সিলেটের শাহজালাল উপশহর একসময় পরিচিত ছিল একটি সুপরিকল্পিত ও নিরিবিলি আবাসিক এলাকা হিসেবে। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলের চেহারা আমূল বদলে গেছে। উচ্চ ভাড়ার আশায় আবাসিক প্লটগুলোর সামনের দেয়াল ভেঙে গড়ে তোলা হচ্ছে দোকান, অফিস ও রেস্তোরাঁসহ নানা ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এতে শান্ত-নির্মল পরিবেশে বসবাসের প্রত্যাশা নিয়ে যারা এখানে ঘর তুলেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন অস্থির ও বিরক্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শহরের দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগে গাফিলতির ফল। প্রশাসনিক কাঠামোর অস্পষ্টতায় তৈরি হয়েছে এক প্রকার ‘আইনি শূন্যতা’, যার সুযোগ নিয়েই দিনে দিনে আবাসিক এলাকা রূপ নিচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক অঞ্চলে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপশহরের ‘এ’ ব্লকের ৪নং রোডে ৪০ নম্বর বাসার দেয়াল ভেঙে নির্মাণ করা হয়েছে অবৈধ ‘তাওসিফ মার্কেট’। এখানে ইতোমধ্যেই চলছে ‘নিরিবিলি খাবার হোটেল’-এর ব্যবসা। এ ছাড়াও উপশহরের প্রতিটি ব্লক এবং রোডে দোকান, অফিস ও রেস্তোরাঁসহ নানা ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগÑ বাড়িটির নতুন মালিক মো. ফরহাদ আহমেদ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই নকশা পরিবর্তন করে তড়িঘড়ি করে মার্কেট নির্মাণ করেছেন। এলাকাবাসী আপত্তি জানালেও তিনি কোনো কর্ণপাত করেননি; বরং প্রভাবশালী মহলের মদদে দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করেন।
মার্কেটের দোকান ও রেস্তোরাঁয় সারাদিন ভিড়, আড্ডা, শব্দের কারণে পাশের ‘বায়তুল ফালাহ জামে মসজিদে’ নামাজ পড়তে আসা মুসুল্লিরা নানাভাবে বিরক্ত হচ্ছেন। মসজিদ কমিটির সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. ঝুনু চৌধুরী বলেন, ‘হাউজিং এলাকায় নকশা পরিবর্তন করে দোকানপাট নির্মাণের কোনো নিয়ম নেই। আমরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
সরকার ২০২৩ সালে ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিউক)’ গঠন করলেও এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়িত হয়নি। অপরদিকে, সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) স্থানীয়ভাবে ট্রেড লাইসেন্স প্রদান অব্যাহত রেখেছে। এমনকি সেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে আবাসিক এলাকাতেই। সিউকের আইন অনুযায়ী, তাদের পরিকল্পনার বাইরে কোনো ধরনের নির্মাণ বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম অনুমোদনযোগ্য নয়। তবে বাস্তবে এই দুই সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এক ধরনের প্রশাসনিক অচলাবস্থার জন্ম দিয়েছে।
উপশহরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনের পর দিন দোকানপাট বাড়ছে, যানজট বেড়েছে, পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। রাস্তার ওপর অবৈধভাবে গাড়ি পার্ক করায় চলাচলে বিঘœ ঘটছে। যানবাহনের শব্দ ও ধোঁয়ায় দূষণ মাত্রাও বেড়েছে মারাত্মকভাবে। শব্দদূষণের মাত্রা অনেক সময় ১১০ ডেসিবল ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত সীমার দ্বিগুণেরও বেশি।
এদিকে অপরিকল্পিত নির্মাণ ও অতিরিক্ত পয়ঃবর্জ্যে ভেঙে পড়ছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ফল হিসেবে প্রতি বছর বর্ষায় তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পেছনে থাকা জমির ভরাট ও কংক্রিটে মোড়ানো এলাকাগুলো বৃষ্টির পানি শোষণ করতে পারছে না, বরং পানি জমিয়ে রাখছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রূপান্তর কেবল একটি আইনি লঙ্ঘন নয়, বরং এর ফল আরও ভয়াবহ। আবাসিক এলাকা বাণিজ্যিক হয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে আর্থ-সামাজিক পরিবেশের পরিবর্তন, নিরাপত্তার ঘাটতি এবং জীবনমানের অবনমন। দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী অনেক বাসিন্দা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ হারিয়ে ইতিমধ্যেই অন্যত্র চলে গেছেন বা যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
এসব সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে সিউক গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২২ সালে। সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকা ও এর আশপাশকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের আওতায় আনতে, পর্যটনসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোকে আধুনিক অবকাঠামোসহ গড়ে তুলতে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে এই কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। ২০২২ সালের ২২ আগস্ট মন্ত্রিসভা ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০২২’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হয় ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০২৩’।
সরকারের পক্ষ থেকে গঠিত সিউক এখনো পর্যন্ত উপশহরের এই রূপান্তর রোধে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ আইন অনুযায়ী, তাদেরই দায়িত্ব ছিল মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ এবং বিধিবহির্ভূত স্থাপনা উচ্ছেদ করা। অপরদিকে, সিসিকও দায় নিতে নারাজ। তারা বলছে, ট্রেড লাইসেন্স প্রদান তাদের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজের অংশ এবং এতে আইনি বাধা নেই।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছেÑ এই দ্বৈত প্রশাসনের মাঝে প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কে? কার হাতে রয়েছে নগর উন্নয়নের চূড়ান্ত দায়িত্ব? এবং কেন একটি সুপরিকল্পিত আবাসিক এলাকা রক্ষায় কেউই কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না?
ঢাকায় রাজউকের আওতায় গুলশান, বনানী কিংবা উত্তরা এলাকায় ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যেভাবে কঠোর নিয়ম, শর্ত ও মোটা অঙ্কের রূপান্তর ফি আরোপ করা হয়, সিলেট সিউক চাইলে সে রকম একটি মডেল বাস্তবায়ন করতে পারে। রাজউকের ক্ষেত্রে প্রতি কাঠা জমির জন্য রূপান্তর ফি ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ধার্য করা হয় এবং ২১টি কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়। এই নীতিমালার অনুকরণে সিলেটেও একটি স্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রিত এবং জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে।
এদিকে উপশহরের দীর্ঘদিনের বাসিন্দারা এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই লিখিত অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। তবুও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসছে না। দিন দিন আরও নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠছে, ভরাট হচ্ছে ফাঁকা জায়গা, বাড়ছে ভোগান্তি।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নগর পরিকল্পনাবিদ বলেছেন, ‘নগর ব্যবস্থাপনায় যদি আইনের প্রয়োগ ও সংস্থাগুলোর সমন্বয় না থাকে, তবে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। উপশহরের এই পরিস্থিতি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।’
সব মিলিয়ে বলা যায়, সিলেট উপশহরের বর্তমান চেহারা নগর শাসনের ব্যর্থতার জীবন্ত দলিল। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে শহরের এই পরিকল্পিত অঞ্চল হারিয়ে যাবে এক চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে। আর তার মাশুল গুনতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
এ বিষয়ে জানতে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকারকে ফোন দিলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. আলী আকবর বলেন, ‘আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোর বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিটি করপোরেশন এলাকার উন্নয়ন ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে থাকে, তাই অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মো. সাদি উর রহিম জাদিদ বলেন, ‘নতুন যোগদান করেছি। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, সিলেট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নিজামুল হক মজুমদার বলেন, ‘অবৈধ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আমরা অবগত। নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন