মহাকাশের অসীম শূন্যতায় একটি ধ্রুবতারা পথহারা নাবিককে গন্তব্যের দিশা দেয়; পৃথিবীর জটিল গোলকধাঁধায় আমাদের অস্তিত্বের সেই ধ্রুবতারাটি হলেন মা। প্রবাদে আছে, ঈশ্বর সব জায়গায় সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেন না বলেই তিনি ধরণীতে মাকে পাঠিয়েছেন। মা শুধু জন্মধাত্রী নন, মা শব্দটি শুধু একটি সম্বোধন নয়; মা একটি প্রতিষ্ঠান, একটি পরম আশ্রয় এবং মা তিনিই, যিনি আমাদের প্রতিটি অর্জনের নেপথ্য কারিগর। আজ বিশ্ব মা দিবস; প্রতিটি নিশ্বাসে যাকে মনে রাখার কথা, আজ তাকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর একটি উপলক্ষ মাত্র। স্বপ্ন দেখা থেকে শুরু করে স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রেও যার অবদান সবচেয়ে বেশি, সেই মাকে জানাই মা দিবসের শুভেচ্ছা।
পৃথিবীর পাঠশালায় প্রথম শিক্ষক
সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো প্রতিটি মানুষের পেছনে থাকে একটি অদৃশ্য শক্তি। সেই শক্তির নাম মা। প্রতিটি মানুষের স্বপ্নের পথে যাত্রার প্রথম ধাপটি রচিত হয় মায়ের হাত ধরেই। পৃথিবীর পাঠশালায় মা-ই প্রথম শিক্ষক। ছোটোবেলায় মায়ের কাছে আমরা যখন অ আ ক খ শিখি, তখন আসলে কেবল বর্ণমালা শিখি না, শিখি জীবনবোধ। একজন মানুষ বড় হয়ে কতটা নীতিবান হবে, তা নির্ভর করে শৈশবে মায়ের দেওয়া নৈতিক শিক্ষার ওপর। থমাস আলভা এডিসন থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক বিশ্বের সফল উদ্যোক্তার কথাই বলি না কেন, সবার জীবনের বাঁকবদলের গল্পে দেখা যায় যখন পুরো পৃথিবী তাদের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়েছিল, তখন কেবল একজন মা-ই বলেছিলেন, তুমি পারবে। বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক বিজ্ঞানী থমাস আলভা এডিসনের কথা তো আমরা সবাই জানি। এডিসন তার স্কুল থেকে মেধাহীন বলে বিতাড়িত হলে তার মা ন্যান্সি এলিয়ট তাকে ঘরে পড়ানো শুরু করেন এবং তাকে বিশ্বাস করান যে তিনি বিশেষ প্রতিভার অধিকারী। পরবর্তী সময়ে এই মহান বিজ্ঞানী বলেছিলেন, ‘মা ছিলেন আমাকে গড়ার কারিগর। তিনি আমার ওপর এতটাই বিশ্বাসী ছিলেন যে আমার মনে হয়েছিল আমার বেঁচে থাকার একটি কারণ আছে। এমন একজন আছেন যাকে আমি হতাশ করতে পারি না।’
ত্যাগের মহিমায় স্বপ্নের জাল
একজন মায়ের কাছে নিজের ক্যারিয়ার বা শখের চেয়ে সন্তানের ছোট ছোট স্বপ্ন বড় হয়ে দাঁড়ায়। কত মা যে তার নিজের পছন্দের গানটি গাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন সন্তানের পড়ার শব্দ শুনবেন বলে, কিংবা নিজের ভ্রমণের শখ বিসর্জন দিয়েছেন সন্তানের পরীক্ষার কথা ভেবে, তার কোনো হিসাব নেই। এই নিঃস্বার্থ ত্যাগই একজন সন্তানকে দায়িত্বশীল হতে শেখায়। তরুণ প্রজন্মের কাছে সাফল্য মানে হয়তো এক নিমেষে খ্যাতি পাওয়া, কিন্তু এই সাফল্যের ভিত্তিপ্রস্তর যে মায়ের কতগুলো নির্ঘুম রাত এবং নীরব চোখের জলের বিনিময়ে অর্জিত তা অনেকেই অনুভব করে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলেন, ‘মা আমার কাছে দেবদূত। আমি যা হয়েছি কিংবা যা হতে চাই, সবকিছুর জন্যই আমার মায়ের কাছে কৃতজ্ঞ।’ লিঙ্কন তার মায়ের অভাববোধ থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন যে, বিনয় ও কঠোর পরিশ্রমই জীবনকে পূর্ণতা দেয়। মায়ের দেওয়া ত্যাগের মানসিকতা তাকে পরবর্তী সময়ে একটি জাতির সংকটকালে পথ দেখিয়েছিল।
অন্ধকারে পরম নির্ভরতা
সবাই জানে, বড় হওয়ার পথ মসৃণ নয়। জীবনের চড়াই-উতরাইয়ে যখন চারপাশ অন্ধকার মনে হয়, তখন মায়ের আঁচলই হয়ে ওঠে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। কেউ ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ঘরে ফিরলে মা তখন সমালোচকের ভূমিকায় না গিয়ে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়ান। জীবনের এই চড়াই-উতরাইয়ে আমরা যখন নিজেকে হারিয়ে ফেলি, তখন মা-ই সেই ব্যক্তি যিনি আমাদের আসল শক্তি চিনিয়ে দেন। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, ‘আমাকে একজন ভালো মা দাও, আমি তোমাদের একটি ভালো জাতি দেব।’ কারণ তিনি জানতেন, সন্তানের মানসিক শক্তি তৈরিতে মায়ের কোনো বিকল্প নেই। যখন সারা পৃথিবী হাত ছেড়ে দেয়, তখন মা-ই বলেনÑ ‘হার মানতে নেই, আবার শুরু করো।’ এই মানসিক সমর্থনই একজন মানুষকে শূন্য থেকে শিখরে নিয়ে যাওয়ার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
চিরস্থায়ী মেন্টর ও গাইড
মা কেবল আমাদের জন্মধাত্রী নন, তিনি আমাদের জীবনের প্রথম মেন্টর। একজন মানুষ যখন জীবনের জটিল সিদ্ধান্তগুলো নিতে হিমশিম খান, তখনো অবচেতন মনে তিনি মায়ের ছোটবেলায় শেখানো আদর্শগুলোর আশ্রয় নেন। মা শিখিয়েছেন কীভাবে সংকটে ধৈর্য ধরতে হয়, কীভাবে অন্যের প্রতি সহমর্মী হতে হয়। আজকাল আমরা সবাই নিজেদের নিয়ে প্রচ- ব্যস্ত। প্রযুক্তির যান্ত্রিকতায় আমরা মায়েদের থেকে হয়তো কিছুটা দূরে সরে গেছি। কিন্তু ব্যস্ততার মাঝেও যদি দিনের কিছুটা সময় মায়ের পাশে বসে কাটানো যায়, তার হাতটা ধরে একটু গল্প করা যায়, তবে সেই আনন্দের কাছে পৃথিবীর যাবতীয় ঐশ্বর্য তুচ্ছ হয়ে পড়ে।
অন্তহীন কৃতজ্ঞতার ঋণ
ভিত্তি যখন মা, তখন আকাশছোঁয়াও সহজ। সাফল্য মানে কেবল পদমর্যাদা বা অর্থবিত্ত নয়; বড় হওয়া মানে একজন ভালো মানুষ হওয়া। আর এই মানুষ গড়ার কারিগর হলেন মা। পৃথিবীর ইতিহাসে যত সফল ব্যক্তিত্ব আছেন, তাদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের মানসিক দৃঢ়তার মূলে ছিল মায়ের শিক্ষা। মায়ের হাত ধরে যে শিশুটি প্রথম হাঁটতে শেখে, সেই শিশুটিই একদিন পৃথিবীকে নতুন পথ দেখায়। একটি সমাজ তখনই উন্নত হয় যখন মায়েরা তাদের সন্তানদের সঠিক মূল্যবোধে বড় করেন। আজ মা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, মায়ের দেওয়া শিক্ষাকে লালন করা এবং তাদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলোকে আমাদের সাফল্যের মাধ্যমে সার্থক করে তোলা। মায়ের গুরুত্ব আমাদের জীবনে সীমাহীন, কারণ মা ছাড়া এই পৃথিবীর আলো দেখা যেমন অসম্ভব ছিল, তেমনি মায়ের আদর্শ ছাড়া সফল হওয়াও অকল্পনীয়। মায়ের ভালোবাসা কোনো সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না। এটি এমনই এক ঐশ্বরিক টান যা দূরত্ব কিংবা সময় দিয়ে মাপা যায় না। সবার জন্য মা হলেন সেই শীতল ছায়া, যা রোদে পুড়ে যাওয়া জীবনে এক পশলা বৃষ্টির মতো শান্তি নিয়ে আসে। পৃথিবীর প্রতিটি মায়ের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও অসীম কৃতজ্ঞতা। মা, তোমার ঋণ শোধ করার সাধ্য আমাদের নেই। শুধু প্রার্থনা করি, তুমি ভালো থেকো এই পৃথিবীর প্রতিটি স্পন্দনে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন