সেই সত্তর দশক থেকে বাংলার একটা পত্রিকা কিশোরদের কল্পনার জগতে বুদ করে রেখেছে। স্কুল-কলেজ থেকে ফেরার পথে বইয়ের দোকান থেকে সেবা প্রকাশনীর বই কেনার একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল আশি-নব্বই দশকের ছাত্র-ছাত্রীদের। নিউজপেপারে অল্পদামে যে বই ও পত্রিকা বাংলার মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে সেটা সেবা প্রকাশনী এক মাত্র পেরেছিল। বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের ইতিহাসে সেবা প্রকাশনী এমন একটি নাম, যা উচ্চারণ করলেই অসংখ্য পাঠকের মনে ভেসে ওঠে এক টুকরো কৈশোর। সেই কৈশোরে ছিল স্কুল ব্যাগের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা বই, গভীর রাতে টেবিল ল্যাম্পের ক্ষীণ আলোয় চুপিচুপি পড়া রহস্য কাহিনি, বন্ধুদের সঙ্গে বই বদল করে পড়ার আনন্দ আর নতুন সিরিজের অপেক্ষায় বুকস্টলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার অদ্ভুত উত্তেজনা। একসময় বাংলাদেশের কিশোর-তরুণদের পাঠজগৎ মানেই ছিল সেবা প্রকাশনীর বই। এই প্রকাশনী শুধু বই প্রকাশ করেনি; বরং একটি প্রজন্মকে বই পড়ার আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। রহস্য, গোয়েন্দাগিরি, অ্যাডভেঞ্চার, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি কিংবা পশ্চিমের বন্দুকযুদ্ধ সব ধরনের গল্পের মধ্য দিয়ে সেবা প্রকাশনী তৈরি করেছিল কল্পনার এক বিশাল জগৎ। বিশেষ করে কুয়াশা, তিন গোয়েন্দা, অয়ন-জিমি, ওয়েস্টার্ন এবং অনুবাদ সিরিজ বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে আজও কিংবদন্তির মতো। প্রতিটি সিরিজের ছিল আলাদা স্বাদ, নিজস্ব চরিত্র এবং গল্প বলার ভিন্ন ভঙ্গি। আর সেই কারণেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বইগুলোর জনপ্রিয়তা অটুট থেকেছে।
শুধু তাই না আজকাল স্যোশাল মিডিয়াতে পুরোনো সেবা প্রকাশনীর বিভিন্ন বইয়ের মতামতের জন্য গড়ে উঠেছে ফেসবুকের গ্রুপ। সেখানে সেবার বিভিন্ন বই নিয়ে আলোচনা ও মতামত দিয়ে থাকেন অনেকে। এমনকি বিভিন্ন গল্পের চরিত্র সেই গল্প কোথায় গিয়ে ঠেকল তা নিয়ে অনেকে কৌতূহলবসত প্রশ্ন করেন আবার যারা বইটি পড়েছেন তারা সেটার উত্তর দেন। অনেকে এই পোস্ট ও পোস্টের কমেন্ট থেকে বইটি কিনে পড়েন। যদি বইটি না পাওয়া যায় তবে গ্রুপের মাধ্যমে আদান-প্রদান করে থাকেন। এভাবেই সেবা প্রকাশনীর বই কাল্ট ক্লাসিক হয়ে আছে আমাদের শৈশব জীবনে।
রহস্যের অন্ধকারে কুয়াশার আবির্ভাব
কুয়াশা সিরিজ ছিল এমন এক সিরিজ, যা কিশোর পাঠকদের মনে ভয়, উত্তেজনা আর রহস্যের এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করত। এই সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘কুয়াশা’ যেন ছায়ার ভেতর লুকিয়ে থাকা এক রহস্যমানব। তার পরিচয় পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। সে কোথা থেকে আসে, কীভাবে এত দক্ষ হয়ে উঠেছে কিংবা তার অতীত কীÑ এসব প্রশ্নের উত্তর পুরোপুরি পাওয়া যায় না। আর এই অপূর্ণতাই চরিত্রটিকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
কুয়াশার গল্পগুলোতে শহরের অন্ধকার দুনিয়া, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র, গোপন আস্তানা আর ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের উপস্থিতি পাঠককে টান টান উত্তেজনায় ধরে রাখত। প্রতিটি গল্পের শুরু হতো কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা দিয়ে। কখনো অপহরণ, কখনো খুন, কখনো অদ্ভুত নিখোঁজ রহস্য। এরপর ধীরে ধীরে গল্পের ভেতর প্রবেশ করত কুয়াশা। পাঠক কখনো বুঝতে পারত না, পরের পাতায় কী ঘটতে যাচ্ছে। এই অনিশ্চয়তাই ছিল সিরিজটির সবচেয়ে বড় শক্তি। কুয়াশা শুধু অপরাধীদের বিরুদ্ধে লড়াই করত না; সে যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। অনেক পাঠকের কাছে কুয়াশা ছিল একাকী নায়কের প্রতিচ্ছবি। যে নিজের পরিচয় প্রকাশ না করেও মানুষের জন্য লড়ে যায়।
তিন গোয়েন্দা
তিন গোয়েন্দা সিরিজ নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কিশোর সিরিজগুলোর একটি। এমন খুব কম পাঠক পাওয়া যাবে, যারা কৈশোরে অন্তত একটি ‘তিন গোয়েন্দা’ বই পড়েনি।
কিশোর পাশা, মুসা আমান এবং রবিন মিলফোর্ড এই তিন বন্ধুর অভিযানের গল্প একসময় কিশোরদের নেশায় পরিণত হয়েছিল। তাদের জাঙ্কইয়ার্ডের গোপন হেডকোয়ার্টার, রহস্য সমাধানের কৌশল আর বিপদের মুখেও সাহস হারিয়ে না ফেলার মানসিকতা পাঠকদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করত। এই সিরিজের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল এর বাস্তবতা। তিনজন কিশোর হয়েও তারা যুক্তি, পর্যবেক্ষণ আর সাহসের মাধ্যমে জটিল রহস্যের সমাধান করত। ফলে পাঠকের মনে হতো, ইচ্ছা করলে সেও হয়তো এমন গোয়েন্দা হতে পারে। গল্পগুলো সাধারণত খুব পরিচিত কোনো ঘটনা দিয়ে শুরু হতো। হয়তো কোনো পুরোনো বাড়িতে ভূতের গুজব, হারিয়ে যাওয়া কোনো মূল্যবান বস্তু কিংবা রহস্যময় একজন মানুষ। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ঘটনা জড়িয়ে যেত ভয়ংকর ষড়যন্ত্রে। কিশোরের বিশ্লেষণী ক্ষমতা, মুসার দুঃসাহস আর রবিনের প্রযুক্তিগত বুদ্ধিমত্তা একসঙ্গে গল্পকে নিয়ে যেত দুর্দান্ত গতিতে। এই সিরিজের জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ ছিল বন্ধুত্বের বন্ধন। তিনজনের সম্পর্ক এতটাই আন্তরিক ছিল যে পাঠক তাদের কেবল চরিত্র হিসেবে নয়, নিজের বন্ধুর মতো ভাবতে শুরু করত। বাংলাদেশের অসংখ্য পাঠকের বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে ‘তিন গোয়েন্দা’ পড়ে। অনেকেই স্বীকার করেন, এই সিরিজই তাদের প্রথম নিয়মিত বই পড়ার অনুপ্রেরণা।
অয়ন-জিমি
অয়ন-জিমি সিরিজ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হলেও এটি ছিল ভিন্ন স্বাদের অসাধারণ একটি সিরিজ। অয়ন ও জিমি দুই কৌতূহলী তরুণ, যারা অজানা বিষয় জানতে ভালোবাসে। তাদের গল্পে শুধু রহস্য নয়, বিজ্ঞানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কখনো তারা রহস্যময় গবেষণাগারে পৌঁছে যেত, কখনো বিপজ্জনক কোনো আবিষ্কারের সন্ধান পেত, আবার কখনো অদ্ভুত প্রযুক্তির মুখোমুখি হতো। ফলে গল্পগুলো শুধু রোমাঞ্চকরই ছিল না, কৌতূহলও জাগিয়ে তুলত। এই সিরিজের বড় শক্তি ছিল এর কল্পনাশক্তি। পাঠক মনে করত, পৃথিবীর কোথাও হয়তো সত্যিই এমন অদ্ভুত গবেষণা চলছে। ফলে গল্পের সঙ্গে বাস্তবতার এক সূক্ষ্ম সংযোগ তৈরি হতো। বিজ্ঞানভিত্তিক কিশোর গল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরিতে অয়ন-জিমি সিরিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
ওয়েস্টার্ন সিরিজ
ওয়েস্টার্ন সিরিজ বাংলা পাঠকদের নিয়ে গিয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে। সেই জগতে ছিল ধুলামাখা সীমান্ত শহর, ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ, সেলুনের দরজা, ভয়ংকর বন্দুকবাজ আর আইনহীন মরুভূমি। মজার বিষয় হলো ওয়েস্টার্ন সিরিজের গল্পগুলো পড়তে পড়তে মনে হতো যেন কোনো সিনেমা দেখা হচ্ছে। প্রতিশোধ, সাহস, বিশ্বাসঘাতকতা আর ন্যায়বিচারের লড়াই গল্পগুলোকে করে তুলত দারুণ আকর্ষণীয়। এই সিরিজের নায়করা সাধারণত নিখুঁত মানুষ ছিল না। তাদের জীবনে ছিল কষ্ট, ক্ষত আর অতীতের অন্ধকার। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস তাদের আলাদা করে তুলত। বাংলা সাহিত্যে এমন ভিন্ন আবহের গল্প খুব কম থাকায় ওয়েস্টার্ন সিরিজ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অনেক পাঠক প্রথমবারের মতো আমেরিকার ‘ওল্ড ওয়েস্ট’ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয় এই সিরিজের মাধ্যমে।
অনুবাদ সিরিজ
অনুবাদ সিরিজ বাংলা ভাষার পাঠকদের সামনে বিশ্বসাহিত্যের বিশাল ভান্ডার উন্মুক্ত করে দেয়। জুল ভার্ন, এইচ.জি. ওয়েলস, আলেকজান্ডার দ্যুমা কিংবা অন্য বিশ্বখ্যাত লেখকদের গল্প সহজ ভাষায় অনুবাদ করে কিশোর পাঠকদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সমুদ্র অভিযান, মহাকাশ ভ্রমণ, গুপ্তধনের অনুসন্ধান কিংবা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিÑসব ধরনের গল্প এই সিরিজে জায়গা পেয়েছিল। এই অনুবাদগুলো শুধু বিনোদন দেয়নি; বরং পাঠকের কল্পনাশক্তি ও জ্ঞানের পরিধিও বাড়িয়েছে।
অনেক পাঠক প্রথমবারের মতো বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে সেবা প্রকাশনীর অনুবাদের মাধ্যমে।

