× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

বৃষ্টিমুখর এক বিকেলে

রেজাউল করিম খোকন

প্রকাশিত: মে ১, ২০২৬, ০৬:২৬ এএম

বৃষ্টিমুখর এক বিকেলে

(গত পর্বের পর)

সুরমাও জানতে পারে না তার গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানটি কোথায়, কোন পরিবারে বেড়ে উঠছে ভিন্ন পরিচয়ে।

এরমধ্যে দু’তিন বছর কেটে যায়। সুরমাকে ঢাকার একটি স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। হোস্টেলে থেকেই লেখাপড়া চালিয়ে যায় সে। ছাত্রী ধর্ষণ মামলার রায় হয়। বিচারক রায়ে আসামি নাজেম পাটোয়ারীকে যাবজ্জীবন কারাদ- শাস্তি দেন। শাস্তি ভোগের দুই বছরের মাথায় কারাগারে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়।

নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যে তের চৌদ্দ বছর সময় কাটালেও সুরমা তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয় না। সমাজে নিজের পায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে কিছু একটা করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লড়াই চালিয়ে যায়। স্কুল, কলেজের গ-ি পেরিয়ে এখন সে অনার্সের ছাত্রী। হোস্টেলে থেকেই পড়াশোনা করছে ঢাকা শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। সেই যে কিশোরী বয়সে অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের বোঝা নিয়ে গ্রাম ছেড়েছিল সুরমা। তারপর থেকে আর সেই নিজের গ্রামে ফিরে যাওয়া হয়নি। বাড়ির প্রিয় উঠোনটিতে ছোট বোনকে নিয়ে কত কী খেলাধুলায় মেতে থাকত। সাথে থাকত পাড়াপ্রতিবেশি সমবয়সি আরও কত মেয়ের দল। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে কীভাবে কেটে যেত সময়গুলো। ছোট বোনটার বিয়ে হয়েছে দুই বছর আগে। এখন এক বাচ্চার মা হয়েছে। চাকরিজীবী স্বামীর সঙ্গে চট্টগ্রাম থাকে সে। সুরমা গ্রামে নিজের বাড়িতে ফিরতে না পারলেও বাবা-মা, ছোট বোনের সাথে প্রায় দেখা হয়। মাঝে মধ্যে ওরা ঢাকায় আসে। তখন সুরমার সাথে সময় কাটায় তারা। এভাবেই ভিন্ন ছকে নিজের জীবনটাকে সাজিয়ে নিয়েছে সে। সমবয়সি অন্যান্য মেয়েদের মতো সবকিছু সহজ স্বাভাবিক নিয়মে না হলেও সুরমা তার নিয়তিটাকে মেনে নিয়ে সব প্রতিকূলতাকে জয়ের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে হতাশা তাকে বিপর্যস্ত করতে চাইলেও পণ করেছে, কোনোভাবেই হেরে যাবে না সে। শেষপর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।

প্রচ- বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে কলেজের পাশে একটা সরকারি অফিসের সামনে বড় বারান্দায় অন্য অনেকের মতো দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে সুরমা। বৃষ্টি কখন থামবে, কে জানে। একপাশে, একমনে দাঁড়িয়ে থাকলেও নিজের জীবনের ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার কথা ভাবছিল সে। কোথায় নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলের একটি গ্রামে কৃষক পরিবারের তার জন্ম। সেখানেই বাবা-মা আর ছোট বোনের সাথে তার জীবন কাটছিল। কী সহজ, সরল সাদামাটা জীবন। খুব বেশি চাওয়া পাওয়া ছিল না সেই জীবনে। বাংলাদেশের সাধারণ এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের একটি মেয়ের স্বপ্নটাও থাকে খুব সাধারণ। সুরমারও তাই ছিল। মাদ্রাসায় লেখাপড়া শেষ করার আগেই বেশির ভাগ মেয়েরই বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর স্বামী, সন্তান, শ্বশুরবাড়ি নিয়ে আটপৌরে এক গ্রাম্য গৃহবধূর জীবন। যেখানে খুব বেশি বৈচিত্র্য নেই। বলা যায়, গতানুগতিকতায় আচ্ছন্ন সাদামাটা জীবনযাপন। আজ তো তেমন একটি আটপৌরে জীবনের বেড়াজালে বন্দি থাকার কথা তার। অথচ এখন সে রাজধানী শহরের জটিল জীবনচক্রে কোটি মানুষের ভিড়ে মিশে আছে। অনেক দিন থেকেই ঢাকার জীবনটাকে দেখছে সে। কিশোরী বয়সে যখন এই শহরে পা রেখেছিল, তখন তার জ্ঞান-বুদ্ধি, পরিপক্বতা কিছুই ছিল না। স্কুল-কলেজের গ-ি পেরোতে পেরোতে এখানকার জীবনযন্ত্রণা, প্রাত্যহিক ব্যস্ততার জটিল এক আবর্তে নিজেকে হারিয়ে ফেলা ইত্যাদি উপলব্ধি করেছে। এখন সে পরিপূর্ণ নারী হিসেবে অনেক কিছু বোঝে, জানে। সে অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে চলার চেষ্টা করে। হঠাৎ তার মাঝে মাঝে অপ্রাপ্ত বয়সে অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। বান্ধবীদের সাথে দৌড়ঝাঁপ, ছোটাছুটি করে পুতুল খেলার দিনগুলোতে ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মতো হানা দিয়েছিল অসময়ে মাতৃত্বের বোঝা বয়ে বেড়ানোর দুঃসহ সব অভিজ্ঞতা। সেইসব দিনগুলোর ভয়ংকর কষ্টের কথা ভুলে যেতে আপ্রাণ চেষ্টা করলেও বারবার স্মৃতিতে হানা দেয়। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল তার। এক অবোধ কিশোরীর সারল্যের সুযোগ নিয়ে চরম সর্বনাশ করেছিল যে মানুষটা, যাকে সে শিক্ষক হিসেবে সম্মান করত, শ্রদ্ধা করত। আপন নানাকে না দেখলেও সেই মানুষটাকে ‘নানা’ মনে করত। এত কাছের চেনাজানা, পরিচিত, আপন মানুষদের মধ্যে কেউ কেউ হঠাৎ করে এত অচেনা হয়ে যায়, ভয়ংকর রূপ ধারণ করে সর্বনাশ ঘটায়। যা কেউ আগেভাগে কল্পনাও করতে পারে না। ষাটের বেশি বয়স যে মানুষটার সে কীভাবে নাতনির বয়সি একটা কিশোরী মেয়ের সাথে...।

আর ভাবতে পারে না সুরমা। সেই সময়গুলোর কথা মনে হলে এখনো তার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। নিজের অপরাধ ঢাকতে সেই মানুষটি এবং তার পরিবার সুরমার মতো এত অল্প বয়সি একটি মেয়েকে বিয়ে করে বউ করতে প্রস্তাব দিয়েছিল। তখন তার বাবা সেই প্রস্তাব মেনে যদি সুরমাকে সেই বয়স্ক মানুষটির অপরাধকে বৈধতা দিতে পাঠিয়ে দিত নাজেম পাটোয়ারীর বাড়িতে, তাহলে কী পরিণতি হতো তার? কয়েক বছর পর লোকটির মৃত্যু হলে সেই পরিবারের মানুষজন সন্তানসহ গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত তাকে। এত অল্প বয়সে বিধবা হয়ে বাপের বাড়ি ফিরে এলে বাবা-মায়ের কাঁধে বোঝা হয়ে উঠতে হতো সুরমাকে। সাধারণত অল্প বয়সে বিধবা হলে সেই মেয়েকে আর বিয়ে করতে চায় না কেউ। সবাই ভাবে, এই মেয়েটি নিশ্চয়ই অপয়া। তা না হলে বিয়ের এক দুই বছরের মধ্যে স্বামীটা মরবে কেন? আবার বিয়ে না হলে তখন কোলের সন্তান নিয়ে মানুষের বাড়িতে কাজ করে অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা করতে হতো তাকে। কারণ, বাড়িতে তাদের আর্থিক অবস্থা তেমন সচ্ছল ছিল না। অসচ্ছল একটি গ্রাম্য কৃষক পরিবারের বিধবা কন্যা ও তার সন্তানের বোঝা বহন করাটা রীতিমতো কষ্টকর ব্যাপার। সেই তখন গ্রাম্য সালিশে ধর্ষণকারীর সাথে তার বিয়ের প্রস্তাবটি অগ্রাহ্য করায় জীবনের গতিপথটা বদলে গিয়েছিল। সেইদিন নতুন পথে যাত্রা শুরু হয়েছিল সুরমার। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে আজ সে পৌঁছেছে যেখানে, সেখান থেকে এখনো অনেক স্বপ্ন দেখা যায়। জীবনটাকে ভালোভাবে সাজানোর চেষ্টা চালানো যায়। সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়া না হওয়া ভবিষ্যতের ব্যাপার। তবে তার স্বপ্ন দেখতে তো কোনো বাধা নেই।

হঠাৎ হঠাৎ পথে ঘাটে ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চা দেখলে কিংবা টিউশনিতে ছেলেমেয়েগুলোকে পড়াতে গেলে সুরমার ভেতরে এক ধরনের মাতৃত্বভাব জেগে ওঠে। এখানে কেউ তার অতীত জীবনের ইতিহাস জানে না। সবাই তাকে কলেজে অনার্সপড়–য়া একজন তরুণী ছাত্রী হিসেবেই চেনে। কিন্তু সেই কিশোরী বয়সেই তার গর্ভে এসেছিল অবাঞ্ছিত, অনাকাক্সিক্ষত এক সন্তান। গর্ভে ধারণের পর এক সময় পৃথিবীর আলো দেখেছে সেই সন্তানটি। তাকে অবাঞ্ছিত মাতৃত্ব ও কলঙ্কের বোঝা থেকে রক্ষা করতে তার দেখভাল করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অপরাজিতার বিশেষ উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টায় জন্ম নেওয়া কন্যাসন্তানটিকে দত্তক দেওয়া হয়েছিল নিঃসন্তান ধনাঢ্য এক দম্পতির কাছে। এই ঢাকা শহরে কোথায়, কোন বাড়িতে সেই মেয়েটি এখন বেড়ে উঠছে ভিন্ন এক পরিচয়ে, কে জানে। যদিও সুরমার পরিবারের লিখিত সম্মতির ভিত্তিতে সাতদিন বয়সি শিশুটিকে তার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল। তখন এক ধরনের ঝামেলামুক্ত হওয়ার চিন্তাভাবনা থেকেই এটাকেই যুক্তিযুক্ত এবং সুরমার ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গল ভাবা হয়েছিল।

এতদিন পর নিজের সন্তানের জন্য বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে ওঠে তার। যদি সে জানতে পারত, কোন বাড়িতে কোন পরিবারে আছে তার নাড়িছেঁড়া কন্যাসন্তানটি। নিজের সন্তান, যার শরীরে বইছে তার রক্ত। একবার জানতে পারলে সেই ঠিকানায় খোঁজ করে যেত সেখানে। নাহ, মায়ের অধিকার নিয়ে মেয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াত না সে। শুধু একবার বুকে জড়িয়ে অনেক আদর করে চলে আসত। কাউকে নিজের পরিচয় জানতে দিত না।

সুরমা বেশ কয়েকবার সবকিছু দেখভাল করা অপরাজিতা সমিতির কয়েকজনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছে। এখন যারা সমিতির বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছে তারা সুরমাকে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। তের চৌদ্দ বছর আগে যারা অপরাজিতার দায়িত্বে ছিলেন এখন আর তারা নেই। অন্যরা দায়িত্ব পালন করছেন এখন। তারা আগের অনেক বিষয়ে অবগত নন তেমন। এ ক্ষেত্রে কারো করার কিছু নেই। সুরমা নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে।

ব্যস্ত কোলাহলের মধ্যে বৃষ্টিবন্দি হয়ে নিজের জীবনের কথা ভাবতে ভাবতে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল সে এতক্ষণ ধরে। চারপাশের কোনো কিছুই খেয়াল ছিল না। এভাবে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। হঠাৎ করে যেন তার ঘোর কেটে যায়। কিছুক্ষণ আগে সরকারি অফিসের বারান্দায় আশপাশে অনেক মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ তাকিয়ে আশপাশে কাউকে দেখতে পায় না সে। হয়তো বৃষ্টি থেমেছে আরও আগেই। তাই যে যার মতো নিজ নিজ গন্তব্যে চলে গেছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে ঢাকা শহরে। দোকানপাট, অফিস আদালত, রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট সবখানেই আলো জ্বলে উঠেছে।

সুরমার খেয়াল হয়, কলেজের ক্লাস শেষে তার টিউশনিতে যাওয়ার কথা। বৃষ্টি এতক্ষণ তাকে আটকে রেখেছিল এখানে। এরমধ্যে কতটা সময় পেরিয়ে গেছে। হাতের ঘড়িটা দেখে সে। নাহ, আজ আর ছাত্রী পড়াতে যাওয়া যাবে না। অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন তার হোস্টেলে ফেরার সময় হয়ে গেছে। সেখানে যাওয়ার জন্য রাস্তায় নামে, হাঁটতে থাকে ধীর পায়ে। এখন তেমন তাড়া নেই তার। হাঁটতে হাঁটতে ব্যস্ত নগরীর হাজার মানুষের ভিড়ে মিশে যায় সুরমা।            (সমাপ্ত)

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!