প্রতিবছর দেশে প্রায় ৬৫ হাজার হেক্টর আবাদি জমি চাষযোগ্যতা হারাচ্ছে। অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন, শিল্প-কারখানা নির্মাণ, বন উজাড়, পরিবেশদূষণ এবং ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি নির্বিচারে কেটে নেওয়ার ফলে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা পড়ছে চরম ঝুঁকির মুখে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে দেশের প্রধান খাদ্যশস্য চাল সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে বলেই আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসার এবং ভার্টিক্যাল চাষ পদ্ধতির ব্যবহার খাদ্যঘাটতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে কৃষি গবেষণার ফলাফল কার্যকরভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছাতে পারলে উৎপাদন বৃদ্ধিসহ কৃষিজমি সংরক্ষণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। যদিও ফসলি জমি হ্রাসের প্রবণতা কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প দেখছেন না কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
দেশের অভ্যন্তরীণ কৃষিব্যবস্থা ও খাদ্য নিরাপত্তার বর্তমান চিত্র উদ্বেগজনক হলেও কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষিভূমি সুরক্ষা আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দেশের তিন ফসলি জমিতে বাড়িঘর, ভবন বা কোনো ধরনের প্রকল্প নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কৃষিজমি ধ্বংস করে অপরিকল্পিত আবাসন বা রাস্তাঘাট নির্মাণ থেকেও বিরত থাকার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। পাশাপাশি দুই ফসলি জমিও শিল্প বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়া রোধ, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন নিষিদ্ধ এবং অনুমতি ছাড়া কৃষিজমি ভরাট বা অন্য কাজে ব্যবহার বন্ধ রাখার বিষয়েও পরিষ্কার বিধি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব আইন ও নীতি কাগজেই সীমাবদ্ধ। ফলে কৃষিজমি সুরক্ষার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে আবাদি জমির চাষযোগ্যতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে চাষযোগ্য জমির তীব্র সংকট দেখা যাবে। একই সঙ্গে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কৃষি খাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে বিধি না মেনে যত্রতত্র আবাসন বা শিল্প-কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় ও নগর পরিকল্পনায় নীতিমালা রয়েছে, তবে কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। যার সরাসরি প্রভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া সারা দেশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যরে নিষ্কাশন প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদনকে বাধাগস্ত করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮.১১ মিলিয়ন হেক্টর, যা ২০২৩ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৭.৮৮ মিলিয়ন হেক্টরে। জমির এ হ্রাস সরাসরি খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। গত পাঁচ বছরে আবাদি জমি প্রায় ২ শতাংশ কমে যাওয়ায় ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির হারও স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
যদিও কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রধান দায়িত্ব খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও টেকসই কৃষি উন্নয়ন। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার ঘটানো। তবে তা বাস্তবায়নে রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। কৃষিজমির যথেচ্ছ ব্যবহার, দুর্বল নজরদারি এবং নীতিমালার অকার্যকর প্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহাম্মদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘কৃষির উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে মন্ত্রণালয় নিয়মিত করছে। সম্প্রতি কৃষিজমিতে স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রস্তাবের বিরোধিতা করা হয়েছে এবং স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে কৃষিজমি নষ্ট করা যাবে না; এটি কৃষির জন্যই সংরক্ষিত থাকবে।’
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘দেশের কৃষিকে আরো আধুনিকায়ন করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভার্টিক্যাল চাষ-পদ্ধতিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘরের ভেতরে বা বদ্ধ স্থানে মাটি ছাড়া উল্লম্বভাবে ফসল উৎপাদন করা হয়। যা খাদ্য ঘাটতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি উচ্চ ফলনশীল ফসল উদ্ভাবনের মাধ্যমে বর্তমানের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি উৎপাদন সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে।’
এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) কৃষি অনুষদের সাবেক ডিন প্রফেসর ড. পরিমল কান্তি বিশ্বাস রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশের চাষযোগ্য জমি কমলেও এখনো সংকটের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিছু ক্ষেত্রে জমি সামান্য বাড়ছেও, তবে সেই বৃদ্ধির হার খুবই কম।’ তিনি উল্লেখ করেন, গত কয়েক দশকে দেশের ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্বাধীনতার সময় প্রায় সাত কোটি মানুষের দেশে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন ধানের ঘাটতি ছিল। বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটিতে পৌঁছালেও উৎপাদন বেড়েছে, এবং ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘খাদ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে দেশে কৃষি গবেষণার যে ফলাফল রয়েছে, তা এখনো কার্যকরভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এসব প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। কৃষকের মুনাফা বাড়লে কৃষিজমির প্রতি আগ্রহও বাড়বে।
এই কৃষি বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেন, ‘ইটভাটার জন্য কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে নেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্তমানে মাটি ছাড়া বিকল্প প্রযুক্তিতে ইট উৎপাদন সম্ভব-সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন’।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের লাগাম টেনে ধরতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা করে পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। যে জমি দেশের মানুষের খাদ্য জোগায়, সেই জমি যেকোনো মূল্যে সংরক্ষণ করতে হবে। না হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। বর্তমানে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে হলেও, যেভাবে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের খাদ্যসংকট সৃষ্টির শঙ্কা রয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন