সকাল পৌনে ৯টা। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে জুরাইন রেললাইনে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করছিলেন ত্রিশোর্ধ্ব সাখাওয়াত হোসেন। গন্তব্য গুলিস্তান। সময়মতো পৌঁছানোর চাপে স্টপেজে আনন্দ পরিবহনের একটি বাস আসতেই হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়েন তিনিসহ বেশ কয়েকজন যাত্রী। বাসে সিট না পেয়ে রড ধরে দাঁড়িয়েছিলেন তারা। এরই মধ্যে ভাড়া নিতে আসেন কন্ডাক্টর। অন্যদিনের মতো সাখাওয়াত হোসেন গুলিস্তানের ভাড়া ১০ টাকা দিতেই কন্ডাক্টর টাকাটা ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, আরও ৫ টাকা। কিসের জন্য ৫ টাকা? প্রশ্ন করতেই কন্ডাক্টরের সঙ্গে শুরু হয় বাগবিত-া। যাত্রীরা বলছেন, ভাড়া বাড়েনি, ১০ টাকাই নিতে হবে। অন্যদিকে কন্ডাক্টরের দাবি, তেলের দাম বেড়েছে। ভাড়া ১৫ টাকা দিতে হবে। ওই বাগবিত-া একপর্যায়ে হাতাহাতিতে পৌঁছায়।
এমন পরিস্থিতি গত সোমবার থেকেই পরিলক্ষিত হচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপরিবহনে। জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ার পর সরকার পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত দেয়নি। কিন্তু তর সইছে না যেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের। তারা ঘোষণা আসার আগেই দূরত্বভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি ভাড়া দাবি করছেন। আর এ নিয়ে প্রতিনিয়ত যাত্রীদের সঙ্গে গণপরিবহন শ্রমিকদের বাগবিত-াসহ সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বাসের ভাড়া না বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। মঙ্গলবার সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলমের সই করা এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সরকারের পক্ষ থেকে বাস ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বর্তমান ভাড়ার চেয়ে বেশি না নেওয়ার জন্য সকল পরিবহন মালিককে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এতে আরও বলা হয়, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বৃদ্ধি এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ (মেনটেইনেন্স) খরচের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুততম সময়ে ভাড়া সমন্বয় করার জন্য সরকারের প্রতি বিশেষ আহ্বান ও দাবি জানানো হচ্ছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধান ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই রাজধানীর বিভিন্ন রুটে বৃদ্ধি করা হয়েছে বাস ভাড়া। তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির সেই চাপ গিয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের কাঁধে; যেখানে প্রতিদিনের যাতায়াতই হয়ে উঠছে বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ। সেখানে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বাড়তি ভাড়ার খড়গ। হেলপার-চালকরা বলছেন, জ্বালানি তেল বাড়তি দামে কিনছেন এ কারণেই ভাড়া বাড়িয়েছেন। তবে যাত্রীদের অভিযোগ, গণপরিবহনগুলো ঘোষণার আগেই যাত্রীদের জিম্মি করে নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছেন পরিবহন শ্রমিকরা।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। ব্যস্ত বা দূরপাল্লার রুটে এই বাড়তি ভাড়ার পরিমাণ আরও বেশি, কোথাও কোথাও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে অনেক ক্ষেত্রে চালক ও হেলপারদের সঙ্গে বাগবিত-ার ঘটনা ঘটছে, এমনকি কোথাও কোথাও যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে শাহবাগ রুটে আগে ২০ টাকা ভাড়া থাকলেও এখন ২৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। সায়েদাবাদ থেকে ফার্মগেট রুটে ভাড়া ২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, পল্টন ও শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকার যাত্রীদের কাছ থেকে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের মতে, কোনো সরকারি নির্দেশনা ছাড়াই এভাবে ভাড়া বাড়ানোয় দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয় বেড়ে গেছে, অথচ আয় বাড়েনি।
আন্তঃজেলা পরিবহনেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঢাকা-মৌলভীবাজার রুটে আগে যেখানে ভাড়া ছিল ৫৭০ টাকা, তা এখন বেড়ে ৬২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও সিলেটগামী বাসগুলোতেও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আনন্দ পরিবহনের যাত্রী সাখাওয়াতসহ অন্য যাত্রীরা জানান, তারা জুরাইন থেকে গুলিস্তানে প্রতিদিন ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করেন। সেখানে এখন তাদের দিতে হচ্ছে ১৫ টাকা, যা একেবারেই অযৌক্তিক।
সদরঘাট-মহাখালী-আব্দুল্লাহপুর রুটে চলাচলকারী আজমেরী পরিবহনে গুলিস্তান থেকে মহাখালী ২৫ টাকার ভাড়া এখন নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা। ওই বাসের যাত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে বাড়ানো হয়েছে ভাড়া। দ্রুত নতুন ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে সরকারকে। গাবতলী-যাত্রাবাড়ী রুটের যাত্রী মো. মাহবুব অভিযোগ করে বলেন, আগে ১৫ টাকা ভাড়া দিতাম, আজ ২৫ টাকা দিতে হয়েছে। এটি একেবারেই অযৌক্তিক।
আজিমপুর থেকে টেকনিক্যালগামী মেট্রো পরিবহনের যাত্রী আজিজুল হক জানান, আগে আজিমপুর থেকে মিরপুর-১-এর ভাড়া ছিল ২৫ টাকা, সেখানে আজ ৩৫ টাকা নেওয়া হয়েছে। সরকার বাসভাড়া নির্ধারণ না করলেও পরিবহন শ্রমিকরা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাড়া বাড়িয়ে আমাদের পকেট কাটছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ওই বাসের কন্ডাক্টর আনিসুর বললেন, দুদিন আগে তেলের দাম বেড়েছে, তাই ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। লোকসান দিয়ে তো গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। তবে সরকারিভাবে ভাড়া নির্ধারণের আগেই কেন বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে- এ প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি। এদিকে একই কারণ দেখিয়ে শিকড় পরিবহনের কন্ডাক্টর মাসুম দাবি করেন, গত দুদিন লোকসান দিয়ে গাড়ি চালিয়েছেন। তাই বাধ্য হয়ে ভাড়া ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, সব ঠিক থাকলে মহানগর ও দূরপাল্লা উভয় ক্ষেত্রেই কিলোমিটারপ্রতি ২২ পয়সা ভাড়া বাড়তে পারে। সে অনুযায়ী মহানগর এলাকায় বর্তমান ভাড়া দুই টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বেড়ে দুই টাকা ৬৭ পয়সা এবং দূরপাল্লায় দুই টাকা ১২ পয়সা থেকে বেড়ে দুই টাকা ৩৪ পয়সা নির্ধারণ হতে পারে।
পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, এখনো ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি। সরকারের সঙ্গে কথা চলছে, দ্রুত বিষয়টির সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়া ভাড়া বাড়ানো সম্পূর্ণ অনিয়ম। এটি যাত্রীদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ। প্রশাসনের উচিত দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া।
ঈরিবহন-সংশ্লিষ্টদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং যন্ত্রাংশের দাম বাড়ায় পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে নির্ধারিত ভাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে আর বাস্তবসম্মত নয়। সে সময় দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ দশমিক ২০ টাকা এবং মহানগরে ২ দশমিক ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা এখন সমন্বয় করা প্রয়োজন। অন্যদিকে যাত্রী কল্যাণ সংগঠনগুলো বলছে, সরকারিভাবে ভাড়া নির্ধারণের আগেই কিছু পরিবহন-সংশ্লিষ্ট পক্ষ নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। তারা জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বচ্ছ ও যৌক্তিক প্রক্রিয়ায় ভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে।
বাড়তি ভাড়ার প্রভাব শুধু বাসে সীমাবদ্ধ নেই। লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং রাইড শেয়ারিং সেবাতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পিক আওয়ারে যাত্রী সংকটকে কাজে লাগিয়ে বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ বেশি। তবে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মতে, রাজধানীর অনেক বাসই সিএনজিচালিত হওয়া সত্ত্বেও তেলের দাম বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ভাড়া বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। যাত্রীদের পক্ষে কোন যানবাহন কোন জ্বালানিতে চলছে তা যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় এই পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত শনিবার রাতে সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘোষণা করে জ্বালানি তেলের নতুন দাম। সে অনুসারে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০, অকটেন ১৪০ এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকা হয়েছে, যা গত রোববার থেকেই কার্যকর করা হয়। রাজধানীর অধিকাংশ বাস ডিজেলচালিত হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনে। তেলের দাম বৃদ্ধির পর প্রতি কিলোমিটারে বাসভাড়া ১৫ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। অতীতে তেলের দাম কমানোর পরিপ্রেক্ষিতে যে হারে বাস ভাড়া কমানো হয়েছিল, সেই একই অনুপাতে এবার ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব সংগঠনটির। যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে পুঁজি করে বাস মালিক সমিতির প্রভাবশালী নেতারা অতীতের মতো একচেটিয়া ভাড়া বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছেন।
সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগের হিসাব অনুযায়ী বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৫ পয়সা বাড়তে পারে। এর বেশি বাড়ানো হলে জনরোষ তৈরি হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন