রাষ্ট্রের প্রধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হলো পুলিশ। বাহিনীটির প্রধান দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন ও নাগরিকদের সেবা প্রদান। কিন্তু এই পুলিশকে জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর মতো ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
অভিযোগে জানা গেছে, সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে ব্যবহার করেছেন নিজের মতো করে। বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার হরণে, প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখাতে ও শাসাতে এবং সরকারি আদেশপত্র ছাড়া দেশত্যাগের মতো কাজে পুলিশকে ব্যবহারের অভিযোগ এসেছে তার বিরুদ্ধে।
দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানি, সংযোজন এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের স্বার্থে বিতর্কিত কিছু বিষয় রেখে গত অক্টোবরে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্ট্রার (এনইআইআর)’ চালুর ঘোষণা দেন ফয়েজ তৈয়্যব। এই ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য পক্ষ এবং অংশীজনদের সঙ্গে কোনোরূপ আলোচনা না করেই হুট করে গত বছর ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর চালুর ঘোষণা দেন তিনি। এরপর কয়েক দফায় সরকার এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ ব্যর্থ হলে মোবাইল ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন ‘মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি অব বাংলাদেশ (এমবিসিবি)’ সংবাদ সম্মেলনের ডাক দেয়। গত ১৯ নভেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলন বানচাল করতে প্রযুক্তিবিষয়ক সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেল এবং এমবিসিবি’র সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ পিয়াসকে গভীর রাতে তুলে নিয়ে যায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা ডিবি।
কোনো পক্ষের কোনো লিখিত অভিযোগ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং কারণ প্রদর্শন ছাড়াই গভীর রাতে বাসা থেকে ওই দুজনকে নিয়ে যায় ডিবি। সে সময় সোহেল ও পিয়াস অভিযোগ করেন, ‘সিন্ডিকেট’-এর তাগিদে সংবাদ সম্মেলন বানচাল করতে ডিবি দিয়ে আটক করা হয় তাদের। ডিবিকে দিয়ে এই কাজ করানোর মূল মাস্টারমাইন্ড ছিলেন ফয়েজ।
পরিচয় গোপনের শর্তে, ডিবি পুলিশের একটি সূত্র রূপালী বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেন যে, ফয়েজের ইচ্ছাতেই ‘ওপর মহল’-এর নির্দেশে সাংবাদিক মিজান ও ব্যবসায়ী পিয়াসকে আটক করা হয়। আটককৃতদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ দায়ের করতে না পারা এবং সংবাদ সম্মেলনের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পিয়াসকে আটক রাখার মধ্য দিয়ে এই অভিযোগ আরও ঘনীভূত হয়।
নিজের স্বার্থ হাসিলে ফয়েজ কর্তৃক পুলিশ ব্যবহৃত হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আটকের দুঃস্বপ্ন স্মরণ করে সাংবাদিক সোহেল বলেন, ‘ফয়েজ তৈয়্যব একজন নীরব ঘাতকের মতো আচরণ করেন। তার সঙ্গে কথা বললে মনে হতে পারে তিনি অত্যন্ত সৎ, জ্ঞানী ও ভদ্র মানুষ। কিন্তু বাস্তবে কারো প্রতি বিরূপ হলে তিনি ডিবি বা সিআইডির মতো সংস্থাকে ব্যবহার করে তাকে হয়রানির মুখে ফেলতে দ্বিধা করেন না। ডিবি আমাকে তুলে নেওয়ার পর প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছিল যে, ভুল বোঝাবুঝির কারণে এই ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু গভীর রাতে হঠাৎ করে আমাকে তড়িঘড়ি তুলে নেওয়ার পেছনে যে ফয়েজের চাপ কাজ করেছে, তা বুঝতে বিশেষ বুদ্ধির প্রয়োজন পড়ে না। বাস্তবতা হলো, ব্যক্তিগত স্বার্থে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে লাঠিয়াল বাহিনীর মতো ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
ফয়েজের আক্রোশ থেকে নিস্তার পাননি তারই অধীনস্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের কর্মকর্তারা। বিভাগের একটি প্রকল্পের তিন কর্মকর্তাকে মানসিক হয়রানির পাশাপাশি শাসানো হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি দিয়ে। ফয়েজের সন্দেহ ছিল, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কর্মরত প্রবাসী এক বাংলাদেশি সাংবাদিককে ফয়েজের ব্যক্তিগত পাসপোর্টের (নেদারল্যান্ডসের) তথ্য দিয়েছিলেন ওই কর্মকর্তারা। স্রেফ সন্দেহের কারণে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই হেনস্তা করা হয় তাদের।
ভুক্তভোগীদের একজন পরিচয় গোপনের শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে দুর্বিষহ সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘গত সেপ্টেম্বরে এক সহকর্মীকে ফোন করে অশ্রাব্য ভাষায় আমাদের তিনজনকে তার (ফয়েজ) বাসায় ডাকেন। তার (সরকারি) বাসায় গেলে প্রথমে বাইরে এবং পরে বাসার সীমানার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখেন।
অভিযোগ- আমরা নাকি ওই সাংবাদিককে তথ্য দিয়েছি, যা সম্পূর্ণ অসত্য। একসময় সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হন, বাইরে দাঁড়িয়ে চেঁচামেচির আওয়াজ শুনছিলাম। এমনকি আমাদের থানায় পাঠানোর কথাও উঠেছিল।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘পরে জানানো হয় আমাদের মোবাইল ও ল্যাপটপ সিআইডি দ্বারা ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে। আইসিটি ভবনে ফিরে যাই। সিআইডি এসে আমাদের (সরকারি কাজে ব্যবহৃত) ডিভাইস নিয়ে যায়। প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য তন্নতন্ন করে পরীক্ষা করে। ১৫ থেকে ২০ দিন বিশ্লেষণের পর সিআইডি নিশ্চিত হয়, অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। আমরা কোনো তথ্য ফাঁস করিনি। কিন্তু এত বড় অপমান ও মানসিক নির্যাতনের পরও কোনো দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি। বরং আমাদের চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে। আল্লাহর রহমত ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টায় সেটি সম্ভব হয়নি। ব্যক্তিগত তথ্য ও নিরাপত্তা আইনের কথা বলে যিনি সোচ্চার, তিনিই তো সেই আইন লঙ্ঘন করলেন। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে কেউ যা খুশি তাই করতে পারবে আর সাধারণ মানুষ চুপ করে সহ্য করবে?’
ফয়েজের বিরুদ্ধে পুলিশের বিশেষ শাখাকেও (এসবি) ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি একপ্রকার গোপনে ফয়েজকে বাংলাদেশ ত্যাগে সাহায্য করার অভিযোগ উঠেছে এসবির শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
বিমানবন্দর ও যাত্রী পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা সূত্র ফয়েজের দেশত্যাগের ঘটনাটি তুলে ধরে গণমাধ্যমকে জানান, ‘ফয়েজ তৈয়্যবের কাছে কূটনৈতিক পাসপোর্টের পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত পাসপোর্ট ছিল, যেটা নেদারল্যান্ডসের। প্রথমে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার চেষ্টা করলে তার কাছে সরকারি আদেশ (জিও) দেখতে চাওয়া হয়। কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে এটা লাগবেই। পরে জিও দেখাতে ব্যর্থ হলে তিনি বিদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করেই দেশ ছাড়েন। তাকে এই ক্লিয়ারেন্স দিতে ঊর্ধ্বতন মহল থেকে বলা হয়।’
দেশের তিনটি বৃহৎ ডিজিটাল সিস্টেমের ‘সোর্সকোড’ নিজের ঘনিষ্ঠ থাইল্যান্ডপ্রবাসী আইটি ব্যবসায়ী সজল আহামেদকে তুলে দেন ফয়েজ। ডিজিটাল সিস্টেমগুলোর ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের আইটি উদ্যোক্তারা এর প্রতিবাদ করলে তাদেরও সিআইডির ভয় দেখান তিনি। তার কথামতো মেধাসম্পদ ‘সোর্সকোড’ সজলকে না দিলে অফিসে সিআইডি দিয়ে অভিযান করে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ডিভাইস জব্দের হুমকি দিয়েছিলেন ফয়েজ। ভুক্তভোগী এক আইটি উদ্যোক্তা রূপালী বাংলাদেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
এই মুহূর্তে বিদেশে অবস্থান করায় এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফয়েজ তৈয়্যবের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যায়নি। তবে তার ই-মেইলে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়। প্রশ্ন পাঠানোর ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে জানান, পুলিশ বাহিনী একটি আইনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। তবে অতীতে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীনরা সব সময় পুলিশকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা চেয়েছি অন্তত পুলিশ কারো লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার হবে না।
এ ছাড়া আইনের মধ্য থেকে সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার বাইরে কাউকে তুলে আনার কাজ পুলিশ করতে পারেনি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আটক, গ্রেপ্তার বা জ্ঞিাসাবাদের জন্য ডাকতে পারে। সাবেক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়বের বিরুদ্ধে পুলিশকে ব্যবহার করে কাউকে তুলে আনার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। তখন আইজিপি ছিলেন বাহারুল আলম। ওই সময় আইজিপিকে জানিয়ে উনি ওই কাজ করেছেন কি না সেটা জানতে হবে। বর্তমানে পুলিশের কারো লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন