জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেতে সরকারি ও বিরোধী শিবিরের প্রার্থীদের তৎপরতা তুঙ্গে। এ ক্ষেত্রে ভিন্ন পথে হাঁটছে জামায়াত। দলটির শীর্ষ নেতাদের মতে, পরিবারতন্ত্র নয়, বরং যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। নেতৃত্ব, যোগ্যতা এবং তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলেও জানা যায়। দলটির সংসদ সদস্যদের (এমপি) স্ত্রী-কন্যা বা পরিবারের কেউ সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাবেন না বলেও নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে যারা সংসদ সদস্য হতে পারেননি, তাদের স্ত্রী-কন্যাকে বিবেচনা করা হতে পারে বলেও জানা গেছে।
জামায়াতের এক শীর্ষ নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতে ইসলামীর নারী প্রার্থী চূড়ান্ত। জামায়াত মনোনয়ন ফরম তাদেরকেই প্রদান করবে। এ ক্ষেত্রে দলের সংসদ সদস্যদের স্ত্রী-কন্যা বা পরিবারের কেউ সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাবেন না। আগামী ১২ মে এই নির্বাচন হবে। জামায়াত জোট পাবে ১৩টি আসন। এর মধ্যে এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ জোটের অন্য শরিকেরা কত আসন পাবে, সেটা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে জোটে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে এনসিপিকে ১টি আসন দেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানা যায়। জামায়াত মূলত জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন নিয়ে দলীয় প্রস্তুতি শুরু করে। মার্চ মাসজুড়ে প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করে তারা। দলের মহিলা বিভাগের কাছ থেকে একটি তালিকা নেওয়া হয়। এ ছাড়া কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সব স্তরে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ করা হয়।
জামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসনের বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের পরিচালক মোবারক হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, একজন নারী সংসদে গিয়ে নারীদের পক্ষে, জাতির পক্ষে কথা বলতে পারবে, এমন প্রার্থী দেবে জামায়াত। ক্রিকেট বোর্ডের মতো প্রার্থী দেবে না জামায়াত। পরিবারতন্ত্র নয়; জামায়াত প্রাধান্য দিচ্ছে যোগ্যতাকে। তিনি বলেন, জামায়াতে যারা এমপি হয়েছেন, তারা বিভিন্ন পরিক্রমায় জামায়াতের নেতৃত্বে এসেছেন। তাদের ওপর আস্থা আছে, তারা সমাজে কোনো প্রকার অসংগতির সঙ্গে জড়িত হবেন না।
মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে দলীয় সূত্রে জানা যায়, মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের মধ্য থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। তবে জামায়াতের যেসব নেতা, যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের পরিবারের কোনো সদস্য মনোনয়ন পাবেন না। এক পরিবার থেকে দুজন সংসদ সদস্য হতে পারবেন না। সম্ভাব্য নারী প্রার্থীদের তালিকায় কিছুটা সংযোজন-বিয়োজন হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সে জন্য আগেভাগেই তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, যারা সংসদ সদস্য হয়েছেন তাদের পরিবারের কেউই সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাবেন না।
দলটির একাধিক সূত্র মতে, একই পরিবার থেকে দুজনকে বিবেচনা করা না হলেও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে যারা এবার সংসদ সদস্য হতে পারেননি, তাদের স্ত্রী-কন্যাকে সংরক্ষিত আসনে বিবেচনা করা হতে পারে। এদিকে মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের মধ্য থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে। তবে জামায়াতের যেসব কেন্দ্রীয় নেতা এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের পরিবারের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। এর মানে হলো, এক পরিবার থেকে দুজন সংসদ সদস্য হতে পারবেন না। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নেসা সিদ্দীকা ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মারদিয়া মমতাজের নাম আলোচনায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দের স্ত্রী আইনজীবী সাবিকুন্নাহার মুন্নীও প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় রয়েছেন।
এদিকে, ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি জোট এই ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয় পেয়েছে। আইন অনুযায়ী আসনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন হবে এবারও। প্রতি ছয়টি আসনের জন্য একটি করে সংরক্ষিত নারী আসন নির্ধারিত থাকায় অন্তত ৩৫টি সংরক্ষিত আসন পাবে বিএনপি জোট। বাকি তিনটি আসনের ভোট ও ফলাফল চূড়ান্ত হলে বাড়তি আরও একটি আসন পেতে পারে। এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীও জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। দলটি এককভাবে ৬৮টি আসন, এনসিপি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস পেয়েছে একটি আসন। সেই হিসাবে জামায়াতে ইসলামী জোট ৭৭টি আসনের বিপরীতে ১২ থেকে ১৩টি আসন পেতে পারে। জামায়াতের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, জোটের ১৩টি আসনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বণ্টন কী হবে, সে বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট আলোচনা করা হয়নি। তবে জোটের যারা সংসদে আছে, যে দলের যেটুকু প্রাপ্য, সেটা নিশ্চিত করা হবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে জামায়াতের ১২টি ও এনসিপির ১টি আলোচনায় রয়েছে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন জামায়াতের আমির।
যে যোগ্যতায় মনোনয়ন দিচ্ছে জামায়াত : সংরক্ষিত আসনের জন্য তৃণমূল পর্যন্ত মতামত নেওয়া হয়েছে। মহিলা বিভাগ থেকে একটা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন মানদ- বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল, শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকাকেন্দ্রিক প্রতিনিধিত্বের কথা চিন্তায় রয়েছে। সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম, এমন যোগ্য প্রার্থীদের বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দল পরিচালনার যোগ্যতা, দলীয় পদকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে সততা, অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি দলের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন; যোগ্যতার সঙ্গে আইন প্রণয়ন ও জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সংরক্ষিত আসনের জন্য মহিলা বিভাগ থেকে একটি তালিকা জামায়াতের প্রচার বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সেই তালিকায় শিক্ষক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মহিলা বিভাগ থেকে ১২ জনের একটি তালিকা জামায়াতের প্রচার বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলেও জানা গেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন