× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রিয়াজুল হক

প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৬, ০১:২৬ পিএম

আমার মা

না বলা ত্যাগের অনন্ত গল্প

রিয়াজুল হক

প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৬, ০১:২৬ পিএম

না বলা ত্যাগের অনন্ত গল্প

১.

আমি খাওয়া-দাওয়ার প্রতি সবসময় একটু খেয়ালী। মনের মতো খাবার না হলে খেতে পারি না। ছোট থাকতে চিংড়ি মাছটা খেতে খুব পছন্দ করতাম। হলুদ, পিঁয়াজ দিয়ে জ্বালানো চিংড়ি মাছ। সেই সময় বাসায় ফ্রিজ ছিল না। প্রতিদিন বাসায় বাজার করা হতো। সকালবেলা বাসায় প্রতিদিনের মেন্যু ছিল ভাত, আলুভর্তা আর ডিমভাজি। আমার ডিমভাজি খেতে ভালো লাগত না। এজন্য সকালে ভাত খেতে একটু দেরি করতাম। কখন বাসায় বাজার আসবে সেই অপেক্ষায় থাকতাম। কারণ প্রতিদিন চিংড়ি মাছ কেনা হতো। বাজার আসার সঙ্গে সঙ্গে মা বাজারের ব্যাগ থেকে কিছু চিংড়ি মাছ বেছে নিয়ে তেল, পিঁয়াজ, হলুদ দিয়ে আমার জন্য জ্বালিয়ে দিতেন। আমি যদি কিছু ভাত বেশি খেতে পারি, তাতেই যেন মায়ের শান্তি।

২.

আমার তিন ভাইয়ের মধ্যে আমি সবার বড়। মেজো ভাই (আমার চেয়ে বছর তিনেক ছোট) একবার  মাকে জিঞ্জাসা করেছিল, ‘মা! তুমি ভাইয়াকে বেশি ভালোবাসো, তাই না’ মা আমাকে পরে এই কথাটা বলেছিলেন। মা কথাটি শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমি জানি, আমার মেজো ভাই এই লেখাটা পড়বে আর একটু-আধটু লজ্জাও পাবে। কারণ সবার সামনে বলে ফেললাম। তবে মা আমাদের তিন ভাইয়ের প্রতিই অত্যন্ত যতœবান। সহায়সম্পদ বলতেই যেন আমরা তিন ভাই।

৩.

যখন স্কুলে পড়তাম, মা বইয়ের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিতেন। আমি যদি সেই বইয়ের উত্তরের সঙ্গে মিলিয়ে পড়া বলতে না পারতাম, তবে বিকেলে মাঠে যাওয়ার অনুমতি মিলত না। 

যখন মাঠে খেলতে যেতাম, সন্ধ্যা হয়ে গেলে খুলনার রেলওয়ে লোকো মাঠের কোনায় মাথায় কাপড় দিয়ে মা চলে যেতেন। সবাই বলতো, কাকি আসছে, চলে যা। তখন মায়ের ওপর একটু-আধটু রাগ হতো। আরেকটু পর এলে কি হতো আরেকটু বেশি খেলতে পারতাম।

মাকে যেতে বললেও যেতেন না। দাঁড়িয়ে থাকতেন। বকাবকি করতেন না। তবে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকলে অনেক সময় বলতেন, তোদের আব্বা বাসায় আসবে, তাড়াতাড়ি আয়। মায়ের পিছু পিছু বাসায় চলে যেতাম।

৪.

স্কুলে পড়াকালে, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা, সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা মোটামুটি বিদ্যুৎ থাকত না। আইপিএসের কথা সেই সময় চিন্তা করার সুযোগ ছিল না। চার্জারের ফ্যানও তখন বাজারে আসেনি। যাই হোক, সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে যদি ঘরের বাইরে যেতাম, মা কিছু বলতেন না। তবে যদি ঘরে পড়তে থাকতাম, তবে পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতেন। যত সময় পড়তাম, মায়ের হাতপাখা থামত না। কখনো মাথায় আসেনি, মায়ের কি হাত ব্যথা হয় না

আবার রাতে ঘুমের মধ্যেও বিদ্যুৎ চলে যেত। তবে সে সময়ও টের পেতাম না। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ হাতপাখা গায়ের সঙ্গে লেগে যেত। তখন বুঝতে পারতাম, মা বাতাস দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি না ঘুমিয়ে যে বাতাস দিচ্ছে, তার তো কষ্ট হচ্ছে, তখন এসব মাথায় আসেনি।

আমার এসএসসি, এইচএসসি, এমনকি বিবিএ, এমবিএ পরীক্ষার সময়ও মা রোজা রাখতেন। পরীক্ষার দিন সকালে দেখতাম, মা খাচ্ছেন না। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, রোজা আছে। বুঝে নিতাম, আমার পরীক্ষার জন্যই রোজা।  অন্য দুই ভাইয়ের বেলায়ও একই ঘটনা। আল্লাহর কাছে সব চাওয়া যেন আমাদের ঘিরেই।

৫.

একবার মায়ের শরীরে রক্ত স্বল্পতার কারণে হেমোফার আয়রন ইনজেকশন দিতে গেলাম। আমার এক কাজিনের চেম্বারে গিয়ে দিতে হবে। আমি মায়ের সঙ্গে ছিলাম। মায়ের হাতের শিরায় ইনজেকশন দেওয়া হলো। প্রতি মিনিটে ১২ ফোঁটা। বুঝলাম তিন ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে। ৩০ মিনিট পার হওয়ার পর মা বুঝতে পারলেন,  কৃত্রিমভাবে রক্ত বৃদ্ধির এই আয়রন ইনজেকশন শেষ হতে বেশ সময় লাগবে।

‘মা বললেন, চলে যা।’

‘আমি থাকি। সমস্যা নেই।’

মা বললেন, ‘আমার শেষ হলে আমি চলে যেতে পারব। তুই যা। একা একা বসে থেকে কি করবি’

আসলে রুমের মধ্যে ফ্যান চালালে মায়ের খুব ঠান্ডা লাগছিল। আমি বসে থাকলে গরমে আমার খুব কষ্ট হবে। আমাকে চলে যেতে বলার এটাও অন্যতম একটা কারণ ছিল।

মা আবার বললেন, ‘তুই বাসায় যা। আমি একটু ঘুমাই।’

‘তুমি ঘুমাও।’

আমি পাশে বসে মোবাইলে গেমস খেলছি।

তিন ঘণ্টা ধরে মায়ের হাতে হেমোফার আয়রন ইনজেকশন ছিল। আমি থাকলাম। মাকে নিয়ে বাসায় যাচ্ছি আর ভাবছিলাম, আমি অসুস্থ হলে মাকে যতই বলতাম, তিনি কি হাসপাতালে আমাকে রেখে বাসায় আসতে পারতেন

নিজে নিজেই উত্তর দিচ্ছিলাম,

‘কখনোই না।’

৬.

আমার মা কোনোদিন তার নিজের টাকাপয়সা নেই, সেই আফসোস কখনো করেননি। অথচ একজন মানুষ চাকরি করলে যত আয় করে, তার থেকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক বুনিয়াদ আমার মায়ের ছিল। আমাদের সবার আয় যেন আমার মায়ের।

আমার মা কোনোদিন বলেননি, তার নিজের নামে বাড়ি, জমি কিনতে হবে। অথচ সবখানেই ছিল তার হুকুম। যা বলেছেন, তাই হতো।

আমার মা কোনোদিন বলেননি, তার স্বাধীনতা লাগবে কারণ পরাধীনতার কথা তার মাথার মধ্যে কখনো আসেনি। তিনি যখন যেটা আমাদের বলেছেন, সেটাই হয়ে যেত।

আমার মা কোনোদিন বলেননি, তিনি মার্কেটে গেলে এটা-ওটা কিনতে পারতেন। আমার মায়ের ভিড়ের মধ্যে গিয়ে কখনো কিছু কেনার প্রয়োজনই হয়নি। বাজারে গিয়ে বাজারের ব্যাগ কখনো টানতে হয়নি। শুধু মুখ দিয়ে বললেই হয়েছে।

অথচ আমার মা দুনিয়ায় শুধু একজন মানুষকে মেনে চলেছেন। দুনিয়ার মাঝে আর কাউকে তার মানতে হয়নি। মৃত্যুর পরেও আব্বা অনেকবার বলেছেন, আমি তোদের মায়ের ওপর সন্তুষ্ট।

৭.

আমার মা ২০২৪-এর ১ মে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। আমাদের হাতের ওপর থেকেই আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন। আমার মা অত্যন্ত পরহেজগার মানুষ ছিলেন।

কতটা পর্দানশীন ছিলেন, এটা বোঝানো যাবে না। ফরজ ইবাদত তো অবশ্যই, সুন্নতের পাশাপাশি নফল ইবাদতও অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে পালন করতেন।

আমি যখন সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখন থেকেই মা প্রতিরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তেন। এটা মারা যাওয়ার আগের রাতেও বাদ যায়নি। এমনকি যে সকালে তিনি চলে গেলেন, সেই সকালে ফজরের নামাজও তিনি পড়েছেন।

মাত্র ৬১ বছর বয়সেই মা না-ফেরার দেশে চলে যান। ২০২৬-এর ১ মে, দুই বছর হলো, আমি ‘মা’ হারা।

কালো বোরকা, নেকাব পরা লম্বা, কিছুটা বয়স্ক কাউকে যদি রাস্তার পাশ ধরে মাথা নিচু করে হাঁটতে দেখি, মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। মনে হয়, মা বলে ডাক দেই, হাত ধরে রাস্তা পার করে দেই।

আপনার যদি উপলব্ধি ক্ষমতা থেকে থাকে, তা হলে বুঝতে পারবেনÑ এটা আপনার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আর যদি বুঝতে না পারেনÑ তা হলে আপনার মা আপনার কাছ থেকে হয়তো দুনিয়াতেও কিছু পাননি, কবরেও পাবেন না।

৮.

যাদের ঘরে মা আছে, তারা মায়ের হাত দুটো একদিন ধরে দেখবেন। কতটা অযতেœ বছরের পর বছর কেটে গেছে, মা হয়তো নিজেও জানে না। বিয়ের আগে যে মানুষ প্রতিদিন চুলে শ্যাম্পু করতেন, সে এখন বিশেষ কোনো দিন ছাড়া শ্যাম্পু করে সময় নষ্ট করার কথা ভাবতেই পারেন না। সবই তো আমাদের জন্য। ভালো করে একদিন তার মুখের দিকে তাকান। দেখবেন, সন্তানের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য অনেক  আকুতি লুকিয়ে আছে। শুধু বলতে পারেন না। যাদের বাবা-মা বেঁচে নেই, তাদের জন্য দোয়া করুন।

৯.

একটা পুরোনো ঘটনা বলি। রাত ১১টার দিকে রিকশায় করে বাসায় আসছিলাম। হঠাৎ অল্পবয়সি রিকশাওয়ালা ছেলেটার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ওই পাশ থেকে কে ফোন করেছিল, কিছুটা আন্দাজ করতে পারলাম। তবে ছেলেটার কথা ছিল ঠিক এই রকম, ‘আমার আব্বা আমার দাদা-দাদিরে খাওয়াইছে, পরাইছে। আমিও আমার আব্বারে-মায়েরে খাওয়াবো। আমার মা আমার দাদা-দাদিরে নিয়া থাকছে। আপনার মাইয়ারও শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়া থাকতে হবে। আপনার মাইয়া মানতে পারলে সংসার করুক, না পারলে না করুক।’

কথাটা বলে ফোনটা পকেটে রেখে দিল। যেন কিছুই হয়নি। রিকশা চলছে। মনে মনে ভাবলাম, একটা বাঘের বাচ্চা। বিরাট বিরাট শিক্ষিত হয়ে কয়জন ছেলে এইভাবে বলতে পারে ধন্য ওই রিকশাওয়ালার বাবা-মা। সন্তান মানুষ হওয়া বলতে হয়তো এটাই বোঝায়।

১০.

মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্ব মা দিবস। দিনটাতে অনেকেই মায়েদের কথা বলে থাকে। তবে আমাদের উচিত, শুধু দিবসের দিন নয়, প্রতিটা দিনই মায়েদের কথা বলা। যাদের মা বেঁচে আছেন, তাদের উচিত মায়ের সেবাযতœ করা। সন্তানদের কাছে থাকুক প্রতিটা মা। আর যাদের মা বেঁচে নেই, সন্তান হিসেবে প্রতিদিন তাদের জন্য দোয়া করুন।

লেখক : অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!