই পরিবারের বিভিন্ন বয়সের পাঠকরাও রহস্য পত্রিকা পড়তে ভালোবাসতেন।
বাবা পড়ছেন গোয়েন্দা গল্প, ছেলে পড়ছে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, আর কেউ হয়তো মগ্ন হয়ে আছে ভূতের গল্পেÑ এমন দৃশ্য একসময় খুব পরিচিত ছিল।
কৈশোর মানেই কৌতূহল। অজানা কিছু জানার আকাক্সক্ষা, রহস্যের পেছনের সত্য খুঁজে বের করার উত্তেজনাÑ এসব অনুভূতির সঙ্গে রহস্য পত্রিকার গভীর সম্পর্ক ছিল।
পত্রিকার গল্পগুলো পাঠকদের শুধু বিনোদন দেয়নি, বরং ভাবতেও শিখিয়েছে। একটি ছোট সূত্র কীভাবে বড় রহস্যের সমাধান করতে পারে, যুক্তি দিয়ে কীভাবে অদ্ভুত ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়Ñ এসব বিষয় পাঠকদের বিশ্লেষণী চিন্তাভাবনায়ও প্রভাব ফেলেছিল।
অনেক পাঠক পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন, তাদের নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল রহস্য পত্রিকার মাধ্যমেই। কারণ গল্পগুলো ছিল সহজ ভাষায় লেখা, কিন্তু কাহিনি ছিল ভীষণ আকর্ষণীয়।
রহস্য পত্রিকা শুধু পাঠকদের জন্য নয়, লেখকদের জন্যও ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম। রহস্য পত্রিকা একসময় বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের নতুন ধারার লেখক তৈরিতে বড় ভূমিকা পালন করে।
বিশেষ করে রহস্য, থ্রিলার, গোয়েন্দা ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো ধারাগুলো জনপ্রিয় করতে এই পত্রিকার অবদান ছিল অসাধারণ।
রহস্য পত্রিকার জনপ্রিয়তার মূল কারণ ছিল এর সহজপাঠ্য ভাষা এবং গল্পের গতিময়তা। গল্পগুলো ছোট হলেও ভেতরে থাকত টান টান উত্তেজনা। ফলে পাঠক এক বসাতেই পুরো গল্প পড়ে ফেলতে চাইত।
আরেকটি বড় কারণ ছিল এর নিয়মিততা। অনেক স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিতে রহস্য পত্রিকার জন্য আলাদা চাহিদা ছিল। আজকের দিনে বিনোদনের মাধ্যম বদলে গেছে। মোবাইল ফোন, ওয়েব সিরিজ, ভিডিও গেম কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার ভিড়ে বই পড়ার অভ্যাস আগের মতো নেই। তবুও রহস্য পত্রিকার নাম শুনলে এখনো অসংখ্য মানুষের মনে নস্টালজিয়া জেগে ওঠে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন